চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

নেপাল ভ্রমণ: পর্ব- ০৯

হাফিজা আক্তার

২ নভেম্বর, ২০১৯ | ১:৫৩ অপরাহ্ণ

ডিনার শেষে সকল প্রতিনিধিগন একসাথে ICIMOD-এর গাড়িতে করে সন্ধ্যা ৮:৩০ এ হোটেল হিমালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। পৌঁছেই আমি দ্রুত গেলাম রিসিপশনে আমার সেহেরী টাইম, মেনু আর wake up call-এর জন্য বলতে। কিন্তু কিছুটা নিরাশ হলাম কারণ রিসিপশনের দাঁড়ানো একটি ছেলে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল, “আজ রুম সার্ভিস দেওয়া যাচ্ছে না, দুঃখিত। কারণ তোমরা আজ সংখ্যায় বেশি। আর সবাই এক এক সময় উল্লেখ করেছ। তোমাদের সবার টাইম অনুযায়ী এক এক রুমে এক এক সময়ে দেওয়ার মত লোক আমাদের হোটেলে নেই। তোমাদের সবাইকে ডাইনিং-এ এসে রাত তিনটায় সেহেরী খেতে হবে।” মনটা দমে গেল। এই সময়ে আমার একা রুম থেকে নিচের ডাইনিং-এ আসা কতটুকু নিরাপদ হবে কে জানে? কোন ফাঁদ না তো? কেমন অস্বস্তিকর। আমার চেহারা পড়ে সে এবার কিছুটা সহানুভূতির গলায় বলল, “ভাবছ কেন? অনেকেই তো থাকবে। তোমার খেতে খারাপ লাগবে না। আর wake up call-কখন চাও?” তারপরও মনমরা ভাবটা কাটছেই না। মিন মিন করে wake up call সময়টা জানিয়ে মিস ফারহানাকে বললাম বিষয়টা। রুমে ফিরে আর হুশ নেই। কখন কাপড় পাল্টাব আর কখন শাওয়ার নিব। ঘুমে অচেতন হওয়ার যোগাড়। Ultra speed-এ সব সারলাম আর রুমের লাইট কোনমতে অফ করে চাষা ঘুম। মাবুদ, wake up call না থাকলে বিপদ ছিল। দুরু দুরু বুকে যাওয়া উচিত হবে কি হবে না কিছুক্ষণ ভেবে আল্লাহর নামে রওনা হলাম। সবচেয়ে নিচে আর সবচেয়ে কোনায় হচ্ছে ডাইনিং।

রাত তখন ২: ৪৫ কি ৫০। সুনশান করিডোর পার হয়ে লিফট। লিফটের উঠা নামার শব্দটা কেমন বিকট লাগছে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে লিফট থেকে নামার পরই দেখলাম বিরাট এক সেকেলে দেয়াল ঘড়ি শব্দ করে দুলছে। এটা কি নতুন লাগিয়েছে? নাকি আগেও ছিল কে জানে? দেয়াল ঘড়ির পাশ দিয়ে গেলেই প্রথমে বার। কালো কাপড়ে ঢাকা। কালো কাপড়ে কেন? শুধু দরজাটা টেনে দিলেই তো হয়। হয় না? আজব। তারপর ইনফরমেশন ডেস্ক। কেউ নেই বসে। থাকার কথাও নয়। এই অবেলায় কার কি ইনফরমেশন দরকার পড়বে। ইনফরমেশন ডেস্কের বরাবর মুখোমুখি রিসিপশন ডেস্ক। তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যায় কথা বলা ছেলেটা রিসিপশন ডেস্কের একটি টুলে বসে ঢুলছে। আমার সাথে চোখাচখি হওয়া মাত্র একটু থতমত খেয়ে সোজা হয়ে বলল, “Good Morning, Madam।” আমিও প্রতিউত্তর দিয়ে একটু থেমে চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম। লবির শূণ্য সোফা আর কিছু হলদেটে লাইটে কেমন আলো-ছায়ার মায়াবী খেলা। লবির একপাশে ডাইনিং। দেখলাম সাদা লাইট জ্বলছে অর্ধেকটায় বাকি অর্ধেক আবছা আলো। সাথে চামচ বাটি নাড়াচাড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। শব্দ ধরে এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিলাম। দেখলাম দু’জন ওয়েটার কাজ করছে আর একজন শেফ রান্না নিয়ে ব্যস্ত। আমার সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্র বলল, “আমাদের আরেকটু সময় লাগবে। এই হলো বলে। তুমি শুধু পাঁচ মিনিট অপেক্ষা কর।” ছোট্ট করে OK বলে লবির সোফায় এসে বসলাম। পুরোটা জুড়ে আমি একা বসে আর কোনায় রিসিপশন ডেস্কে বসা সেই ঘুমে ঢুলঢুলু ছেলেটা। চারপাশের পরিবেশে কেমন একটু নিমগ্ন হয়ে গেলাম। হঠাৎ পাশের সোফায় বসা একজনের প্রশ্নে আমি চমকে গেলম, “Where are you from?” সে কখন এসে বসল খেয়ালই করিনি। বললাম এবং সেও জানাল সে পাকিস্তান এবং আফগান সীমান্তের পশতু নাকি কোথায় তার বাড়ি। যাহোক, কথা এটুকুই।

এরপর খাবারের ডাক পড়ল। গিয়ে দেখি আরো দু-তিন জন। আমি ছাড়াও আরও একজন বাংলাদেশি মেয়েও রয়েছে। যাহোক, দারুণ সব জিনিস দিয়ে সেহেরীর প্লেট সাজানো। সবগুলো খাবার ফ্রেশ আর গরম গরম। মেনু হচ্ছে এক প্লেট সদ্য ভাজা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আরেক প্লেটে দুটো সেদ্ধ মুরগির ডিম, এক বাটি টক দই, এক প্লেট ফ্রুট সালাদ, এক বাটি ঘন মুগ ডাল, এক প্লেট কাটাবিহীন মাছ ভাজা মনে ফিস নাগেট কিন্তু শক্ত নয় বেশ নরম এবং ক্রিসপি। আর সাদা ভাত। এক গ্লাস দুধ সেধে গেল কিন্তু কেউ নিলাম না। ও হ্যা, সাথে আলাদা করে বড় বড় কলাও ছিল। পানীয় ছিল ফ্রুট জুস আর ঠান্ডা পানি। সেহেরী পার্টিতে আমরা চারজন বাংলাদেশি। দুজন মেয়ে আর দুজন ছেলে। বাকীরা পাকিস্তান কাম আফগান সীমান্তের বাসিন্দা। খাবারে মনযোগী হলাম। কারণ সেহেরী টাইম একে তো অবারিত নয় নির্দিষ্ট, অন্যদিকে বিদেশ বিভূঁইয়ে কেউ মাইকে তাগাদা দিবে না। অন্যরা সবাই গল্পে মশগুল। আমার সাথেও কথা বলতে চাইলো যেচে। কিন্তু সব মিলিয়ে শুধু ফরজ উত্তর দিয়ে গেলাম। আনুষঙ্গিক উত্তর এড়িয়ে গেলাম। যাতে গল্পে নয় আমার আগ্রহ সেহেরীতে এটা ভদ্রভাবে বোঝানো যায়। আমি ভর পেটে পানি খেতে পারি না। বদ হজম হয়, তারপর এসিডিটি। আমার টার্গেট সেহেরী শেষে রুমে ফিরে পানি খাওয়া যাতে একেবারে খাবারের পর পর না হয়। তাই হলো দ্রুত খাবার খেয়ে একটু আগেই রুমে ফিরে এলাম এবং পানি খেয়ে নামাজের অপেক্ষায় রইলাম।

 

পূর্বকোণ/টিএফ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট