চট্টগ্রাম শনিবার, ২৫ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

থমকে গেছে যোগাযোগ নাজিরহাট সেতুতেই

ইফতেখারুল ইসলাম

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ১:০০ অপরাহ্ণ

নাজিরহাট লাইনে ট্রেনের যাত্রী কমে গেছে, জৌলুস কমেছে নাজিরহাট কলেজের। উত্তর চট্টগ্রামের প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র নাজিরহাট হারিয়েছে বাণিজ্যিক গৌরবময় ইতিহাস। বলতে গেলে একসময়ের প্রাণবন্ত নাজিরহাট এখন এক প্রকার জৌলুসহীন হয়ে গেছে। আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন ফরহাদাবাদের সাবেক চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া। ৬৩ বছর বয়সী এই প্রবীণ ব্যক্তি পূর্বকোণকে বলেন, একটি সেতু কত গুরুত্বপূর্ণ তা পরিত্যক্ত হওয়ার পর হারে হারে টের পাচ্ছে নাজিরহাট এবং আশপাশের মানুষ।
তিনি জানান, একসময় নাজিরহাট ট্রেন স্টেশন যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকতো। উত্তর ফটিকছড়ি এবং হাটহাজারীর আশপাশের মানুষ ট্রেনযোগে চট্টগ্রাম শহরে আসা-যাওয়া করতো। যেকারণে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এই এলাকার অনেক মানুষ চট্টগ্রাম শহরে জায়গা কিনেনি। কারণ ট্রেনে করে খুব কম সময়েই সবাই শহরে আসা-যাওয়া করতে পারতো। এতে সাধারণ মানুষের সময় এবং অর্থ দুটোই বাঁচতো। ট্রেনে প্রচুর পরিমাণে যাত্রী থাকার কারণে বাংলাদেশ রেলওয়েও লাভবান হতো।
নাজিরহাট পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক আহবায়ক ও নাজিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ তাহের মিয়া পূর্বকোণকে বলেন, ব্রিজটি অকেজো হওয়ার কারণে নাজিরহাট বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য মরে গেছে বললে ভুল হবে না। বাজারের দিক থেকে রেল স্টেশনেও মানুষ যায় না, আবার ওই পাশ থেকেও মানুষ বাজার করার জন্য এদিকে আসে না। কারণ সিএনজি ট্যাক্সিতে করে নতুন ব্রিজ হয়ে ঘুরে আসতে ৫০ টাকা ভাড়া লাগে। এ কারণে নাজিরহাটে লোকজন আসে না। অথচ একসময় নাজিরহাট ছিল উত্তর চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক হাব। ফটিকছড়ির উৎপাদিত পণ্য সহজেই ট্রেনে করে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে বিক্রি করা যেত। কৃষকরা লাভবান হত। সেই ট্রেনের লাইন আছে। কিন্তু একটি সেতুর অভাবে কৃষকরা স্টেশনে যেতে পারে না।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, বর্তমান সেতুটির মধ্য অংশ দেবে গেছে। লোহার পাতের বেষ্টনী ভেঙে পড়ায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। দু’পাশে রেলিং অকেজো হয়ে পড়েছে। নিচের খুঁটি অনেকটা সরু এবং গোড়া থেকে মাটি সরে গেছে। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকার জনসাধারণ। তারপরও বাধ্য হয়ে প্রতিদিন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, হাসপাতাল-ক্লিনিকের রোগী, নাজিরহাট রেলস্টেশন ও বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী এবং নাজিরহাট বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাসহ হাজার হাজার জনসাধারণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটে এবং রিকশা নিয়ে এর ওপর দিয়ে চলাচল করছে। বর্তমানে এ সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় উত্তরাঞ্চলীয় ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র নাজিরহাট বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটি পুনঃসংষ্কার কিংবা এর পাশে নতুন করে আরেকটি সেতু দ্রুত নির্মাণ করার দীর্ঘদিন ধরে জোর দাবি জানিয়ে আসছে এলাকাবাসী।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এই সেতুটি ছিল পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বৃহত্তর ফটিকছড়ি এবং হাটহাজারী উপজেলার লাখো জনসাধারণ ছাড়াও ট্রেন যাত্রীদের যাতায়াতের একমাত্র পথ। ১০০ মিটার সেতুর অভাবে স্থানীয় সর্বসাধারণকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এই সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল যতই কমেছে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেলের যাত্রী ততই কমেছে। বৃহত্তর ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর উপজেলার ৫ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠি বেকায়দায় পড়েছে।
এলাকাবাসী জানান, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সব যানবাহনই এক সময় পুরাতন হালদা সেতু দিয়ে চলাচল করত। তবে এর পৌনে এক কিলোমিটার দূরে ১৯৮৯ সালে নতুন হালদা সেতু তৈরি হওয়ার পর থেকে মহাসড়কের ভারী যানবাহন আর পুরোনো সেতু দিয়ে চলাচল করে না। এরপর থেকে সরকারি সংস্থাগুলো এই ব্রিজের উপর আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে পুরাতন লোহার ব্রিজটি। তারা জানান, দূর-পাল্লার এবং ভারী যানবাহন নতুন ব্রিজ দিয়ে চলাচল করলেও নাজিরহাট বাজার কেন্দ্রিক পণ্যবাহী পরিবহন এবং বিপুল পরিমাণ চাঁদের গাড়ি (জিপ), সিএনজি ট্যাক্সি ও রিকশা এই সেতু দিয়ে চলাচল করতো। এখন রিকশা এবং মোটর সাইকেল ছাড়া অন্যকোন যানবাহন এই সেতু দিয়ে চলাচল করতে পারে না।
সেতুটি ১৯৯৪ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। বছর দশেক আগে স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে এটি একবার মেরামত করা হয়। তবে সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে সেতুর মুখে ঝুঁকিপূর্ণ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে দায় সারে কর্তৃপক্ষ।
এলজিইডি চট্টগ্রাম অফিসে এ বিষয়ে জানতে গেলে তারা ফটিকছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় কুমার নাথের বরাত দিয়ে বলেন, সম্প্রতি ঢাকা থেকে উচ্চ পর্যায়ের একটি টিম পুরাতন ব্রিজটি পরিদর্শন করেছে। হালদা যেহেতু ন্যাশনাল হেরিটেজ। হালদা নদীতে কোন স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র প্রয়োজন। এসব বাধা কীভাবে পেরোনো যায় সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছে এলজিইডি। তবে পুরাতনটি ভেঙে নতুন কোন ব্রিজ নির্মাণে এখনো কোন প্রকল্প তৈরি করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাটে হালদা নদীর ওপর ১৯৩০ সালে মতান্তরে ১৯১৯ সালে তৎকালীন ডিস্ট্রিকবোর্ড (বর্তমান জেলা পরিষদ) ফটিকছড়ি-হাটহাজারী উপজেলার সীমান্ত এলাকা নাজিরহাটে এ সেতু নির্মাণ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক হানাদার বাহিনী ডিনামাইট দিয়ে সেতুটির একাংশ ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে সেতুটি মেরামত করে পুনঃযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করে।

 

লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বকোণ

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট