চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

নেপাল ভ্রমণ : পর্ব-৩

হাফেজা আক্তার

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

রৌদ্রোজ্জ্বল দিন ধীরে ধীরে মেঘলা হয়ে কেমন রোমান্টিক হয়ে গেল। ট্যাক্সিতে করে যাচ্ছি আর চারপাশ দেখছি। নেপালীদের ঘরদোর ফুলের বাড়ন্ত। ঝুপ্পায় ঝুপ্পায় ফুল ফুটে আছে এদিক ওদিক। হাত নিশপিশ করছে ছবি তোলার জন্য, কিন্তু উপায় নেই। ট্যাক্সি ছুটে চলছে পূর্ণ গতিতে। গতি কমালে চন্দ্রগিরি দেখে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। মেঘ তখন ইলশে গুড়ি হয়ে ঝরছে। প্রায় এক ঘন্টা পাহাড়ি পথে একেঁ বেঁকে ট্যাক্সিযাত্রার পর চন্দ্রগিরি। সুন্দর করে পাহাড় কেটে রোপওয়ে স্টেশন, টিকিট কাউন্টার, ছোট্ট মিউজিয়াম, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, বসার জন্য সেড, সেলফি বুথসহ ঘুরে বেড়ানোর জন্য উম্মুক্ত জায়গা রয়েছে। আমরা ছাতা নিয়ে আসিনি দেখে ট্যাক্সি ড্রাইভার তার ছাতাটি হাসিমুখে এগিয়ে দিলেন।

 

চারদিকে ঝির ঝির বৃষ্টি আর মেঘের আড়ালে পড়ন্ত বিকালের ম্লান সূর্যে আমরাসহ কিছু নারী-পুরুষ-শিশু। কেউ এসেছে পরিবার নিয়ে কেউ বান্ধবীকে নিয়ে কেউবা বন্ধু নিয়ে। কোন পুলিশী পাহাড়া বা পাহাড়াদার নেই, হৈ চৈ বা গোলমাল নেই। পুরো পরিবেশ নিরব আর শান্ত। কেমন যেন গাম্ভীর্যের চাদরে ঢাকা। আমি এবং আমার সহকর্মী দুজন এগিয়ে গেলাম রোপওয়েতে চড়ে পাহাড়ী ভ্রমণের টিকিটের জন্য কাউন্টারে। থরে থরে সাজানো কাউন্টারে শুধু একটিতে নেপালী একটি মেয়ে বসা। যাওয়া মাত্রই হিন্দীতে কি যেন বলে গেল। বলে রাখি আমরা দুজনই হিন্দীতে বকলম। মেয়েটিও বুঝে গেল যা বোঝার। আমাদের কাছে সরাসরি রোপওয়ে’র আপ এন্ড ডাউন-এর জন্য দুজনের ভাড়া বাবদ ২৪০০ রুপি চাইল যা স্থানীয়দের ভাড়ার চাইতে দ্বিগুনের বেশী। স্থানীয়দের বেলায় পছন্দের উপর টিকিট, ওয়ান ওয়ে বা টু ওয়ে যার যেমন পছন্দ। ওয়ান ওয়ে হলে ফিরবে কেমন করে ভেবে টাশকি খেয়েছিলাম। যাইহোক, রোপওয়েতে চড়ে রওনা দিলাম পাহাড়ের শিখর বেয়ে।

শিখর থেকে শিখরে উঠে যাচ্ছি ধীরে ধীরে। বন, উপত্যকা, নদী, বসতি, মানুষ, পাহাড়ী পথ….ইত্যাদি  ক্রমে ছোট আর বিস্তীর্ণ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি ভেসে যাচ্ছি। ভেসে যাচ্ছি আমাকে ঘিরে ধরা মেঘেদের সাথে মেঘরাজ্যে। নীচে বানানীতে ভেসে আসছে পাখিদের কিচির মিচির। দেখা যাচ্ছে দড়ির মত চিকন পাহাড়ি ট্রেইল। অদ্ভূত কিছু ফুল। একটু কি শীতের শিহরণ? উঠে এলাম চন্দ্রগিরির উঁচু শিখরে। রোপওয়ে’র অপর প্রান্তের স্টেশনে। আমরা দুজন বসেই রইলাম বিহ্বলতায়। বক্সের দরজা খুলে গেল। তবুও নামছি না দেখে একজন স্টাফ নামার তাগাদা দিচ্ছে জোরে জোরে নেপালী ভাষায়। আমরাও বুঝতে পারছি না আমাদেরকে কেন নামতে বলছে। আমাদের তো টু ওয়ে টিকিট কাটা। টিকিট দেখানোর পর সেই লোক রীতিমত চিৎকার জুড়ে দিল নামার জন্য। কারণ রোপওয়ের বক্স ধীরে ধীরে ঘুরে ফিরতি পথ ধরছে। উপায় না দেখে অপেক্ষামান অন্য নেপালীদের আমাদের বক্সে ঢোকার অনুমতি দিল। আর সাথে সাথে হুরমুর করে একটি নেপালী পরিবার বক্সে ঢুকে পড়ল। চারজন প্রৌঢ়- দু’জন পুরুষ আর দু’জন মহিলা সাথে একজন যুবক। আমরা বক্সে এখন দুজনের পরিবর্তে ০৭ জন। সাথে যুবকটি প্রায় গা ঘেঁষে বসেছে।

পুরাই অস্বস্তিকর অবস্থা। ভেবেছিলাম কেউ একজন তাকে সরে বসতে বলবেন। কিন্তু তা না করে উল্টো প্রশ্ন করলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি। বললাম, ঢাকা। দ্বিতীয় প্রশ্নটি করল পাঁচজন একসাথে চরম বিস্ময়ে, “কেন তোমরা ওপারে নামলে না?” আমরা তো হা । বলেই যাচ্ছেন, “এখানে তো মানুষ টাকা পয়সা খরচ করে দোয়া নিতে আসে চন্দ্রগিরির চূড়ার মন্দিরে”। এবার একজন যোগ করলেন, “এই দেখনা আমার স্ত্রী আর ছেলে। আর এই হলো আমার বন্ধু আর তার পত্নী। সামনে ছেলের বিয়ে তাই ছেলে আর বন্ধুকে নিয়ে এলাম মন্দিরে পূজা দিতে। যাতে সব ভালোয় ভালোয় হয়। আর ছেলে যাতে সুখি হয়।” এতক্ষণে আমরা হুঁশে ফিরলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা দুজনই হতবাক হয়ে যাই। বললাম ওখানের কথা আমরা জানতাম না। আমরা ভেবেছিলাম টু ওয়ে মানে যাব আর ফিরবো। তারা সবাই হেসে উঠলো একসাথে আর সাথে সাথে বক্সের পরিবেশ হয়ে গেল হালকা আর বন্ধুত্বপূ্র্ণ। অনেক কথা হলো তাদের সাথে দুই দেশ নিয়ে আর চন্দ্রগিরির পাশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান নিয়ে।

আমরা মন খারাপ করে রইলাম আমাদের ভুলের জন্য, না নামার জন্য। ওরা বারবার আশ্বস্ত করছিল এই বলে যে, “ভেবো না, আমারা তোমাদের বিষয়ে বলবো যাতে আরেকটা সুযোগ দেয়।” আমরা ফ্রিতে দ্বিতীয়বার চড়ার আনন্দে বিভোর হয়ে রইলাম। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশই নয় এবার বন্ধু বনে গেলাম। সত্যি ফিরে আসার পর তারা জোর আর্জি জানালো আমাদের জন্য। আর্জি নাকচও হয়ে গেল নিমিষে। কিন্তু দলপিতা দমবার পাত্র নন।

তিনি এবার গিয়ে ধরলেন আরো ঊর্ধ্বতনকে তখন তিনি বন্ধুসমেত টেবিল টেনিস খেলায় মত্ত। আর্জি শুনে খেলা থামিয়ে আমাদের কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে অনুমতি দিলেন যেতে। আমরা মানে ০৭ জনই আনন্দে আত্মহারা। পরস্পর পরস্পরকে বিদায় দিলাম এবং চড়ে বসলাম রোপওয়ে বক্সে। গিয়ে নামলাম ওপারে।

 

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট