
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও শীর্ষ নেতৃত্বসহ বেশিরভাগ পদে জয়ী হয়েছেন শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শিবির সমর্থিত প্যানেলের জয়ের পেছনে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে লম্বা সময় ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার অনুপস্থিতি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঠামো দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকায় নানা ধরনের নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ফলে তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল সমর্থিত প্যানেলগুলোর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরে ‘ছদ্মবেশে’ রাজনীতি করায়, তাদের প্রতি সরাসরি এমন কোনো অভিযোগ ওঠেনি। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তার সুফল দেখা গেছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিবির সমর্থিত প্যানেলের জয়
গত ছয়ই জানুয়ারি প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন, সংক্ষেপে যাকে ডাকা হচ্ছে জকসু নির্বাচন।
ভোট গণনা শেষে ২১টি পদের মধ্যে ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ ১৬টি পদেই জয়ী হন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এতে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৬ দশমিক ১৮ শতাংশ।
এর আগে, গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ১৪ মাস পর গত বছরের ৯ই সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আর তারপর একে একে জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি-জিএস-এজিএসসহ শীর্ষ তিনটি পদের বেশিরভাগ পেয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা।
ব্যতিক্রম ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এজিএস এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস পদ।
জাকসু ভিপি পদে জয়ী হন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের আবদুর রশিদ জিতু যিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক, চাকসু এজিএস পদে ছাত্রদলের প্যানেলের প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান এবং রাকসু স্বতন্ত্র প্যানেল আধিপত্যবিরোধী ঐক্যের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আম্মার।
তবে জুলাই আন্দোলনের সাবেক কয়কজন সমন্বয়কের নেতৃত্বে রাকসু নির্বাচনের সময় গঠিত আধিপত্যবিরোধী ঐক্য প্যানেলকে ছাত্রশিবিরের ‘বি টিম’ হিসেবে দাবি করে সমালোচনাও ছিল।
গুপ্ত রাজনীতি ও শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো
পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রশিবিরের জয়ের পেছনে বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টর কাজ করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভিন্নমত দমনের কারণে রাজনৈতিক দলগুলোকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। একসময় ভেঙে পড়েছে এগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোও।
কিন্তু ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের অংশ হয়ে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন এবং গোপনে নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রমও চালিয়ে গেছেন।
“বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসগুলো থেকে যখন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা প্রায় উধাও হয়ে গেছিলো, শিবির সেই সময়টাতে ছদ্মবেশে, ছাত্রলীগের পরিচয়ে তার সাংগঠনিক তৎপরতা বিস্তৃত করেছে, যেটা অন্য সংগঠনগুলো পারেনি”, বলছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস।
ফলে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্য বড় সংগঠনগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে যেখানে সময় লেগেছে, সেখানে দেখা দেওয়া শূন্যতাকে পুরোদস্তুর কাজে লাগাতে পেরেছে ছাত্রশিবির।
২০২৫ সালের ছয় বছর আগে ২০১৯ সালে আয়োজিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন।
তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে সেবারের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সবাইকে তাক লাগিয়ে তাতে জয়ী হন নুরুল হক নুর।
বর্তমানে গণঅধিকার পরিষদ নামের একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সভাপতি তিনি।
মি. নুরের মতে, দমন-পীড়নের কারণ অন্য বড় ছাত্র সংগঠনগুলো কাজ করতে না পারলেও ছাত্রশিবির ছাত্রলীগের মধ্যে থাকার কারণে ক্যাম্পাসে তাদের ‘ভিজিবিলিটি’ বা দৃশ্যমানতা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পৃক্ততা ছিল।
এছাড়াও পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের জয়ের পেছনে জামায়াত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও মনে করেন তিনি।
“এই ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ছাত্রশিবির এবং তাদের মাদার সংগঠন জামায়াতে ইসলামীও তাদের রাজনৈতিক টার্নিংয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে নিয়েছে। যে কারণে এখানে তাদের মাদার সংগঠন জামায়াত একবারে প্ল্যান-পরিকল্পনা করে তাদের সহযোগিতা করেছে যেন তারা জয় লাভ করতে পারে”।
বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ‘প্রলোভন বা অফার’ দিয়ে এবং নির্বাচনের সময়ও দেওয়া সহায়তা শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেতে সাহায্য করেছে করেছে বলে মনে করেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রশিবিরের জয়ের পেছনে গণঅভ্যুত্থানের একটি ভূমিকা আছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
বিশেষ করে সকল শ্রেণি, পেশা ও বয়সের অংশগ্রহণে জুলাই আন্দোলন হলেও, আওয়ামী লীগের পতনের পর সেই সাফল্যের অনেকটাই জামায়াত-শিবির নিজেদের দিকে নিতে পেরেছে।
একইসাথে আন্দোলনের অনেককে নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ উঠলেও তারা নিজেদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পেরেছে, যা এসব নির্বাচনে জয়ের পেছনে একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করা হয়।
এছাড়া অতীতে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি বা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার নজির রয়েছে। ফলে বর্তমানে আদর্শবাদী রাজনীতির জায়গায় কার্যকরী রাজনীতির দিকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে বলে মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের।
“যে নেতৃত্ব ক্যাম্পাসে কার্যকরী উপযোগিতা উৎপাদন করতে পারছে, অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে যে নেতৃত্ব নিজেদের প্রয়োজনীয়তাটা প্রমাণ করতে পারছে, তাদের পক্ষে ভোট যাওয়ার সম্ভাবনাটা বাড়ছে”, বলেন তিনি।
আর সে কারণেই শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা নেই দাবি করলেও তাদের সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী।
অবশ্য জয়ের কারণ হিসেবে নতুন রাজনীতির কথা বলেছেন খোদ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামও।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, জুলাই পরবর্তী কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছে সংগঠনটি, যেখানে মূল লক্ষ্যই ছিল শিক্ষার্থীরা কী চায় সেদিক নজর দেওয়া এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করা।
“আমার কাছে মনে হচ্ছে পুরাতন গৎবাঁধা যে রাজনীতির সিস্টেম এবং দলীয় রাজনীতির এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ক্যাম্পাসে ভূমিকা পালনের যে প্রবণতা ছাত্রলীগ বা পূর্ববর্তী সময়ে ছিল, এগুলো থেকে বেরিয়ে আমরা দীর্ঘ সময় ধরেই চেষ্টা করছি ছাত্রবান্ধব কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য”।
স্বাস্থ্য বিষয়ক, শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং, উদ্যোক্তা, অলিম্পিয়াড বা নানা ধরনের কর্মসূচি আয়োজনের কথা জানান মি. সাদ্দাম।
এছাড়াও তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক একটি পরিবর্তন হয়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
তারা বলছেন, বিশ্বজুড়ে ডানপন্থার যে উত্থান হচ্ছে তারই ধারাবাহিকতায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি তরুণদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
“এখনকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাথে তো আমরা জানি ডানপন্থিদের একটা প্রভাব আছে। আর ওই প্রভাবটাকে কাজে লাগিয়ে – যতই তারা বলুক আমরা লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করি না, কিন্তু সেই প্রভাব খাটিয়ে তারা বিভিন্ন হলে বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদের যে ডিমান্ডগুলো ওয়েলফেয়ার পলিটিক্সের মাধ্যমে যা যা দরকার, পানির ফিল্টার থেকে আরও যে ফ্যাসিলিটি দরকার তার জন্য তারা অনেকদিন ধরেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাথে লবিং করছে, ছাত্রদের হয়ে কথা বলছে”, বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সামিয়া জামান।
এরকম নানা মাধ্যমে ছাত্রদের কাছে পৌঁছাতে পারা শিবিরের জয়ের পেছনে একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।
এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে একটি বক্তব্য বারবার সামনে এসেছে। আর তা হলো আওয়ামী লীগ, বিএনপিকে দেখা হয়েছে- এবার জামায়াতকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।বিশ্লেষকরা বলছেন, শিবির নিজেই এই প্রচারণাটা ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।
“তরুণ শিক্ষার্থী, যারা শিবিরের লিগেসির সাথে পরিচিত নন, তারা হয়ত এই প্রচারণায় আস্থা রেখেছেন”, বলেন অধ্যাপক ফেরদৌস।
পূর্বকোণ/এএইচ