চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪

পর্ব-৬ঃ ফিলিপাইনের পথে

মো. ফারুক ইসলাম

১৪ জুন, ২০২০ | ১২:০১ অপরাহ্ণ

ঘড়ির কাঁটায় তখন থাইল্যান্ডের সময় সাড়ে সাতটা। বাহারুল ইসলাম স্যারের ডাকে ঘুম ভাঙ্গল। স্যার বললেন, বিমান টার্মিনালে অপেক্ষা করছে। সবাই রেডি হও। একটু পর দেখলাম প্লে-কার্ড হাতে থাই এয়ারওয়েজের কর্মচারীরা প্রথমে বিজনেস ক্লাসের যাত্রীদের ডাকলেন বিমানে আরোহণ করার জন্য। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। বিজনেস ক্লাসের যাত্রীরা বিমানে প্রবেশ করার পর আমাদের ডাক পড়লো। আমরা যারা ইকোনমি ক্লাসের যাত্রী ছিলাম সবাই সারিবদ্ধভাবে বিমানে উঠার জন্য হাঁটতে লাগলাম। তবে আগের বিমানে নয়, এবার থাইএয়ারওয়েজের অন্য একটি বিমান। থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৬২০ বিমানের দরজার সামনে যাওয়া মাত্র আগের নিয়মেই থাই ভাষায় বিমানে অভ্যর্থনা জানালো থাই বিমানবালারা। বিমানে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট সিটে বসে পড়লাম। একটু পর কেবিন ক্রু এসে বালিশ আর কম্বল দিয়ে গেলেন। এবার অপেক্ষা ফিলিপাইনের উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়ার। আমরা আগের নিয়মেই সিট বেল্ট বেঁধে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর ককপিট থেকে ঘোষণা আসলো কয়েক মিনিট পর আমরা ফিলিপাইনের উদ্দেশ্যে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ত্যাগ করতে যাচ্ছি। বিমান বন্দর ছেড়ে যাবার কথা শুনে মনে একটা আফসোস কাজ করছিল। কারণ এয়ারপোর্টটা পুরোপুরি ঘুরে দেখতে পারিনি। কিন্তু আশাহত হইনি। কারণ ফিরতি পথে ৬ ঘণ্টার ট্রানজিট আছে ব্যাংককে। তখন ঘুরে দেখার আশা মনে জিইয়ে রাখলাম। মিনিট দুয়েক পর থাই বিমানটি আস্তে আস্তে রানওয়েতে চলতে আরম্ভ করলো। এরপর ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে রানওয়ে ছেড়ে ব্যাংককের আকাশে উড়াল দিল।

 

উল্লেখ্য, বিমান আকাশে উড়ার সময়টার চেয়ে এয়ারপোর্টের রানওয়েতে যখন ঝাঁকুনি দিয়ে অবতরণ করে তখন অনেকটা ভয় লাগে বেশি। পুরো বিমানটা তখন ঝাঁকুনিতে ক্ষেপে উঠে। বিমান আকাশে স্থির হওয়ার পর কেবিন ক্রুরা খাবার নিয়ে হাজির। সকাল পর্যন্ত পেটে দানা পানি কিছু না পড়ায় ক্ষিদেয় পেটে যুদ্ধ চলছিল। আমি আগের মতো ভাত, মুরগি নিলাম। সে সাথে কোল্ড ড্রিংকস। থাই বন, মাখন, পানি। খাবার শেষ করে এবার সিদ্ধান্ত নিলাম ঘুমাবো না। সাড়ে তিন ঘণ্টার এই পথটা জেগে জেগেই যাবো। আমরা সিট বিমানের ঠিক মাঝখানে হবার কারণে জানালার পাশে বসে আকাশের মেঘ আর অপরূপ দৃশ্য দেখার সুযোগ বি ত হওয়ায় একটু আফসোসও হচ্ছিল। ফিলিপাইনগামী বিমানটা আগের বিমানের চেয়ে ছোট হওয়ায় এক সারিতে সিট ছিলো তিনটি। আস্তে আস্তে ব্যাংককের আকাশের মেঘ কেটে যাচ্ছিল। সূর্য উঁকি দিচ্ছিল থাইল্যান্ডের আকাশে। এবার সত্যি সত্যি সাদা মেঘের দেখা মিলল। আমি সিট থেকে পার্শ্ববর্তী নালা দিয়ে এই দৃশ্য দেখছিলাম। আর অবাক বিস্ময়ে বিস্মিত হচ্ছিলাম। একটু পর বিমানের গতি পথ দেখার জন্য সিটের সামনের টিভি স্ক্রিনে ক্লিক করলাম। দেখলাম বিমানটি ছুটছে অবিরত আমাদের গন্তব্যের দিকে। তবে বিমানের শোঁ শোঁ শব্দটা ছিল বিরক্তিকর। বিমানে যতক্ষণ জেগে ছিলাম ততোক্ষণ অনেক কিছুই ভাবছিলাম। মনে হচ্ছিল পুরো ট্যুরটাই একটা স্বপ্ন। আর আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে স্বপ্নের একেকটা পর্বে অংশ নিচ্ছি। আমার ফেসবুক আইডিতে আমার এক ফিলিপাইনের বন্ধু আছে। তার নাম মেরী গ্রেস মাসাঙ্গি। তার সাথে যতবারই কথা হতো ততোবারই তাকে বাংলাদেশে আসতে বলতাম। সে বলতো তার বাংলাদেশে আসার মতো অতো টাকা নেই। কারণ তার বাবা একটা গির্জার যাজক। ফিলিপাইন খ্রিষ্টান অধ্যুষিত রাষ্ট্র। তবে একটা দ্বীপে মুসলমানদের আধিপত্য বেশি। যা বলছিলাম, মেরী গ্রেস মাসাঙ্গি উচ্চ শিক্ষিত একজন মেয়ে। পড়ালেখা শেষ করে একটা চাকরি হন্যে হয়ে খুঁজছিল। মাঝখানে তার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে তার সাথে ফিলিপাইন যাবার পূর্বে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। কারণ তাকে আর অনলাইনে পাওয়া যায়নি তখন। তবে আশ্চর্য ব্যাপার হলো মেরী গ্রেসকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমি নিজেই তার দেশের অতিথি হয়ে ঘুরতে যাবো ভাবতেই পারিনি। আসলে এভাবে ফিলিপাইন ট্যুরে যেতে পারবো সেটা এখনো পর্যন্ত আমার কাছে স্বপ্নই মনে হয়। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বিমানে ঘুমাবো না। কিন্তু আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম সবাই ঘুমাচ্ছে। পুরো জার্নিটাই কেমন জানি ঘুমের সাথে মিতালী গড়েই হচ্ছিল। এরপরও ঘুম তাড়ানোর অনেক চেষ্টা করেও সফল হতে পারিনি। বিমানের এসি’র কারণে রাজ্যের ঘুম চোখে ভর করেছিল। তাই সবার মতো আমিও ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। (চলবে)

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট