চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

নেপাল ভ্রমণ:পর্ব-১৪

হাফিজা আক্তার

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৫:৫৭ অপরাহ্ণ

তথাস্তু সকাল ১০টা ৩০ এ আমরা তিনজন বাংলাদেশি, আমি, মিস ফারহানা এবং করিম সাহেব হোটেলের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বাক্স-পেটরা গুছিয়ে হোটেল হিমালয়ের গণটেক্সিতে করে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম। হোটেল কর্তৃপক্ষ এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর বিষয়ে কোন রিস্ক নিতে চাচ্ছে না। কারণ দুই দিন ধরে নেপালে কিসব নিয়ে জানি রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন চলছে। অবাক হওয়ার কথা নয় তারপরও অবাক হলাম নেপালে মানুষেরা রাস্তায় নেমে সরকার বিরোধী প্রতিবাদ দেখে। তারা কেন জানি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাচ্ছে। তারপরও মাত্র ১৫/২০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম।

 

যাওয়ার পথে দেখলাম একটি কার রাস্তায় ফ্রি ভাবে চলাফেরা করা একটি গরুকে বাঁচাতে গিয়ে ফুটপাথে উঠিয়ে দিয়েছে। তারপরও গরু এবং গাড়ি দুটোই হালকা পাতলা আহত। তবে তাবৎ জনতা মানে গাড়ির ভিতর এবং রাস্তার জনতা যতটা না গাড়ি, ফুটপাথ আর গাড়ির বাসিন্দাদের নিয়ে ব্যস্ত তার চেয়েও বেশি ব্যস্ত গরুটার দেখভাল নিয়ে। কাউকে দেখলাম গরুর পা টিপছে, কেউ প্রণাম করছে আর কেউবা কপাল চাপরাচ্ছে তাদের আসন্ন দুর্ভোগের চিন্তায়। আর গরুটাও একটু আজিব কিসিমের, অনেকটা বিড়ালের মতন স্বভাব। এসবে তার কোন বিকার নেই বরং সে উপভোগ করছে খুব তারিয়ে তারিয়ে শান্ত আর ধীরস্থীরভাবে। মনে হল মানুষের এসব আচরনে সে খুবই অভ্যস্ত। আমাদেরগুলোর তো দেখি মেজাজ খুব চড়া থাকে, দু’চারটা ঢুঁস বা নিদেনপক্ষে লাথি না দিলে তাদের মজা নেই। গরু নেপালিদের দেবতা কি না কে জানে। তবে বোম্বে শহরে যতটা না ফ্রি গরু দেখেছি কাঠমান্ডুতে তার সিকি আনাও নেই। বলতে গেলে এটাই প্রথম। যাহোক এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখলাম দুটো ধারা। একটায় লম্বা লাইন আর অন্যটায় বিচ্ছিন্নভাবে লোকজন ঘোরাফেরা করছে। একটু দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কোন দিকে যাবো। শশব্যস্ত হয়ে আমাদের See off করতে আসা হোটেল হিমালয়ের টেক্সি ড্রাইভার এবং একজন হেলপার আমাদের লম্বা লাইনে না দাঁড়াতে বলল। কিন্তু কেন? কারণে তারা বলল, “এই লাইনটা হচ্ছে যেসব নেপালিজ মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে শ্রমিক হিসেবে তাদের লাইন। তাদের বেশীরভাগ অশিক্ষিত বলে নিজে নিজে তথ্য ফর্ম পূরণ করতে পারে না। তাদের হয়ে করে দেয়ার লোক রাখা আছে।” বাহ্….চমৎকার ব্যবস্থা। আমাদেরও তো প্রচুর লেখাপড়া না জানা শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে যায় শ্রমিক হিসেবে। তারা এসব তথ্য ফর্ম পূরণ করতে না পেরে উদভ্রান্তের মত এয়ারপোর্টের এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। করুণ মুখ করে লিখতে জানে এমন যাত্রীদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকে যদি পূরণ করে দেয়। আমি প্রতিবার বিদেশ যাত্রাকালে এরকম বহু ফর্ম পূরণ করে দিয়েছি যথাসাধ্য। বিস্ময়ভরে শ্রমিকদের দেখছি। প্রত্যেকটি শ্রমিকের কপাল জুড়ে সিঁদুরের বড় লাল টিপ আর গলায় ঝুলানো পলিস্টারের চিকন আর পাতলা কারো লাল, কারো হলুদ বা সবুজ এই তিন রংয়ের উত্তরীয়।  কারো কারো গলায় অতিরিক্ত হিসেবে গাঁদা ফুলের মালা রয়েছে। দেখলাম শ্রমিকরাও আমাদের দেখছে নিবিষ্ট মনে। দ্রুত সরে পড়লাম।

গেলাম লাগেজ চেক ইন করতে বলাকা কাউন্টারে। সেখানেও দুটো লাইন। একটায় মোটামুটি নেপালি ছাত্রদের দিয়ে ঠাসা। মনে হল বন্ধুরা বন্ধুরা মিলে বুদ্ধি করে দাঁড়িয়েছে যাতে সহযাত্রী হয়ে যাওয়া যায়। এদেরও একই অবস্থা। কপালে সিঁদুরের টিপ আর গলায় ঝুলানো লাল-হলুদ-সবুজ উত্তরীয়। কারো কারো গাঁদা ফুলের মালা। মালা থেকে আবার দু’একটা ফুল ঝরে পড়েছে মেঝেতে। ফুলগুলো একেবারে সতেজ। দেখে মনে হলো আজ সকালেই গাছ থেকে তোলা। ফুলগুলো থেকে একটা হালকা সুরভি চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।

চেক ইন শেষে গেলাম ইমিগ্রেশনে। ইমিগ্রেশন ফর্ম হাতে সবাই সাত আট সারিতে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু ইমিগ্রেশন অফিসার মোটে তিনটা বুথে কাজ করছে। আজিব! বাকীগুলোতে খবর নেই। দাঁড়িয়ে আছি তো আছি। দু’একজনকে দেখলাম হালকা মুডে ঘোরাফেরা করছে, কেউ খোশগল্পে মশগুল। আমিও দাঁড়িয়ে আছি নির্বিকার। যেহেতু হাতে অঢেল সময় তাই একটু তামাশা দেখলে মন্দ কি। কিন্তু না, পিছনে কারো কারো বুঝি তাড়া ছিল। তাই হালকা গুঞ্জণ উঠলো। গুঞ্জণের জন্যই কি না তিনজনের একজন কাউকে কিছু বললেন। তারও কিছু পরে একজন অলস ভঙ্গিতে আড়মোড় ভেঙ্গে বুথে এসে বসলেন।

ইমিগ্রেশন পার। এবার কি করব ভাবছি। এত সময়। গিয়ে বসলাম যাত্রীদের ওয়েটিং কর্ণারে। ডিউটি ফ্রি শপ বলে তেমন কিছু নেই। দু’চারটা দোকানে কিছু পণ্য বিক্রি হচ্ছে আর দু’চারটায় ডেকোরেশন চলছে। নেপাল দেখে মনে হলো এরা পাকিস্তানি বা ভারতীয়দের মত ব্যাবসায়িক বুদ্ধি একেবারেই রাখেনা। বা আমাদের মত যেন তেনতে ভেজাল মেশানোর বুদ্ধি। কিছুটা সহজ সরল আর গা ঘেঁষা টাইপের। কোন কথা জানতে চাইলে বা বললে একদম গা ঘেঁষে উত্তর দিবে। “গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না”—স্লোগানটা আসলে নেপালে পাঠানো উচিত। সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হবে।

পূর্বকোণ/টিএফ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট