চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

নেপাল ভ্রমণ: পর্ব-১৩

হাফিজা আক্তার

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৮:৩২ অপরাহ্ণ

ঢুকে অবাক হলাম এ রকম ঘিঞ্জি, প্রাচীন আর পর্যটন এলাকায় দোকানি একজন মহিলা তার ওপর ঘোমটা টানা।তার সাথে একজন মহিলা কাষ্টমার বসে চুড়ির দরদাম করছে। চুড়িগুলো বেশ সুন্দর মনে হলো। নিলাম কয়েক জোড়া করে দুজনে। আরো কিছু পুঁতির মালা দরদাম করে কিনতেই প্রায় ইফতারের সময় হয়ে এলো। দোকানে তখন আরো দু’তিনজন নারী কাস্টমার ঢুকেছে। জায়গা প্রায় নেই। ভাবছি কোথায় বসে পানি খেয়ে ইফতার করবো। মিস ফারহানা আর আমার মধ্যে ইফতার নিয়ে কথা চালাচালির মধ্যেই জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি ইফতার করতে চাচ্ছো?” একটু অবাক হয়েই বললাম, “চাই।”এত কাস্টমারের মধ্যেই সে তখন পলিথিনে মোড়ানো কিছু চিটচিটে খেজুর এগিয়ে বলল, “আমিও রোজা রেখেছি। আমার নাম হাজেরা। এই নাও ইফতার করো”।

আবারও টাসকি খেলাম। সে যদি মুসলিম হয় আর রোজা রাখে তবে তার পরিবারের জন্য ইফতার না বানিয়ে এখানে চুড়ি-মালা বিক্রি করছে? আজিব! আর নিজের জন্যও ইফতার শুধু কয়েকটা জড়ানো সস্তা খেজুর আর এক বোতল পানি। অথচ ইফতারের পূর্বেও তার মুখ দেখে বোঝার জো ছিল না সে রোজাদার। মুখে আর কথায় কোন ক্লান্তি বা মলিনতা ছোঁয়নি। সুন্দরভাবে দরদাম করছে। কাস্টমারকে পণ্য বুঝিয়ে দিচ্ছে আর রুপি বুঝে নিচ্ছে। আমি তাকেও আমার ইফতার থেকে ভাগ দিলাম আর সেও সাদরে হাসিমুখে নিল। আমি কোনায় একটি টুলে বসে ইফতার করলাম কিন্তু সে করল না। সব কাস্টমারের সাথে লেনদেন চুকিয়ে বের হয়ে গেলে তারপর দোকানের ঝাঁপি ফেলেছে। আমার সাথে হঠাৎ চোখাচোখি হওয়ায় বলল, “এখন আমি ইফতার কবর”। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঢাকাই টুপি ওরফে নেপালি টুপির দোকান খুঁজতে লাগলাম। ভাবছিলাম আমাদের দেশ হলে কি হত? আমাদের পুরোন ঢাকায় এ ধরনের কোন স্থানে কোন মহিলা দোকানদার আছে কি না জানা নাই। থাকলেই বা কী হতো তা জানি না। তবে পুরনো ঢাকার প্রায় অশিক্ষিত এক দোকানদারের আরেকজনের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী সম্বন্ধে তার মন্তব্য ছিল এ রকম, “মামু! মেয়ে জাতের কাজ হচ্ছে তাঁর স্বামীর দুই চাইরটা বাচ্চা পয়দা করা আর স্বামী-সন্তান-শ্বশুর-শাশুড়ি-দেবর-ননদ-ভাসুর এদের সেবা যত্ন করা। এর বাইরে যাইতে দিবেন না। দেয়ার বিধানও নাই।” প্রায় একই মন্তব্য যা US Bangla Plane Crash-এর পর করেছিল একজন পদোস্থ পুরুষ।

আসলে আমরা এখন জঙ্গলে বাস করছি। শিক্ষার সংজ্ঞায় বলা হয় যে এটা মানুষের আচরণগত পরিবর্তন আনে। এখানে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিতের মধ্যে আচরনগত তফাত প্রায়ই দেখি না। যাইহোক, এক গাদা বাহারি আর ঝাকানাকা নেপালি টুপি কিনে হোটেলের দিকে পা রাখলাম। রাস্তা সোজা সাপ্টা। শুধু একজায়গায় বাঁয়ে টার্ন। আমার বেশ মনে আছে। তারপরও সহকর্মী আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না আমরা সঠিক পথে আছি কিনা? যে কোন বাঁয়ে টার্ন দেখলেই বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন এটাই সেই বাঁয়ের রাস্তাটা। চলুন বাঁয়ে যাই। একবার সত্যি সত্যি ভুল করে বসলাম। ঢুকেই ভাঙ্গাচোড়া প্রায় অন্ধকার রাস্তা। তার উপর জায়গায় জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে আছে। একটু পর পর লাফ দিয়ে রাস্তা পেরুতে হচ্ছে। এখন আর রাস্তা চিনতে পারছি না। এবার আমি সহকর্মীর মত ঘাবড়ে গেছি। হঠাৎ দেখি মধ্যবয়সী এক দম্পতি পরিপাটি হয়ে একই কায়দায় লাফিয়ে লাফিয়ে বৃষ্টির পানি এড়িয়ে কোথায় যেন যাচ্ছেন। তাদের কাছে আমরা সাহায্য চাইলাম। বলল, “এই তো পরের বাঁয়ের রাস্তা। চলুন আমাদের সাথে। আমরা ওদিকেই বন্ধুর পার্টিতে যাচ্ছি”। তথাস্তু নির্বিঘ্নে হোটেল হিমালয়ে পৌঁছালাম। পৌঁছেই আমরা রিসিপশনে সেহরী নিয়ে আলাপ সেরে উপরে যার যার রুমে ফিরে গেলাম। এবার সেহরীতে আগের দিনের মত ভয় ভয় লাগেনি। দু’জনে হালকা পাতলা গল্প করতে করতে ডাইনিং-এ পৌঁছালাম। কথায় আছে একা তো বোকা দু’জনে সোজা। আজকে আমরা তিনজন সেহেরীতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনজনই বাংলাদেশি। মেনুও যথারীতি চমৎকার। এবার এড়িয়ে যাওয়া নয় আমরা তিনজনই গল্পে মতে উঠলাম। তৃতীয় ব্যক্তি নেপাল বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ আর ব্যাবহারে বেশ অমায়িক ও মৃদুভাষী। উনিও অন্য আরেকটি Programme-এ ICIMOD-এ এসেছেন। এটা নিয়ে উনার দশমবার নেপাল ভ্রমণ। ওদিকে উনার মেয়ে দীর্ঘদিন পর UK থেকে এসেছেন মা-বাবার সাথে ঈদ করতে। মেয়ের তো তর সইছে না তার বাবার সাথে দেখা করার। উনি দশ দিন যাবত নেপাল। মেয়ে নাকি একবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে নেপাল রওনা দেয় দেয় অবস্থা। বলে কয়ে ঠেকিয়েছেন এই যা।

সব মেয়ের আসলে বাবার প্রতি এমনই ধারা। মেয়ের গল্প যেন আর থামতেই চায় না। সেহেরী না হলে আরো শোনা যেত। কিন্তু উপায় নেই। হাতে কিছুটা সময় থাকতেই উঠে পড়লাম আর আমাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে ওয়েটার এবং শেফদের ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা তিনজনই একসাথে উপরে উঠে এলাম। সেহরীর শেষ পানিটুকু খেয়ে আর নামাজ পড়ে শুধু শুধু বিছানায় এপাশ ওপাশ করলাম। আজ সকাল ৯টায় চেক আউট। কিন্তু ফ্লাইট ২টায় তাও বাংলাদেশ বিমানে যার টাইম স্কেজিউল নাকি কোন ঠিক ঠিকানা নেই বলে জনশ্রুতি আছে। ইচ্ছামত উড়ে ইচ্ছামত নামে। যেহেতু এটা আমার প্রথম বলাকা ভ্রমণ। ভ্রমণ চমৎকার ছিল যদিও তবু মনে হলো একটু তাড়াতাড়িই আমরা এয়রপোর্টে রওনা হচ্ছি। এদিকে আমার সহকর্মীর কিছু কেনাকাটা বাকি। নয়টার আগে কি দোকানপাট খুলবে? এদিন আবার কি কারণে যেন নেপালে সরকারি ছুটি। আমি আর রুমে না থেকে হিমালয় হোটেলের পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার জন্য নিচে নেমে এলাম। দারুণ সব জিনিসে সুসজ্জিত চারপাশ। একটু পর দেখলাম বাংলাদেশের করিম সাহেবও লনে প্রাতঃভ্রমণে। তাকে বললাম আমাদের চকলেট কেনার বিষয়ে। উনি বললেন হোটেলের কাছেই একটি সুপার শপ আছে যেখানে চকলেট রয়েছে বিভিন্ন ধরনের। গেলাম তিনজনে সকাল সাতটায়। গিয়ে দেখি দোকানি দু’জন অল্পবয়সী মেয়ে। নির্বিঘ্নে পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আর চারিদিকে ছুটির দিনের সকালের নীরবতা বিরাজমান।

পূর্বকোণ/টিএফ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট