চট্টগ্রাম শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

সর্বশেষ:

স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত আড়াই লাখ মানুষ

চিকিৎসক আছেন, সেবা নেই

নিজস্ব সংবাদদাতা

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

কর্ণফুলী উপজেলায় জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কনসালটেন্টসহ ১৬ জন বিসিএস চিকিৎসক পদায়ন করেছে সরকার। কিন্তু  বেশিরভাগই কর্মস্থলে আসেন না। মাঝেমধ্যে আসলেও চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন না। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে চলে যান। বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসকরা খেয়ালখুশি মত কর্মস্থলে আসা যাওয়া করে থাকেন। এতে উপজেলার আড়াই লাখের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কনসালটেন্টসহ ১৬ জন বিসিএস চিকিৎসক পদায়িত থাকার পরও নিরুপায় হয়ে স্বাস্থ্য সেবায় কর্ণফুলীর প্রায় আড়াই লাখ মানুষকে ডিপ্লোমা চিকিৎসক ও হাতুড়ে চিকিৎসকের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। হাতুড়ে চিকিৎসকের অপচিকিৎসার শিকার হয়ে শারীরিক নানা জটিলতায় পতিত হওয়াসহ প্রাণহানির মত ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 

২০১৬ সালে ৯মে পটিয়ার ৫টি ইউনিয়ন (চরলক্ষ্যা, জুলধা, চরপাথরঘাটা, বড়উঠান ও শিকলবাহা) নিয়ে দেশের ৪৯০তম উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল কর্ণফুলী উপজেলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।  কর্ণফুলী উপজেলার ক্ষুদ্র ও বৃহত্তর বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কাজ করছেন দেশের প্রায় সব জেলার মানুষ। এখানে গার্মেন্টস, সিমেন্ট, সয়াবিন তেল, চিনি, ইস্পাত কারখানাসহ রয়েছে ডকইয়ার্ড, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ ছাড়া কোস্টগার্ডের অফিস, মেরিন ফিশারিশ একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন আনুমানিক অর্ধলাখ শ্রমিক-কর্মচারী। এ উপজেলার আয়তন ৫৪ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, জনসংখ্যা মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৮ জন। তবে কর্ণফুলী থানার আওতাধীন এলাকার আয়তন ৮০ দশমিক ৯৯ বর্গ কিলোমিটার। এই এলাকার মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ৪২ হাজার ১৫১ জন। কিন্তু গত ১০ বছরে এই এলাকার জনসংখ্যা আরও বেড়েছে।

 

বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসা সেবায় কর্ণফুলী উপজেলায় এখনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপনের জন্য শিকলবাহা ওয়াই জংশন এলাকায় উপজেলা কমপ্লেক্সের পাশে ৩৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৪ দশমিক ৭৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলছে। অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ শুরু হবে। বর্তমানে বড়উঠান ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ৯৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলার চারটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, দুইজন কনসালটেন্ট চিকিৎসকসহ (গাইনি ও মেডিসিন) মোট ১৬ জন বিসিএস চিকিৎসক পদায়ন করেছে সরকার। কিন্তু তাদেও অধিকাংশ চিকিৎসক নিয়মিত কর্মস্থলে আসেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাঝেমধ্যে আসলেও চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন না। হাজিরা বহিতে স্বাক্ষর করে কয়েক ঘণ্টা থেকে চলে যান। এতে করে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এখানকার জনগণ। এছাড়াও এখানে চিকিৎসা সেবায় আছে ১২টি কমিউনিটি ক্লিনিক। কিন্তু এসব ক্লিনিকের অধিকাংশেরই নেই ডিগ্রিধারী চিকিৎসক। এ ছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জামেরও সংকট রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। নগরীতে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়া দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া এখানে গড়ে ওঠেনি বেসরকারি কোনো উল্লেখ্যযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। যদিও কলেজ বাজারে সূর্যের হাসি ক্লিনিক, সাউথ সিটি হসপিটাল, শিকলবাহায় কমিউনিটি হাসপাতাল, কর্ণফুলী চক্ষু হাসপাতাল গড়ে ওঠেছে। তবে এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নামমাত্র সেবা মেলে। এখানেও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জামও অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

 

প্রতিদিন বড়উঠান ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও অস্থায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মিলে মাত্র একজন চিকিৎসক চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকেন। চরপাথরঘাটা, চরলক্ষ্যা, শিকলবাহা ও জুলধা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসক পদায়িত করা হলেও জুলধা স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোন কেন্দ্রে চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। তাই এসব এলাকার জনসাধারণকে স্বাস্থ্য সেবার জন্য ডিপ্লোমা চিকিৎসকের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। ফলে যথাযথ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এখানকার লোকজন।

 

সরেজমিনে গত ১৫ জানুয়ারি রবিবার সকাল দশটা দশ মিনিটে চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় চিকিৎসকের কক্ষ ছিল তালাবদ্ধ। এগারোটার সময় শিকলবাহা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় স্যাকমো ও পরিদর্শিকার কক্ষে রোগীর ভিড়। কিন্তু চিকিৎসকের রুমে গিয়ে দেখা যায় তিনি একা দরজা বন্ধ করে অলস বসে আছেন। বারোটার সময় চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। কিন্তু স্যাকমো জাকের হোসেনকে রোগীর ভিড় সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এ সময় উপস্থিত রোগীরা জানান, চিকিৎসক কেন্দ্রে  আসেন না। আসলেও রোগীদের চিকিৎসা সেবা না দিয়ে দরজা বন্ধ করে পড়াশোনা করেন। জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক রোগী জানান, আমি একদিন চিকিৎসক মোর্শেদার রুমে ডুকলে তিনি স্যাকমোর কাছে যেতে বলেন। আমি বললাম বিষয়টা পুরুষ ডাক্তারকে বলা যাবে না। তাই আপনার কাছে এসেছি। প্রতি উত্তরে তিনি আমাকে রুম থেকে বের করে দেন। দুপুর দেড়টার দিকে বড়উঠান ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রস্থ অস্থায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দুইজন স্বাস্থ্য সহকারী ছাড়া কোন চিকিৎসকে পাওয়া যায় নি।

 

জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী বলেন, করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক মন্দার কারণে দেশে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকলেও ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এমপির আন্তরিক প্রচেষ্টায় কর্ণফুলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলছে। চিকিৎসকের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে সরকার উপজেলা পর্যায়ে এতগুলো চিকিৎসক নিয়োগ দিল। কিন্তু বেতন ভাতা নেয়ার পরও চিকিৎসকরা কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার অভিযোগটা আসলে খুবই দুঃখজনক। জনগণ যাতে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় সে জন্য এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করার জন্যও তাগিদ দিয়েছি।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম নাওশেদ মিয়া বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে আমরা ভালোভাবে স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারছি না। কনসালটেন্ট চিকিৎসকরা সরাসরি রোগী দেখেন না। জটিল রোগী হলে মেডিকেল অফিসাররা কনসালটেন্ট চিকিৎসকের কাছে পাঠালে তখন তাঁরা চিকিৎসা সেবা দেন। কোন চিকিৎসক যদি কর্মস্থলে যথাসময়ে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা রোগীদের সেবা প্রদানে বিরত থাকেন তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে জানান তিনি।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরী বলেন, চিকিৎসকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে আমি অভিযোগ পেয়েছি। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে কারণ দর্শানো হয়েছে। বায়েমেট্রিক হাজিরা সম্পর্কে তিনি বলেন, কর্ণফুলী নতুন উপজেলা হওয়ায় লোকবল, কাঠামোগত ও আইডিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যা রয়েছে। ফলে আপাতত বায়েমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা চালু করা যাচ্ছে না। তবে আমরা মনিটরিং করব যাতে চিকিৎসকরা নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন। এরপরও চিকিৎসকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে কিংবা চিকিৎসা প্রদান থেকে বিরত থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লেখক : নিজস্ব সংবাদদাতা, কর্ণফুলী

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট