চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২৫ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১২:১৫ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী, মহেশখালী থেকে ফিরে

জীবিকার তাগিদে ছুটছে মানুষ

সরকারের অভাবনীয় উন্নয়ন কাজ চলছে ছোট্ট এ দ্বীপ ইউনিয়ন মাতারবাড়িতে। একাধিক কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর ও ইকোনমিক জোন নির্মাণকে ঘিরে চলছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। দেশি-বিদেশি অর্থায়নে আনুমানিক ৮০ হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে দেশের অর্থনীতি। কিন্তু উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি মাতারবাড়ি ও ধলঘাট ইউনিয়নে। অথচ অর্ধযুগ আগেও স্থানীয় বাসিন্দাদের সুখের সংসার ছিল। চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ, লবণ মাট, বিভিন্ন মৎস্য চাষ, জেলে, ফিশিং বোট ব্যবসা, কৃষিসহ নানা ক্ষুদ্র পেশায় কাজ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছিলেন তারা। কিন্তু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কারণে অর্ধযুগের ব্যবধানে এখানকার মানুষ পেশা ও পরিচয় হারিয়ে টানাপোড়নের মধ্যে পড়ে গেছেন। টানাটানির সংসারের জ্বালা সইতে না পেরে জীবিকার তাগিদে অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে এলাকা ছাড়ছেন।

 

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা প্রকল্পের মহেশখালী সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ মহসীন দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘মাতারবাড়ি ও ধলঘাটে সরকারের বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের উল্টো পিঠে দেখা দিয়েছে দারিদ্রতা। কর্ম হারিয়ে মানুষ জীবিকার সন্ধানে ছুটছেন অন্যত্র। কক্সবাজারের চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, বানিয়াচড়াসহ বিভিন্ন এলাকা, বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলা এবং চট্টগ্রাম শহরের হামিদচর, ভাটিয়ারি জাহাজভাঙ্গা এলাকাসহ বহু এলাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে গেছে বহু বাসিন্দা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাতারবাড়ি থেকে এসব এলাকায় এ পর্যন্ত ১৪৭ পরিবার কাজের সন্ধানে চলে গেছে।’

 

মাওলানা মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘শুধু কর্ম নয়, এখানকার সার্বিক অবকাঠানো বসবাসের ক্ষেত্রে ক্রমাগত অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মাতারবাড়ির পশ্চিমে সাইরার ডেইল থেকে উজানটিয়া খোদারকুম প্রজেক্ট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বেড়িবাঁধটি অনেকটা অরক্ষিত। যথাযথ সংস্কারের অভাবে জোয়ারের পানি ঢুকছে লোকালয়ে। তাতে বিলীন হচ্ছে বসতঘর ও ফসলি জমি। এছাড়া চালিয়াতলি থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে প্রধান সড়কটি যেন মরণ ফাঁদ। সড়কটি এতটাই বিধ্বস্ত যে, যানবাহনে গেলে যাত্রীদের জীবন খাঁচা ছাড়ার অবস্থা হয়। এ কারণে সামান্য পথ যেতে সিএনজি ট্যাক্সি ভাড়া জনপ্রতি যাত্রীকে গুণতে হয় ৫০ টাকা। রিজার্ভ নিলে দিতে হয় ২৫০ টাকা। তাই জনজীবনের দুর্ভোগ ও জীবনযাত্রায় অতি খরচের কারণে বাসিন্দারা পৈত্রিক ভিটা ছাড়ছেন।’

 

এদিকে শুধু জমি অধিগ্রহণের কারণে পেশা হারাননি স্থানীয় বাসিন্দারা। যারা কুহেলিয়া নদী ও প্রকল্প এলাকার পাশে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করতো এসব জেলেরাও এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। সড়ক ও বেড়িবাঁধ নির্মাণে নদীর নাব্যতা হ্রাস ও কোস্ট গার্ডের বাধার কারণে তারা মাছ শিকার করতে পারছে না। এতে টানাপোড়েনের মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছে তাদের সংসার।

 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ধলঘাট ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর মহুরীঘোনা গ্রামের হাজি আবদুল আলীর পুত্র সৈয়দ আহমদ (৭০) বলেন, ‘আমি পেশায় জেলে ছিলাম। কুহেলিয়া নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। তাতে স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল। কিন্তু কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পূর্ব পাশে কুহেলিয়া নদীতে এখন জাল বসাতে পারি না। এ নদী দিয়ে বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে। তাতে কোস্টগার্ড জাল বসাতে বাধা দিচ্ছে। এ কারণে নদীতে মাছ শিকার করতে পারছি না। জীবিকা না থাকায় আমি এখন সম্পূর্ণ বেকার। আর্থিক কষ্টের মধ্যে চলছে সংসার।’

 

সৈয়দ আহমদ এর মতো একই কথা বলেছেন মাতারবাড়ি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের উত্তর রাজঘাট এলাকার বাসিন্দা মৃত কালা মিয়ার পুত্র নাসির উদ্দিন (৫৪)। তিনি বলেন, এক সময় কুহেলিয়া নদীতে মাছ মেরে সংসার চালাতাম। মা, স্ত্রী, এক ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে আমার সুখের সংসার ছিল। কিন্তু কয়লা বিদ্যুতের যাতায়াতের জন্য কুহেলিয়া নদীর পশ্চিম পাড়ে বেড়িবাঁধ দিয়ে সড়ক নির্মাণের কারণে আগের মতো নদীর গভীরতা নেই। তাছাড়া সারাক্ষণ নদীতে প্রকল্পের মালবাহী স্টিমারসহ অন্যান্য জনযান চলাচল করে। এতে মাছ নেই নদীতে। আবার মাঝে মাঝে নদীতে নামতে চাইলে কোস্ট গার্ড বাধা দিচ্ছে। তাই বিগত কয়েক বছর ধরে নদী থেকে মাছ শিকার করতে পারছি না। এতে আমি বেকার হয়ে পড়ি। বেকারত্বের কারণে এখন সংসার চালাতে পারছি না। পরিবার-পরিজন নিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছি।’

 

এক সময় পেশায় জেলে মাতারবাড়ি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর রাজঘাট এলাকার বাসিন্দা আবদুল নবী (৫১) ও আবদুল জলিল (৫৪) বলেন, ‘কুহেলিয়া নদীকে ঘিরে উত্তর ও দক্ষিণ রাজঘাট এলাকায় প্রায় পাঁচশ’ জেলে রয়েছে। এসব জেলে আড়াই বছর আগেও নদী থেকে মাছ শিকার করে সংসার চালাতেন। কিন্তু কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে নদী থেকে মাছ শিকার বন্ধ হয়ে গেছে। কুহেলিয়া নদীর পশ্চিম পাড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ দিয়ে সড়ক নির্মাণের কারণে নদীর গভীরতা হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালামাল জলযানের মাধ্যমে আনা-নেওয়ার কারণে এ নদীতে জাল ফেলতে পারছে না জেলেরা। তাই বংশ পরম্পরায় কাজ করা জেলেরা এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। পেশা হারিয়ে তারা আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে গেছেন। জীবিকা চালাতে কেউ কেউ দিনমজুরির কাজ করলেও তা আবার নিয়মিত মেলে না’।

 

উত্তর রাজঘাটের নুরুল কাদের (৪০) নামের অপর এক জেলে বলেন, ‘স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে আমার সংসার। তিন বছর আগেও ৩ থেকে ৪টি বড় জাল ছিল আমার। কুহেলিয়া নদীতে মাছ মেরে জীবিকা নির্বাহ হতো। কিন্তু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর পর থেকে নদীতে মাছ মারা বন্ধ হয়ে যায়। আয় না থাকায় এখন আমি পরিবার নিয়ে অভাবের মধ্যে পড়ে গেছি।’

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট