চট্টগ্রাম রবিবার, ২৬ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

পাষণ্ড প্রেম ।। আহমেদ মনসুর

২০ এপ্রিল, ২০২৩ | ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ছেলেটি যে এত ভালো ছিলো, মরে না যেত যদি ইহ জনমে আমার জানা হতো না। অথচ আমার পাশের একটি বাড়ির পরেই তার বাড়ি। বেঁচে থাকতে সবাই ওকে খিস্তিখৈউর দিত। আফরোজার কপাল ভেঙেছে নাকি সে। কেউ ডাকে অলহ্মী, কারো কাছে লহ্মীছাড়া একটা ছেলে। ঘর থেকে বের হতেই যদি সামনে পড়ে যায়, চকিতেই ঘরে ফিরে যেতো পাড়ার লোক, অমঙ্গল হওয়ার ভয়ে। মরার পর এখন সকলেই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাঙালির এই এক স্বভাব-বেঁচে থাকতে না দেয় হালুয়া রুটি, মরলে পরে দেয় চিকন পাটি।

রাতুল হাসান। কত শখ করে ছেলের নাম রেখেছিলো আফরোজা খানম। বাপের নামের সাথে মিলিয়ে। রাতুলের বাবার নাম মেহেদী হাসান। বিয়ে করে রাতুলকে আফরোজার গর্ভে দিয়েই মেহেদী চলে যায় জার্মানীতে। বিয়ের আগেও সে জার্মানীতে ছিলো বেশ কয়েকটা বছর। পড়ালেখার পাশাপাশি টুকটাক চাকরি-বাকরি করতো। ডিগ্রী শেষ করে একটা কোম্পানীতে স্থায়ী চাকরি ঠিক করেই দেশে এসেছিলো বিয়ে করতে।

বউকে দেশে একা ফেলে রেখে যেতে তার একদমই ইচ্ছা করছিলো না, তবু চলে যেতে হলো। তবে কাজে যোগ দিয়েই দেখলো ওখানে কয়েকজন বাঙালি আছে। এদের মধ্যে একজন আবার মেয়ে, বেশ সুন্দরী। মনে মনে খুশি হলো সে। মেয়ের নামটাও জম্পেশ, রোদেলা ঈশান। একটু গায়ে পড়া স্বভাব। মেহেদীর খুব পছন্দ হয়ে গেল। রোদেলারও মেহেদীকে মনে ধরে যায়।

মেহেদী প্রথমে ভেবেছিলো বউকে ছেড়ে একা এই প্রবাসে রোদেলার সাথে ভালো টাইম পাস করা যাবে। কিন্তু নিজের অজান্তেই মেহেদী কখন যে রোদেলার প্রেমে মজে যায় বুঝতে পারে না। অফিস শেষ করে অনেক সময় দু’জন একসাথে ঘুরে বেড়ায় জার্মানীর দর্শনীয় সব জায়গায়। মাঝেমাঝে রোদেলা মেহেদীর বাসায় রাতযাপনও করে।

আফরোজার সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসে। মেহেদীকে সব কথা ফোনে সে বলে, এ নিয়ে মেহেদীর কোন উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয় না। মনে মনে কষ্ট পায়, তবুও বলে না কিছুই। প্রবাসে থাকে, কখন কোন অবস্থায় থাকতে হয়। কত কষ্ট করে, অথচ স্ত্রী হয়েও স্বামীর কোন দায়িত্ব সে পালন করতে পারে না। এ নিয়ে তার কত মনোযাতনা, কত খারাপ লাগা।

রাতুল জন্ম নেয়, বড় হতে থাকে। এদিকে মেহেদীও ক্রমান্বয়ে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। আফরোজার অস্থিরতা বাড়ে। দেখতে দেখতে কেটে যায় দশটি বছর। আফরোজা রাতুলকে কত কষ্টে বড় করছে, সত্যি বলতে কি পাশের বাড়িতে থেকেও আমি সে খবর কখনও রাখিনি।

ওদিকে রোদেলার গর্ভেও জন্ম নেয় মেহেদীর সন্তান। রোদেলা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। হাজার হোক দিন শেষে সেও একজন বাঙালি নারী। ছেলের স্বীকৃতি আর স্ত্রীর মর্যাদা তারও কাম্য। শুনেছি তাতে মেহেদীরও অমত নেই, অনেকটা নিমরাজি, তবে রোদেলার একটা শর্তের কারণে স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না সে। শর্তটাও বেশ কিছুটা জটিল বৈকি, ইস্পাতকঠিন। যেন সাপও মরে লাঠিও না ভাঙে। দেশে গিয়ে রাতুলকে কৌশলে সরিয়ে আফরোজাকে তালাক দিতে হবে। রোদেলার প্রেম মেহেদীকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত ওর শর্তটাই তাকে মেনে নিতে হয় অবোধ বালকের মতো।

মেহেদী হাসান দেশে ফেরে রাতুল আর স্ত্রীর জন্য নানা সামগ্রী নিয়ে। আফরোজা তো মহাখুশি। হারানো সম্পদ ফিরে পেলে লোকে যেমন খুশি হয়। আফরোজার চেয়েও অধিক খুশি রাতুল। আজ যেন ঈদ। গেল ঈদে মায়ের কাছ থেকে নতুন জামা পেয়েও তার এতটা আনন্দ লাগেনি। বাবার কথা মায়ের মুখেই শুধু শুনেছে সে, এর আগে চোখেও দেখেনি কোনদিন।

গ্রীষ্মের মধ্যদুপুর। কাঠফাটা রোদের তাপে চারদিক চৌচির। গণগণে গরমে পুরো শরীর ঘামে নেয়ে উঠলে বাপ ছেলে পুকুরে যায় গোসল করতে। আশপাশে শকুনের মতো সুতীক্ষè দৃষ্টিতে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় মেহেদী, না, কাউকে দেখা যায় দেখা না। গ্রীষ্মের এই তপ্ত দুপুরে কারো বাইরে থাকার কথাও নয়। সুযোগ বুঝে তাই রাতুলের গাঢ়টা দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে পানির নিচে চেপে ধরে রাখে মেহেদী। রাতুলের কি পা-হাত      ছোটাছুটি, প্রাণে বাঁচার সে কি আকুল আকুতি। এদিকে প্রাণে বাঁচতে পিতার সাথে যুদ্ধ করে শিশুপুত্র রাতুল, আর ওদিকে কেঁপে কেঁপে ওঠে খোদার আরশ, অথচ পাষ- পিতার বুক কাঁপলো না একরত্তি। মুহূর্তেই রাতুলের ছোট্ট দেহ থেকে প্রাণ পাখিটা বের হয়ে উড়ে চলে গেল খোদার আরশে।

আফরোজা ছেলের লাশ বুকে জড়িয়ে গগনবিদারী শব্দে বিলাপ করতে করতে জ্ঞান হারায়, আবার জ্ঞান ফিরতেই বিলাপ। পড়শিরাও কাঁদছে তারস্বরে।

আফরোজাকে অবশ্য তালাক আর দেওয়া হলো না, হলো না রোদেলাকে বিয়ে করাও। একটু আগে দেখলাম পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো মেহেদী হাসানকে।

 

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট