চট্টগ্রাম শনিবার, ২৫ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

সম্পদ ছেড়ে আশ্রয়ে যেতে নারাজ সিংহভাগ মানুষ

এম জাহেদ চৌধুরী, চকরিয়া-পেকুয়া

১৩ মে, ২০২৩ | ৮:৪৩ অপরাহ্ণ

ছলেমা খাতুন। বয়স ৫০ পেরিয়েছে। পরিবারের গৃহকর্ত্রী তিনি। আজ শনিবার বিকেলে হাঁস-মুরগি ও আসবাবপত্র নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা হলেও তার কোন প্রভাব পড়েনি অবয়বে। জানতে চাইলে তিনি পূর্বকোণকে বলেন, গতরাতে বিপদ সংকেতের কথা শুনে পাশের সাইক্লোন সেল্টারে পরিবারের ৯ সদস্য নিয়ে চলে গিয়েছিলাম। মাঝরাতে পুরুষ সদস্য দু’জনকে ঘরে পাঠিয়ে দিই হাঁস-মুরগিসহ অস্থাবর সম্পদ দেখভাল করতে। ৮ নম্বর বিপদ সংকেতে কোন কিছু না হওয়ায় আজ ভোরে সবাই ঘরে ফিরে আসি। এখন ১০ নম্বর বিপদ সংকেত দিয়েছে জেনেছি। সম্পদ পাহারার ব্যবস্থা করে রাতে বাচ্চাদের নিয়ে আবারো আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাবো। এমনি এমনি আশ্রয়কেন্দ্রে পড়ে থাকলে ঘরের প্রয়োজনীয় সম্পদ চুরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শনিবার দুপুরে এ কথাগুলো বলেন কক্সবাজারের চকরিয়ার উপকূলীয় ইউনিয়ন ঢেমুশিয়ার গান্ধিপাড়ার আকবর আহমেদের স্ত্রী।

তার মতো চকরিয়া-পেকুয়ার সিংহভাগ মানুষ জীবন ঝুঁকি জেনেও সম্পদ রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নারাজ। অথচ দুই উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রশাসন নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। চালানো হচ্ছে মাইকিংসহ নানাভাবে ঝুঁকিমুক্ত থাকতে প্রচারণা। দুই লাখ মানুষকে আশ্রয় দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২১৭ টি সাইক্লোন সেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র। সাথে পানীয়জল ও শুকনো খাবার।

 

আজ শনিবার (১৩ মে) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চকরিয়া উপকূলীয় এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কয়েকটিতে গুটিকয়েক নারী-পুরুষ আশ্রয় নিলেও সিংহভাগ মানুষ ঝুঁকি বুঝতে পেরেও সম্পদের মায়ায় ঘর ত্যাগ করছেন না। কয়েকটি ইউনিয়নে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে পশ্চিম বড় ভেওলা ইউপি চেয়ারম্যান ও সিপিপি চকরিয়ার টিম লিডার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাবলার নেতৃত্বে সংগঠনটির ১৪শ কর্মীকে মাঠে বিরামহীন কাজ করতে দেখা যায়। ওইসময় বিভিন্ন গ্রামে শুকনো খাবার (চিড়া, গুড়) বিতরণ করতে দেখা যায় চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসার নেতৃত্বে কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার, ডুলাহাজারা ইউপি চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর, ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন, বিআরডিবি’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাকিম ও পৌর আওয়ামী লীগ নেতা রনি চৌধুরীকে।

 

অপরদিকে পেকুয়ায়ও একই দৃশ্য। সেখানেও সম্পদ ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছে না লোকজন। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বলে দাবি করেন কন্ট্রোল রুমের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আবু তৈয়ব ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু তাহের।

 

আবু তৈয়ব বলেন, পেকুয়ার ৭ ইউনিয়নের দুর্যোগকালীন ঝুঁকিতে থাকা অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখতে ১২১টি সাইক্লোন সেল্টার ও পর্যাপ্ত শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রাতের মধ্যে ঝুঁকিতে থাকা সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা হবে।

 

উজানটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সিপিপির সদস্য রাশেদুল ইসলাম টিপু বলেন, শুক্রবার ৮ নম্বর বিপদ সংকেত দেখানোর পর থেকে এলাকাবাসীকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যারা এখনো নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে তাদেরও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও গবাদিপশুগুলো নিরাপদ জায়গায় রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।

 

সিপিপি চকরিয়ার টিম লিডার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শুক্রবার রাতে ৮ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দেয়ার আগে থেকেই ঝুঁকি এড়াতে মানুষকে সচেতন করতে প্রচারণা শুরু করি আমরা। রাতে বেশকিছু নারী-পুরুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হলেও তারা ভোরে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেছে। যারা রয়েছে তাদের নিরাপত্তাসহ খাবার ও পানীয়জল দেয়া হচ্ছে।

 

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার শোভন দত্ত বলেন, দুটি এম্বুলেন্সসহ ডাক্তার, নার্স নিয়ে একাধিক টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে দুর্যোগকালীন চিকিৎসা দিতে। অনুরূপভাবে উপজেলার বেসরকারি সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিচালক বা ব্যবস্থাপকদের মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

 

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী বলেন, দুর্যোগকালীন মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশকটি টিম গঠন করা হয়েছে। পালাবদলের মাধ্যমে এসব টিম বিভিন্ন এলাকায় কাজ করবে।

 

চকরিয়া সেনা ক্যাম্পের প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ জাবের বলেন, দুর্যোগকালীন সময়ে জনস্বার্থে আমাদের একটি টিম এম্বুলেন্স ডাক্তারসহ প্রস্তুত থাকবে। প্রয়োজনে এই টিম ছুটে যাবে মানুষের কল্যাণে।

 

জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাত-উজ-জামান বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় ৮ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত ঘোষণার পর প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের চেষ্টায় কিছু মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া হয়েছিল। তাদের বেশিরভাগ আজ সকালে নিজ নিজ ঘরে চলে গেছে শুনেছি। এখন ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা হয়েছে। তাই পুলিশ, আনসার ভিডিপি, জিও-এনজিও এবং সিপিপি ও রেডক্রিসেন্টের পৃথক টিম মাঠে রয়েছে। এবার শুধু প্রচারণা নয়। ঘূর্ণিঝড় শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর ত্যাগ করে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, চকরিয়ার উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বসতির অন্তত ৮০ হাজার মানুষকে আশ্রয় দিতে ৯৬টি সাইক্লোন সেল্টার ও মুজিবকেল্লা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রিতদের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও পানীয়জল রয়েছে। মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নিতে উপজেলা প্রশাসনিক ভবনে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।

 

 

পূর্বকোণ/জেইউ/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট