চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

নেপাল ভ্রমণ: পর্ব-১১

হাফিজা আক্তার

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ | ৯:০৩ অপরাহ্ণ

আর ছেলেরা সব গতানুগতিক পোশাকে। শুধু টুপিটা ভিন্ন। সমাজের গণ্যমান্যরা বা মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তরা ঝকমকে রঙ্গিন এক ধরনের টুপি পরেন। বাকীদের কালে ভদ্রে দেখেছি। এই টুপির নাম নেপালি টুপি। কিন্তু পূর্বে এগুলোকে বলা হত ঢাকাই টুপি। কারণ ঢাকার বংশাল নাকি চকবাজারের টুপির কারিগররা এই টুপি বানিয়ে নেপালে চালান করত। ঐতিহাসিকভাব এটার জিওগ্রাফিক্যাল আইডিন্টিটি হলো ঢাকা আর ভোক্তা ছিল নেপালিজ। যেহেতু ঢাকায় তৈরি হত তাই নাম ছিল ঢাকাই টুপি। এখন যেহেতু শুধু নেপালে তৈরি হচ্ছে তাই নাম পাল্টে রেখেছে নেপালী টুপি। যাহোক রাস্তার ধার ধরে হেঁটে চলেছি আমরা দল বেধে। কিছুদূর গিয়ে আমরা দুজন বাংলাদেশি পিছিয়ে পড়লাম। বিশেষ করে আমি। কারণ একটু এদিক ওদিক চোখ বুলালে গতি স্লো হয়ে যায়। দলের বেশীর ভাগের উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু শপিং আর আমার দর্শন-শপিং-ফটোগ্রাফি। রাস্তায় কোন রিক্সা চোখে পড়েনি। তবে প্রচুর মোটরসাইকেল আছে। আমাদের পাঠাও ব্যবসা নেপালে ভালোই জেঁকে বসেছে। নেপালে পাঠাওকে কখনোই ফুটপাথে উঠতে দেখিনি আর বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রয়েছে। ট্রাফিক জ্যাম নেই বললেই চলে। যাহোক, ছবি তুলতে তুলতে এসে পৌঁছালাম দরবারে। এতক্ষণে বুঝলাম কেন দরবার এর নাম। চারিদিকে নেপালের প্রাচীন রাজা বাদশাহদের ঘর বাড়ি আর দরবার এখানে। শত শত বছরের পুরোন আর নকশাকাটা। কত হরেক রকমের যে নকশা। কোনটা ফুল-লতা-পাতা, কোথাও বাঘ-সিংহ-হরিন-ময়ূর, বা বিভিন্ন দেব দেবীর মুখ দিয়ে দেয়াল-চৌকাঠ-দরজা-জানালা-সদর গেইট-পানির কল থেকে শুরু করে ঘুলঘুলি পর্যন্ত। কিছু কিছু প্রাসাদ ভাঙ্গাচোরা আর কিছু বিধস্ত। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দেখলাম যত্ন করে মেরামতি চলছে। আর দেখলাম লোকে লোকারণ্য সব জায়গায়। অসংখ্য মানুষ প্রায় গা ঘেষাঘেষি করে বসে আছে। তার উপর বেশুমার কবুতর উড়ছে আর বসছে এদিক ওদিক। প্রচুর ঘিঞ্জি চারদিক। এর মধ্যে আবার অনেকে ভ্যানে দোকান সাজিয়েছে শত বছরের পুরনো কাসা-পিতলের বিভিন্ন অবয়ব-তৈজস-মুর্তির আর এন্টিকস রূপার গয়না, পিতলের গয়না আর দেখলাম বিভিন্ন ধরনের রত্ন দিয়ে গড়া প্রাচীন দুল ইত্যাদি দিয়ে। খুব একটা দাম নয়। নিব নিব করে নিলাম না সত্য মিথ্যা যাচাই করতে না পেরে। দেখলাম একটি প্রাচীন জলাধার। কী অদ্ভূদ নকশায় বানানো। এখন আর পানি নেই। তবে জায়গায় জায়গায় ময়লা স্তুপীকৃত। আর দেখলাম প্রাচীন রাজা বাদশাহদের মন্দিরালয়। সেখান থেকে ভক্তিমূলক গান ভেসে আসছে। প্রচুর মানুষ মন্দিরে ঢুকছে আর বড় বড় সিদুঁরের টিপ নিয়ে বের হচ্ছে। সন্ধ্যা গড়াতে আর বেশী নেই। যতটুকু পারা যায় এই নিভুনিভু সন্ধ্যা আলোয় দরবার এলাকার এইসব ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ছবি তুলি নিলাম আর কিছুটা কল্পনায় নিমগ্ন হলাম। আজ থেকে শত শত বছর আগে এটা কর্মচঞ্চল ছিল। কত রাজা এলেন আর গেলেন। রাজাদের জীবন আর প্রজাদের জীবনকে ঘিরে কত হাসি-কান্না-আনন্দ-উৎসব-বিচার-সালিস-যুদ্ধ-বিগ্রহ-সংঙ্গীত-সাহিত্য রচিত হয়েছে।


এই দরবারের দিকে তাকিয়ে আমি কেমন জানি অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। এই দরবার রাজগ্রন্থাগারে রক্ষিত একটি বইয়ের কপি দিয়ে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম পদ সংকলন তথা সাহিত্য নিদর্শন “চর্যাপদ”-এর একটি খণ্ডিত পুঁথি এই নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা থেকেই উদ্ধার করে এই বিস্ফোরণ ঘটান। উল্লেখ্য, রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র ১৮৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর “Sanskrit Buddhist Literature in Nepal”-শীর্ষক গ্রন্থে নেপালের এই দরবারে এরকম একটি বই রক্ষিত আছে বলে তিনি আভাস দেন। এই গ্রন্থের সূত্র ধরে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালে গিয়েছিলেন বইটির খোঁজে প্রথম ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে কিন্তু ব্যর্থ হন খুঁজে পেতে। হাল না ছেড়ে তিনি পুনরায় যান ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কিন্তু বিধিবাম এবারও ব্যর্থ। তারপর একটা লম্বা বিরতি দিয়ে ১৯০৭ সালে গিয়ে চরম সাফল্য পান। নেপাল দরবার গ্রন্থাগার থেকে শুধু “চর্য্যাচর্য্যাবিনিশ্বয়” (যা পর্বর্তীতে “চর্যাপদ” নামে পরিচিতি পায়)-ই নয় দূর্লভ আরো ৩টি পুঁথি আবিষ্কার করেন। সেগুলো হচ্ছে-সরহপাদের দোহাকোষ, কৃষ্ণপাদের দোহাকোষ, ডাকার্নব। এই চারটি বই এক করে ১৯১৬ সালে, “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা” নামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশ করে শুধু বাংলাই নয় তাবৎ ভারতজুড়ে তাক লাগিয়ে দেন।

বলে রাখি, বাংলা সাহিত্য ধারায় তখন ইংরেজ সাহিত্যের মেজাজ ছিল চরমে। চর্যাপদ আবিষ্কারের পর সাহিত্যের মোড় ঘুরে যায় সাই করে উল্টো দিকে অর্থাৎ প্রাচীনকালের ধারায়। শুধু তাই নয় এটা বহির্বিশ্বেও ব্যাপক প্রভাব ফেলা। এমন কি এই দরবার রাজগ্রন্থাগারের প্রত্বতাত্বিক অস্তিত্বকে এই গ্রন্থ প্রশ্নের উপর দাঁড় করিয়ে দেয়। বিশ্বের তাবৎ জ্ঞানীদের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে এখানে। দলে দলে তারা আসতে থাকেন আরো কিছুর সন্ধানে। সর্ব পশ্চিমের ইউরোপ থেকে সর্ব পূর্বের জাপান অবদি এই আলোড়ন বয়ে যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও আরো বইয়ের লোভে এই দরবারে আসা-যাওয়া করতেন ঘন ঘন আর এই আসা-যাওয়ার ফলাফল হচ্ছে তিনি এই দরবার গ্রন্থাগার থেকেই দ্বাদশ বা মতান্তরে ত্রয়দশ শতকে রচিত আরেকটি যুগান্তরসৃষ্টিকারী বই কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর, “রামচরিত” উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ড. প্রবোধ চন্দ বাগচী আবিষ্কার করেন যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী “চর্য্যাচর্য্যাবিনিশ্বয়” নামে যেটা আবিষ্কার করেছিলেন সেটা আসলে তিব্বতে রক্ষিত মূল পুঁথির “চর্যাগীতিকোষ”-এর একটি কপি মাত্র। তালপাতার উপর লেখা সাড়ে ১২ ইঞ্চি বাই দেড় ইঞ্চির মাপে ৭০ পৃষ্ঠার একটি বই যেখানে পদগুলোর ব্যাখার জন্য মূল বই এর ১০০টি পদ বা কবিতা থেকে মোট ৫১ট পদ নেয়া হয়েছিল। তবে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক আবিষ্কৃত কপিটিতে পাওয়া গেছে সাড়ে ৪৬টি (৪৬.৬) পদ। কারণ তিনটি পাতা ছেড়া ছিল। বইটির ভাষা ছিল কিছুটা দুর্বোধ্য বা সহজভাবে বললে আলো-আঁধারির ভাষা। এখন কথা হচ্ছে চর্যাপদের ভাষাকে কেন এর রচয়িতারা এমন আলো-আধাঁরিতে রেখে দেন। কারণ বাংলায় মুসলমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবার আগে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুসমাজে বাংলার বৌদ্ধগণ নাস্তিক হিসেবে বিবেচিত হন এবং বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব ঝুকির মধ্যে পড়ে গেলে সহজিয়াপন্থি বৌদ্ধ সিন্ধাচার্যগণ বৌদ্ধধর্মের কথা বা মর্মবাণীগুলো চর্চার অভাবে হারিয়ে যাবার আশংকা করেন। নির্যাতন-পীড়নের ভয়ে তাঁরা তাঁদের ধর্মীয় বাণীগুলোকে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুসমাজের চোখ এড়িয়ে খুব নিরবে নিভৃতে নদীর পাড়ে/কুটিরে সংকেতিক ভাষায় বিভিন্ন সামাজিক বা প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটের আড়ালে ঈঙ্গিতে রেখে যান। আরো পরে শুধু নিপীড়ন-নির্যাতনই নয় প্রাণনাশের হুমকির মুখে সিন্ধাচার্যগণ তাঁদের সমস্ত পুঁথিপত্র নিয়ে তিব্বত-নেপাল-ভূটান চলে যান। তথাস্তু নেপালের রাজারা ছিলেন হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। তারপরেও নেপাল রাজদরবারে বাংলার বৌদ্ধ সিন্ধাচার্যগণ নিরাপদে আশ্রয় পান এবং তাদের পুঁথিগুলো দরবার রাজগ্রন্থগারে সযত্নে রক্ষিত থাকে শত শত বছর ধরে।

পূর্বকোণ/টিএফ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট