চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০২ মার্চ, ২০২১

১১ অক্টোবর, ২০২০ | ১০:৩৫ অপরাহ্ণ

মো. আজিজুল মওলা

ভ্রমণ ডায়েরি

নগররাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি

পর্যটকদের সহজে চলাচলের সুবিধার্থে ইতালির রোম নগরীতে Hop On Hop Off বাস সার্ভিস রয়েছে। মূলত দ্বিতল বিশিষ্ট এই বাসগুলো ওপরের ছাদ নাই, তাই পর্যটকরা সহজেই বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট গুলো দেখে দেখে পুরা নগরী ভ্রমণ করে থাকে। আর যেখানে মন চায় সেখানে নেমে যায়। আমাদের বাস ভ্যাটিকান সিটির প্রবেশমুখে আসতেই নেমে পড়লাম চটপট।

ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ক্লাস সিক্সে এ থাকতে এই দেশটির নাম আমি শুনেছিলাম। সেই থেকে মনে মনে এ দেশটি ভ্রমণের সংকল্প আমাকে পেয়ে বসেছিল। যাহোক ইতালিতে এসে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম নগর রাষ্ট্র ভ্রমণের সুযোগটি হাতছাড়া করলাম না।

Tiber নদীর কূল ঘেঁষে ভ্যাটিকান সিটি অবস্থিত। এই নদীটি পুরো রোম নগরীর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে।  আয়তন এবং জনসংখ্যা দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি। এই দেশটি আসলে খ্রিস্টান ক্যাথলিকদের প্রধান তীর্থস্থান। মাত্র ৪৯ হেক্টর আয়তনের এই ক্ষুদ্র দেশটিতে জনসংখ্যা কমবেশি ৮২৫ এর মত। পোপ শাসিত এই দেশটির প্রধান হলেন, Pope Francis, তিনি জন্মসূত্রে আর্জেন্টাইন। গত ২০১৩ সাল থেকে তিনি খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা- পোপ ( ২৬৬তম) হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ১৯২৯ সালে ইতালির সরকারের সাথে লাতেরান চুক্তির আওতায় এই পোপীয় রাষ্ট্রের সৃষ্টি।

সিটির প্রবেশমুখের একটু আগে হাতের বা দিকে বিখ্যাত চিত্রকর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নামে মিউজীও লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এক্সপেরিয়েন্স নামে একটি গ্যালারি চোখে পড়ল। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি ভ্রাম্যমান দোকান বসিয়েছে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা। তারা সেখানে বিভিন্ন সুবিনিয়র বিক্রি করছে। নগরীর প্রবেশমুখে দাঁড়ালে একটি বিশাল আকৃতির বিল্ডিং চোখে পড়ে। এটি হলো St. Peter’s Basilica, ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থস্থান। কোন পোপ মারা গেলে অথবা অবসরে চলে গেলে এই বিল্ডিং এর বেলকনি থেকেই নতুন নির্বাচিত পোপ দেখা দেন। এই দৃশ্যটি দেখার জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ টেলিভিশনে চোখ রাখেন। আর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি হিসাবে ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতারা এদেশে এসে জড়ো হন। ১৬২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিল্ডিংটি বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি। প্রায় ২০ হাজার মানুষের সমাগম হতে পারে এই বিল্ডিং এ। এই বিল্ডিং এর সামনে যে বিশাল মাঠটিতে তাকে বলা হয় সেন্ট পিটার্স স্কয়ার।

এক পাশে রয়েছে মিউজিয়াম আর আরেক পাশে রয়েছে টুরিস্ট ইনফর্মেশন সেন্টার এবং স্কয়ারের দু’পাশে দুটি বিশাল আকৃতির পানির ফোয়ারা। এই দেশে রয়েছে মাত্র ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্য পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র রেলপথ, নাম সিটাডেল ভ্যাটিকানো। তবে এ রেল কোন যাত্রী বহন করেনা, শুধু মালামাল বহন করে।বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বর্ণের নারী-পুরুষ-শিশু যুবা এসেছে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি পরিদর্শনে। প্রতিবছর এই দেশটিতে ভ্রমণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে আগত প্রায় সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ।

আমাদের পেছনে কিছু ধর্মীয় যাজক কে দেখলাম, তারা দর্শনার্থীদেরকে আশীর্বাদ করে দিচ্ছেন। দেশটি খুব ক্ষুদ্র হতে পারে কিন্তু একটি স্বাধীন দেশে যা যা থাকা দরকার প্রায় সবকিছুই এদেশে আছে। আছে নিজস্ব পতাকা, মানচিত্র, নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও। পৃথিবীর প্রায় ৪০ টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় তাদের রেডিও থেকে ধর্মীয় বাণী প্রচার করা হয়ে থাকে। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্যাথলিক গির্জাগুলো এই পোপীয় রাষ্ট্র থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ভ্যাটিকান সিটি নগররাষ্ট্রটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত নয়, কিন্তু সেনজেনভুক্ত। এ ধরনের আরও চারটি রাষ্ট্র রয়েছে Andorra, Monaco, San Marino এবং Liechtenstein। এই দেশগুলোতে প্রবেশ করতে নতুন করে কোন ভিসা লাগবেনা। তবে এই দেশটি ২০০৪ সাল থেকে ইউরোকে তাদের মুদ্রা গ্রহণ করেছে আর অফিশিয়াল ভাষা হচ্ছে লাতিন, মানে ইতালিয়।

সেন্ট পিটার্স বাসিলিকার একপাশে দেখলাম দুজন সুইচ গার্ডের সদস্য কে। লাল, হলুদ, নীল এই তিনটি বর্ণ দিয়ে তৈরি একটি অদ্ভুত ইউনিফর্ম পরা ২৫ /৩০ বছরের যুবক। একটি বিষয় আপনাদের সাথে শেয়ার করি, ভ্যাটিকান সিটির যারা নিরাপত্তা দেয় তাদেরকে বলা হয় সুইচ গার্ড, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর দল এটি, মাত্র ১৩৫ জন সদস্য সংখ্যা। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো সুইচ গার্ড এর সকল সদস্য সুইজারল্যান্ড এর জন্মগ্রহণকারী যুবক। প্রায় আধাঘণ্টা পর খেয়াল করলাম, সুইচ গার্ডের কয়েকজন সদস্য একজন দলনেতা নেতৃত্বে মার্চপাস্ট করে এগিয়ে আসছেন গার্ড রুমের পাশ থেকে, আমি ছবি তুলতে চাইছিলাম আমার বন্ধু বারণ করল, অনুমতি ছাড়া ওদের ছবি তোলা ঠিক হবে না।

ভ্যাটিকান সিটিতে রয়েছে সুন্দর একটি গার্ডেন। সবুজের মাঝে বিভিন্ন রঙের ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে বাগানে। দর্শনার্থীরা বসে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে বিভিন্ন ভঙ্গিমায়ে আর ভ্যাটিকানের বিখ্যাত মিউজিয়ামটিতে রয়েছে ইতালিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন চিত্রকরের অঙ্কিত ছবি, বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য, ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম, নিঃসন্দেহে আপনার ভালো লাগবে এটি ঘুরে দেখতে।

হাঁটতে হাঁটতে গলা শুকিয়ে গেল। একটু দূরে দেখলাম বিভিন্ন কালারের ফ্লাওয়ার দিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করছে। বিক্রেতাকে একটু বয়সি মনে হল। মনে হয় অনেকদিন ধরে এখানে এসে আইসক্রিম বিক্রি করছে। ৬ ইউরো দিয়ে দুটি আইসক্রিম হাতে নিয়ে দুই বন্ধু ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম তাদের বিভিন্ন স্থাপনা।

লেখক-
উপসচিব
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 503 People

সম্পর্কিত পোস্ট