
কক্সবাজারের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও বাঁকখালী নদীর কূলে নোঙর করে আছে সারি সারি ট্রলার। সাগরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি থাকলেও নেই শুধু প্রয়োজনীয় জ্বালানি—ডিজেল। কমে গেছে সাগরে ইঞ্জিনচালিত মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা। এর প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারে। কয়েক দিন ধরে বাজারে মাছের জোগান কম, এতে দামও বেড়েছ। ফলে এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৬৫ হাজার জেলে এবং তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
একাধিক মৎস্যজীবীর ভাষ্য, জ্বালানি তেলের সংকট না কাটলে ট্রলার-নৌকায় মাছ ধরা একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের। সাগরে একেকটি ট্রলার পাঠাতে প্রচুর পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাঁকখালী নদীর তীরের ভাসমান পাম্পগুলোতে এখন তেল নেই বললেই চলে’।
মঙ্গলবার ( ৩১ মার্চ ) সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীরে কিছু ইঞ্জিনচালিত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার বাঁধা। জেলেরা নৌকার ওপর বা আশপাশে অলস সময় কাটাচ্ছেন। নদীতে তেমন ট্রলার বা নৌকা চোখে পড়েনি।
চৌফলদন্ডী এলাকার জেলে মো. জাহাঙ্গীর আলম, বদিউল আলম, সুমন, নুর আলমসহ আর-ও অনেক জেলের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ডিজেল–সংকটে দুই সপ্তাহ ধরে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও নৌকা নিয়ে সেভাবে মাছ ধরতে পারছেন না। অল্প ডিজেল নিয়ে মাছ মারতে গিয়ে আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। প্রতিদিন একটি এক ইঞ্জিনের ট্রলারে বা নৌকায় ডিজেল লাগে দুই থেকে তিন লিটার। দুই ইঞ্জিনের ট্রলার বা নৌকায় ডিজেল লাগে পাঁচ থেকে ছয় লিটার। তেলের পাম্পে এবং তেলের দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যায় না। ডিজেলের দামও লিটারপ্রতি ২০–২৫ টাকা বেশি। এ অবস্থায় মাছ মারতে না পেরে পরিবারের অবস্থা খুবই খারাপ। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।
পাম্প মালিকরা দাবি করছেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহ কমে গেছে। তবে সাধারণ জেলেদের অভিযোগ, এই সুযোগে একটি কালোবাজারি চক্র ও সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে তেল বিক্রির পাঁয়তারা করছে। বর্তমানে যে সামান্য তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে উপকূল থেকে মাত্র ১০-১২ কিলোমিটারের বেশি গভীরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অথচ ওই অগভীর এলাকায় মাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে।
কক্সবাজার জেলা বোট মালিক সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে জেলায় মোট ৫ হাজার ২৫০টি ট্রলার নিবন্ধিত থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ২ হাজার ২২টি। বাকি বোটগুলো লোকসানের মুখে পড়ে বিক্রি হয়ে গেছে কিংবা মালিকেরা অন্য পেশায় চলে গেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই তীব্র সংকটের মুখে যেখানে অধিকাংশ বোটই মাছ ধরতে পারছে না, সেখানে সাধারণ শ্রমিকদের জীবন কীভাবে চলবে?
জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় মোট ৬৪ হাজার ২১৫ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যার মধ্যে সদর উপজেলাতেই আছেন প্রায় ৯ হাজার।
জানতে চাইলে জেলা মৎস্য র্কমকর্তা মোঃ নাজমুল হুদা দৈনিক পূর্বকোণকে জানান, জেলায় ছোট-বড় ট্রলারের সংখ্যা ৫ হাজার ২১৫ টি। তারমধ্য নিবন্ধিত বোটের সংখ্যা ১৭০০। স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলো বলা হয়েছে, যেন নিবন্ধিত ট্রলারগুলোকে পর্যাপ্ত ডিজেল দেয়। একই সাথে পর্যায়ক্রমে বোটের লাইসেন্স হালনাগাদ করার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা মাছ ধরার পেশা পরিবর্তন করেছেন তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের শনাক্তকরণে নতুন ‘জেলে কার্ড’ নিবন্ধনের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে সব ফিশিং বোটে এই মুহূর্তে চাহিদামতো তেল বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই আপৎকালীন এই সংকট সামাল দিতে শুধুমাত্র সরকারি নিবন্ধনভুক্ত ট্রলারগুলোতে তেল সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান তিন জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানিকে কক্সবাজারে তেল সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সব ধরণের বোটই আবারও তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
পূর্বকোণ/সিজান/পারভেজ