চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫

সর্বশেষ:

অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব

ড. মো. আবু তাহের

৩০ মার্চ, ২০২৫ | ৩:২০ অপরাহ্ণ

প্রখর মেধাবী ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী ইউ জিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বিগত ১৯ মার্চ ২০২৫ দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় মেয়ের বাসায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া-আসার মধ্যে ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৯৭৬ সালে একই বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি ১৯৭৯ সালে ক্যানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেকেন্ড মাস্টারস ও ১৯৮৪ সালে ওয়েস্ট অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান, কলা অনুষদের টানা তিন মেয়াদের নির্বাচিত ডিন,সিনেট সদস্য, টানা দশ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ৪২ বছরের শিক্ষকতাসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পর তিনি ২০১৮ সালে অবসরে যান। অতঃপর অধ্যাপক কাজী শহিদুল্লাহ ২০১৯-২০২৪ পর্যন্ত ইউজিসির ১৩ তম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অনুকরণীয় ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই মানুষটি শিক্ষার্থী -শিক্ষক – সহকর্মীদের কাছে যেমন জনপ্রিয় তেমনি দক্ষ প্রশাসক,বিশিষ্ট সংগঠক, দেশ ও সমাজ বিনির্মাণের কারিগর ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তার মৃত্যুতে জাতি একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ ও অভিভাবককে হারালো যা পুরো শিক্ষা পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

সহজ-সরল -সাদাসিধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত কাজী শহীদুল্লাহ ছিলেন একজন সৎ, বিনয়ী, সদালাপি ও সজ্জন মানুষ। উচ্চবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও অহংকার কিংবা দম্ভ কোনদিন তাকে যেমন স্পর্শ করতে পারেনি তেমনি মানুষের সাথেও খারাপ আচরণ করেননি। যাঁরা কাজী শহিদুল্লাহ চিনেন, তাঁরা বলবেন, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। ক্ষমতার পাশাপাশি থাকা সত্বেও কখনোই সেই পথে হাঁটেন নি, বরং শিক্ষকতা পেশাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। সবসময় সাহস, সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালনে তৎপর ছিলেন।

এখন শহীদুল্লাহ স্যারের সাথে আমার কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা উল্লেখ করতে চায়। ইউজিসি সদস্য হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ প্রাপ্তির পর আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবমুক্ত হয়ে করোনাকালীন ২ সেপ্টেম্বর-২০২০ ইউজিসিতে যোগদান করি। যোগদানের পরদিন আমি সহ অন্য নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ স্যারের ধানমন্ডি বাসায় দেখা করতে যায়। স্যার আমাদের ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। স্যারের দুই ছেলে ও এক মেয়ে সবাই অস্ট্রেলিয়ার বসবাস করে। এটাই ছিল স্যারের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পর ভাবিকে কোথায় দেখছিলাম তা মনে মনে চিন্তা করছিলাম। সেই সময় ভাবি বলে উঠলেন,আমার বড় বোনকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জমিদার আহমদ কবির মিয়ার ছেলের নুর মিয়ার সাথে বিবাহ দেওয়া হয়েছে। আর নূর মিয়া ছিলেন আমার আত্মীয় ও তালত।সেই সুবাদে স্যার হেসে বলে উঠলেন, তাহের সাহেব আপনি আমার আত্মীয় হয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে ইউজিসি সচিব মহোদয়কে নির্দেশ দিল আমাকে অর্থ ও গণসংযোগ ডিভিশনের দায়িত্ব অর্পণ করার জন্য। স্যারের দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে উক্ত দুটো ডিভিশনের দায়িত্ব পালনে আমি সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করেছি।

বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য স্যারের নেতৃত্বে আমি মনিটরিং ব্যবস্থাকে জোরদার করি। এমনকি ইউজিসি তে অনেকগুলো নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও পূর্বের নীতিমালাগুলো সংশোধন করা হয়। আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল স্যারের সান্নিধ্যে ও দিকনির্দেশনায় কাজ করার-এ জন্য আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।

ইউজিসির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও স্যার ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আমার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ ৩ মার্চ ২০২৫ আমার মেয়ে ওয়াসিফা তাবাসসুম এই বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অনার্সসহ এমবিবিএস পাস করার সংবাদটি জানানোর পর স্যার ভীষণ খুশি হয়েছিল ও আমার মেয়ের জন্য দোয়া করেছিল, আগামীতে সে যেন একজন ভালো ডাক্তার হয়ে দেশ ও জনগণের সেবা করতে পারে।

এটা সত্য যে,জন্ম -মৃত্যু নির্ধারিত। জাগতিক নিয়ম মেনে বর্ণিল এই পৃথিবী থেকে একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে। অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ অত্যন্ত সৌভাগ্যবান এইজন্য যে তিনি পবিত্র রমজান মাসে মহান সৃষ্টিকর্তার ডাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। রেগে গেছেন তার অগণিত শিক্ষার্থী-সহকর্মী- সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ যাদের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
আমরা স্যারের বিদায়ী আত্মার মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। এ শোক পরিবারের সদস্যরা যাতে বইতে পারে সেজন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করছি। একই সাথে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা করছি, পরম করুণাময় যেন অধ্যাপক কাজী শহিদুল্লাহ কে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন, আমিন।

লেখক : প্রফেসর, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (প্রাক্তন সদস্য, ইউজিসি ও উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট