চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

নেপাল ভ্রমণ: পর্ব- ০৫

হাফেজা আক্তার

৬ অক্টোবর, ২০১৯ | ৯:৫৬ অপরাহ্ণ

তারপর বৃষ্টির মধ্যে ট্যাক্সিতে করে ফিরতি যাত্রা। নতুন দেশ, বৃষ্টি, পাহাড়ি রাস্তা, নির্জনতা, আনন্দের বিহ্বলতা, ভ্রমণের ক্লান্তি আর রোজাজনিত শরীরের অবসাদ, সব মিলিয়ে আমি কথায় নয় কল্পনায় ডুব দিলাম।
ভাবছিলাম, আমি আমার দেশে এই রোজাতেই যেটা আমরা রহমত, বরকত আর মাগফেরাতের মাস হিসেবে মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আর যেখানে ৮০% উপর ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এরকম বৃষ্টিতে দুজন মেয়ে ট্যাক্সিতে চড়ে একটি মোটামুটি নির্জন রোপওয়ে পাহাড়ী ভ্রমণে বের হলাম।

পাহাড়ের তিনটি শিখর পেরিয়ে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছালাম পায়ে হেঁটে। পাহাড়ী রাস্তা ধরে কোন মসজিদ বা মন্দির বা গির্জা বা পেগোডা বা কোন দর্শণীয় স্থান দেখতে কি কি ঘটতে পারে এবং ঘটনা ঘটার পর কি কি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে? ভাবনার গভীরে প্রবেশের মুখে আমি প্যানিক এটাকের মুখোমুখি হলাম। বৃষ্টি আর শীতল আবহাওয়ার মাঝেও ঘেমে উঠলাম তর তর করে আর শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল। আমার এই অবস্থায় মিস ফারহানা তাড়াতাড়ি বলতে লাগলেন, “আপনার কি খারাপ লাগছে? রোজা রেখে এত জার্নি!” বস্তুত এই ভ্রমণের নকশাদার ছিলেন তিনি। আমি কোন মতে বললাম, “না, না..মনে হয় মোশন সিকনেস।” এরপর মাথাটা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলাম। আর অনুভব করছিলাম ভাগ্যিস সৃষ্টিকর্তা কোন মানুষকে অন্যের মন পড়ার ক্ষমতা দেননি। দিলে কি আমার মনের কথা পড়ে মিস ফারহানারও প্যানিক এটাক হত বা ট্যাক্সি ড্রাইভার ভিমড়ি খেত? এটাকের কারণ হিসেবে জীবন থেকে নেয়া দুটো অভিজ্ঞতা জানিয়ে রাখি। একটি হচ্ছে মন্তব্য, আরেকটি ঘটনা।

US Bangla-এর বিমানটি যখন ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে আছড়ে পড়ার নিউজ দেখছিলাম আর হাহাকার করছিলাম হতভাগ্য যাত্রীদের জন্য তার মধ্যে দুই একজন মহিলা যাত্রী ছিলেন যারা নেপাল গিয়েছিলেন আফিসের কাজে একা তখন বিধস্ত এই আমার সামনে একজন পুরুষ কর্মকর্তার আঙ্গুল উঁচিয়ে উত্তেজিত মন্তব্য ছিল, “মরসোস ভালা হইসে। একা গেছোস ক্যান স্বামী-সন্তান রাইখা। তগো এমনেই মরা উচিত। তগো কাজ খালি স্বামী-সন্তান দেখ-ভাল করা। এর বাইরে ইসলামে কিছু নাই।”

তার এহেন মন্তব্যে আমি তো হা। বলার মতো তাৎক্ষণিক কোন ভাষা খুঁজে পাইনি এবং আজও প্রতিবাদের ভাষা জানা নাই। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঘটনা। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত এবং বিখ্যাত একটি স্কুল থেকে আনুমানিক ৮০ জনের মত ছাত্র-ছাত্রীদের একটি টিমকে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় পাহাড় দর্শনে নিয়ে যায় স্কুল কর্তৃপক্ষ কড়া আর সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে আর যথেষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তারপরও একদিন ঘটে বিপর্যয়। স্কুলের দুটো মেয়েকে দুজন স্থানীয় দুর্বৃত্ত পুরো টিমের মধ্যে থেকে হঠাৎ সুযোগ বুঝে জাপটে ধরে টেনে পাশের ঝোপে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কালে স্কুল ছাত্রদের একযোগে হামলায় তারা দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায়। তারপর সফর সংক্ষিপ্ত করে স্থানীয় প্রসাশনের সহায়তায় নিরাপদে ঢাকা ফিরে আসে। এরপর স্কুলের স্বার্থে এবং মেয়ে দুটোর স্বার্থে ঘটনাটি চেপে যাওয়া হয়। নইলে হয়তো উপরের মন্তব্যের মত নিচু মন্তব্য নোংরা সমাজ থেকে ভেসে এসে মেয়ে দুটোকে সাথে তাদের পরিবারকেও বিপর্যস্থ করে দিতো। যাইহোক, মিস ফারহানা কিছুক্ষণ পর পর জিজ্ঞেস করছেন ভালো লাগছে কি না বা খারাপ বোধ হচ্ছে কি না। তারপর ইফতারের জন্য তাগাদা দিতে লাগলেন। ঘড়িতে তখন বিকাল ৬:৪৫। কিন্তু আমি রাজি নই কারণ ইফতারের সময় জানতে ভুলে গিয়েছিলাম। বললাম ৭:০০ থেকে ৭: ১০ মধ্যে ইফতার করবো। পরে সেই সময়েই করেছিলাম ট্যাক্সিতে। তার কিছুক্ষণ পর হোটেলে ফিরে আসি। ফিরে কি মনে হলো রিসিপশনে গিয়ে বললাম, “আমি তো রোজা রাখবো। তোমরা কি আমার রুম ভাড়ার সাথে এটাচড আমার সকালের নাস্তাটা সন্ধ্যার পর দিতে পারো?” রিসিপশনের মেয়েটা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, “ তুমি কেন সন্ধ্যায় চাইছো? তুমি তো নাস্তাটা আর্লি মর্নিং বা সেহেরীতে খেতে পারো। তুমি কয়টায় চাও আর কি কি খেতে চাও বলো আমরা সেই সময় তোমার রুমে পৌঁছে দিব।” আমার মাথা ঘুরছে ভন ভন করে। বলে কি এই মেয়ে? এমনও কি হবে কোনদিন এই ধরায়, এই জমানায়!

 

 

পূর্বকোণ/ টিএফ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট