চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

নেপাল ভ্রমণ : পর্ব-২

হাফেজা আক্তার

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১১:১৩ অপরাহ্ণ

নেপাল ভ্রমণের আগে ভিসা নিয়ে দেশে কোন দৌড়ঝাঁপ ছিল না। এয়ারশিপ ছিল নির্ধারিত কয়েকটা। ফলে ভ্রমণের শুরুটা ছিল ঝামেলাবিহীন। প্লেন থেকে নেমেই মনটা ফুরফুরে লাগছিল দুটো কারণে; এক: দিনটা ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল । দ্বিতীয় কারণ হল, নেমেই ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টকে ভয়ঙ্কর মনে হওয়ার পরিবর্তে মনে হলো ছিমছাম ছোট। অনেকটা টেবিলের মত আকৃতির কিউট একটি এয়ারপোর্ট। চারপাশের ভুমি এয়ারপোর্ট থেকে নীচে নেমে গেছে সাঁই করে।

ইমিগ্রেশন অতিক্রম করলাম শুধুমাত্র ভেন্ডিং মেশিনের মত একটি মেশিনে কয়েকটি তথ্য ঢুকিয়ে। মেশিন হলে কি হবে খুবই মুডি। সহজে তথ্য ঢুকছিল না। ইংরেজী না জানা দুজন নেপালিজ কিছুক্ষণ থাপ্পড় মারল মেশিনে তারপর ঝটপট চালু। কয়েকটা তথ্য ঢুকানোর পর আবার ঝিম। এদিকে, দুজন নেপালিজের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে বডি লেংগুয়েজ।
ছোটবেলায় বাক প্রতিবন্ধীদের আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় বলে মনে হত। এখন মনে হয় এরা পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকরী ভাষা বডি লেংগুয়েজের ব্যবহার জানে অসীম দক্ষতায়। এখানে আমরা মার খেয়েছি। যাক্, মুডি মেশিনে বহু কসরত করে তথ্য ঢুকিয়ে নিলাম অন এরাইভাল ভিসা এবং পৃথিবীর সবচেয়ে স্মাইলি ইমিগ্রেশন অফিসার ফেস করলাম। বুঝলাম না বহিরাগতদের সাথে এতো হাসিখুশির কারণ কি। দুনিয়ার তাবৎ ইমিগ্রেশন তাকায় কিটমিট করে আর কথা বলে খিটমিট করে। আমি তো ভেবেছিলাম, এটাই বুঝি বিশ্বব্যাপি ইমিগ্রেশনের স্ট্যান্ডার্ড ভাষা। ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পরই কিউট একটি ফটো বুথ বা সেলফি পয়েন্ট। চট করে একটি সেলফি তুলুন আর প্রিয়জনকে জানিয়ে রাখুন “I am in Nepal”।
আমি অভিভূত। অথচ পৃথিবীতে এন্টি সেলফি আন্দোলন চলছে জোরেসোরে। এদিকে, আমার দেশ তো আরেক ডিগ্রি উপরে। দেশের আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি খুনের ঘটনায় নিহতের স্ত্রীকে এবং আরেকটি কম আলোড়ন সৃষ্টিকারী শ্লীলতাহানির ঘটনায় একজন নারী শিক্ষিকাকে চরিত্রহীন বলে ফেসবুকে লিখেছেন সমাজের দু’জন পদস্থ পুরুষ।

কারণ দু’জন নারীই নাকি তাদের ফেসবুকে সেলফি পোস্ট দিত ঘন ঘন। নেপালে প্রবেশরত সবার মত আমিও সেলফি পয়েন্টের একটি ছবি জন্য দাঁড়ালাম সেলফির সকল অপবাদ পাশে ঠেলে। তারপর লাগেজ ক্লেইম। গিয়ে দেখি অলরেডি বিমান থেকে সকল লাগেজ রানিং বেল্ট হয়ে একটি কোনায় জড়ো হয়ে আছে। এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষার পরও কোন আক্ষেপ নেই। আজিব। শুধু তাই নয় আজিবের উপর আজিব হচ্ছে ত্রিভুবন গন্ধমুক্ত। কারণ কি? এখানে কি টয়লেট নেই নাকি নেপালিজরা বাথরুম করেন না? অথচ দেশ ছাড়ার সময় বোর্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় আমি বার বার স্থান পরিবর্তন করছিলাম। কারণ যে জায়গায় আর যে এঙ্গেলে বসি না কেন ঝাঁঝালো প্রশ্রাবের গন্ধ পাচ্ছিলাম। আমার এমন ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন দেখে আমার সহযাত্রী এর কারণ জিজ্ঞাসা করল। তাকে প্রশ্রাবের গন্ধের বিষয়টি বলার পর উনিও বললেন যে একই গন্ধ তিনিও পাচ্ছেন।
ত্রিভুবন থেকে বের হয়ে আরেক বিস্ময়ে পড়লাম। দুটো বুথ-একটাতে লোক গিজ গিজ করছে আর অন্যটিতে দুয়েকজন। বিষয় কী? ঢুঁ মারলাম দুটোতেই। কারণ হচ্ছে গিজ গিজ ওয়ালাটি সরকারি ফোন কোম্পানির, এরা সিম দিচ্ছে বিনামূল্যে সাথে তাৎক্ষণিক কথা বলার জন্য ৫০ রুপি প্রতি সিমে ফ্রি আর অন্যটি বেসরকারি ফোন কোম্পানির। সিমের মূল্য ১৯০ রুপি + ব্যালান্সের জন্য আলাদা রুপি দিতে হবে। গিজ গিজ করা বুথ থেকে বিনামূল্যের সিম নিয়ে দেশে ফোন দিলাম। পরিবার খুশি আর নিশ্চিন্ত। ভাবনায় ডুব দিলাম। আমরা তো বহিরাগত, মরলে কি বাঁচলেই কি। তারপরও নেপাল আমাদের পরিবারকে নিশ্চিন্ত রাখতে চমৎকার দুটো উদ্যোগ রেখেছে। ছোট্ট কিন্তু অপূর্ব। তবে কি সকল মানুষের জীবন বা পরিবারের স্বস্তিবোধ তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যাক্, এবার ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল হিমালয়ের উদ্দেশ্যে ট্যাক্সি যাত্রা। যাত্রা পথে মূল নেপাল দেখলাম। ট্রাফিক জ্যাম আছে তবে আমাদের তুলনায় কিছুই না। রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ জাকারান্দা ফুলের গাছ। পড়তি ঋতু তাই কিছু গাছে আর কিছু তলায় নীলাভ আভা ছড়িয়ে জাকারান্দা পড়ে ছিল। রাস্তাঘাট ধূলাময় তবে ততটা উৎকট দুর্গন্ধযুক্ত নয়। মানুষজন হালকা-পাতলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। গিজ গিজে নয়।
হোটেল পৌঁছাতে ১৫ মিনিট লাগল। গণট্যাক্সি মানে সেই সময় যতজন ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল হিমালয়ে আসা- যাওয়া করবে হোটেল কর্তৃপক্ষ একই গাড়িতে সব অতিথিকে আনা নেয়া করবে। তবে ভাড়া বোর্ডারের বিলের সঙ্গে যোগ হবে। ট্যাক্সিতে প্রতি যাত্রায় ভাড়া মাত্র ১২ ডলার। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল নগরীতেও ১৫ মিনিটের যাত্রা ১২ ডলার হবে কিনা সন্দেহ আছে। আজব। যিনি হোটেলের তরফ থেকে আমাদের নিতে এলেন জিজ্ঞাসা করলেন, সারাদিন ফ্রি কিনা, দর্শনীয় কিছু দেখতে কোথাও যেতে চাই কিনা? আমরা দুজনই বললাম চন্দ্রগিরি পাহাড় দেখতে চাই। আসা- যাওয়া ট্যাক্সিভাড়া ৩৫০০ নেপালিজ রুপি। এত রুপি? তবুও রাজি। কোনমতে লাগেজ রুমে রেখে তখনই ট্যাক্সিতে চেপে রওনা দিলাম।

 

 

পূর্বকোণ/ এস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট