চট্টগ্রাম শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

সর্বশেষ:

জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান বছরে হাজার কোটি টাকা

মোহাম্মদ আলী

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা। এটি এখন ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ নামে পরিচিত। অপার জীব বৈচিত্র্যময় ও মৎস্য সম্পদে ভরপুর এ নদী প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে আসছে। রুই জাতীয় মাছের (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) প্রজননের জন্য এ নদীর আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকলেও এটি যোগাযোগ, কৃষি ও সুপেয় পানির জন্যেও একটি বড় উৎস। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে কয়েকটি প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশে রয়েছে তার মধ্যে হালদা অন্যতম।

 

খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ি ক্রিক থেকে সৃষ্ট হালদা ছড়া থেকে হালদা নদীর উৎপত্তি। হালদা ছড়া মানিকছড়ি উপজেলার মানিকছড়ি খালের সাথে মিলিত হয়ে হালদা খাল এবং ফটিকছড়ির ধুরং খালের সাথে মিলিত হয়ে হালদা নদীতে পরিণত হয়েছে। এরপর এ নদী চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রায় ৯৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও থানার কালুরঘাট নামক স্থানে কর্ণফুলী নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।

 

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী যেখান থেকে সরাসরি রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। স্মরণাতীকাল থেকে হালদায় রুই জাতীয় মাছ ডিম ছেড়ে আসছে। ডিম ছাড়ার মওসুমে হালদা ছাড়াও আশেপাশের বিভিন্ন নদী থেকে মাতৃত্বের টানে ছুটে আসে রুই জাতীয় মাছ।

 

বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ফলে হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছ ডিম ছাড়তে আসে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে : ভৌতিক, রাসায়নিক এবং জৈবিক। ভৌতিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর অক্সবো বাঁক, অনেকগুলো নিপতিত পাহাড়ি ঝর্ণা বা ছড়া, প্রতিটি পতিত ছড়ার উজানে এক বা একাধিক বিল, নদীর গভীরতা, কম তাপমাত্রা, তীব্র খরস্রোত এবং অতি ঘোলাত্ব। অপরদিকে রাসায়নিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কম কনডাক্টটিভিটি, সহনশীল দ্রবীভূত অক্সিজেন, পিএইচ, কম হার্ডনেস এবং কম এলক্যালাইনিটি ইত্যাদি। জৈবিক কারণগুলোর মধ্য রয়েছে নদীর দুই তীরে বিল থাকার কারণে বর্ষার প্রথম বর্ষণের পর বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে নদীর পানিতে প্রচুর জৈব উপাদানের মিশ্রণ হয়। এতে নদীতে পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাচুর্য থাকে যা প্রজননপূর্ব গোনাডের পরিপক্কতায় সাহায্য করে। এছাড়া অনেকগুলো পাহাড়ি ঝর্ণা বিধৌত পানিতে প্রচুর ম্যাক্রো এবং মাইক্রো পুষ্টি উপাদান থাকার ফলে নদীতে পর্যাপ্ত খাদ্যাণুর সৃষ্টি হয় (ফাইটোপ্লাংকটন, জুপ্লাংকটন ও বেনথোস)। সুতরাং উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত ক্রিয়ায় হালদা নদীতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রুই জাতীয় মাছকে বর্ষাকালে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদ-নদী থেকে এ নদী সম্পূর্ণ আলাদা।

 

হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের প্রজনন স্থান হচ্ছে নদীর বিশেষ ধরনের বাঁক। এ বাঁকগুলোকে অক্সবো বাঁক বলে। নদীর এসব বাঁক পানির উলট-পালট, পানির স্রোতের গতিধারা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক অনুঘটক উৎপন্ন করে মাছের প্রজননের বিশেষ পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং ডিম নিষিক্ত করতে সহায়তা করে। তাছাড়া এ বাঁকগুলোতে পানির ঘুর্ণনের কারণে প্রাকৃতিকভাবে গভীর স্থানের সৃষ্টি হয়, যাকে কুম বা কূয়া বলে। প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট এসব কুম হালদা নদীতে মাছের প্রজনন ও প্রজননকালীন সময়ে বিভিন্ন নদী থেকে এসে ব্রুড মাছ অবস্থান করার বিশেষ স্থান।

 

মূলত বাঁকগুলো হালদা নদীতে মাছের প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং ডিমের পরিস্পূটনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময় অনুকূল পরিবেশে হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে। এ সময়কে স্থানীয় ভাষায় ‘জো’ বলে। এই ‘জো’র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা। নদীতে মাছ ডিম দেয়ার সময় প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হয়, এ বর্ষণ শুধু স্থানীয়ভাবে হয় না, একই সাথে নদীর উজানের পাহাড়ি অঞ্চলেও প্রচুর বর্ষণ হয়। এতে নদী পথে পাহাড়ি ঢল নামে। পাহাড়ি ঢলের পানি খুবই ঘোলা এবং খরস্রোতা হয়ে ফেনাসহ হালদা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নদীর পানির ভৌত রাসায়নিক পরিবর্তন হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় হলে এবং সর্বশেষ নদীর পূর্ণ জোয়ারশেষে পানি যখন স্থির হয় অথবা ভাটার শেষ সময়ে মাছ ডিম ছেড়ে দেয়। চূড়ান্তভাবে ডিম ছাড়ার আগে নদীতে রুই জাতীয় মাছ পরীক্ষামূলক ভাবে অল্প পরিমাণ ডিম ছাড়ে। একে স্থানীয় ভাষায় ‘নমুনা’ বলে।

 

নমুনা ছাড়ার মাধ্যমে রুই জাতীয় মাছ তাদের নতুন বংশধরদের জন্য নদীর পরিবেশ নিরাপদ এবং অনুকূল কিনা তা পরীক্ষা করার চেষ্টা করে। অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হলে, মাছ চূড়ান্তভাবে ডিম ছাড়ে। নমুনা ছাড়ে বিশেষ করে জোয়ারের মাঝামাঝি অবস্থায়। নমুনা পাওয়া গেলে স্থানীয় সংগ্রকারীরা নৌকা, জাল ও ডিম ধরার অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে নদীতে অবস্থান নেয়। এরপর চূড়ান্তভাবে ডিম ছাড়লে সংগ্রহকারীরা ডিম ধরার উৎসবে মেতে উঠে। এ সময় নদী-মানুষ-প্রকৃতির মিলনে সেই অপরূপ দৃশ্যে পরিণত হয়।

 

হালদার ডিম সংগ্রহের কৌশল সম্পূর্ণ স্থানীয়। বংশ পরম্পরায় দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে স্থানীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিম সংগ্রহ হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে ডিম সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন ১টি কাঠের নৌকা, ২-৩ জন মানুষ, ১টি ডিম ধরার জাল, ২টি নোঙ্গর, ২টি বড় বাঁশ, ২টি বড় প্লাষ্টিক বালতি ইত্যাদি। নদী থেকে আহরণের পর স্থানীয়ভাবে তৈরি মাটির কূয়ায় কিংবা সরকারি হ্যাচারিতে ডিম ফেলা হয়। চারদিন ধরে এগুলো পরিচর্যার পর এগুলো রেণুতে পরিণত হয়। এরপর রেণুগুলো বাজারজাত করা হয়। সনাতনি মাটির কূয়া ছাড়াও বিগত দেড়যুগ ধরে সরকারিভাবে নির্মিত পাকা কূয়াতে ডিম থেকে রেণু ফোটানো হচ্ছে। তবে পাকা কূয়া চাহিদার তুলনায় কম থাকায় ডিমসংগ্রহকারীদের অনেকে মাটির কূয়াতে রেণু ফোটায়।

 

ডিম থেকে উৎপাদিত রেণু, রেণু থেকে পোনা, সর্বশেষ মাছ হিসাবে খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত দেশের মৎস্য খাতে হালদা নদী চার ধাপে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। হালদা নদী থেকে প্রাপ্ত ডিম, উৎপাদিত রেণুর পরিমাণ এবং এখান থেকে উৎপাদিত মাছের হিসাব করলে দেখা যায়, এক বছরের চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এর সাথে সুপেয় পানি, কৃষিজ উৎপাদন, যোগাযোগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে যোগ করলে একক নদী হিসাবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে হালদা নদীর অবদান খুবই তাৎপর্যবহ।

 

চট্টগ্রাম শহরের সুপেয় পানির প্রধান উৎস হালদা নদী। প্রতিদিন এ নদী থেকে দৈনিক ১৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। পানির বিশেষ গুণগতমান ও পরিমাণের কথা বিবেচনা করে ১৯৮৭ সাল থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসা মোহরা পানি শোধনাগারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৯ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করে শহরে চাহিদা পূরণ করে আসছে। এছাড়া মদুনাঘাট শেখ রাসেল পানি শোধনাগার প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবরে চালুর পর দৈনিক আরো ৯ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করছে ওয়াসা। এ নদীর পানিতে হেভী মেটালের পরিমাণ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান থেকে কম হওয়ায় বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির উৎস হিসাবে হালদা নদীর পানি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

 

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক পূর্বকোণ।

 

 

পূর্বকোণ/জেইউ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট