চট্টগ্রাম বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

কালের আবহে বিষয় বৈচিত্র্যে মহামিলনের, সম্প্রীতির ঈদ

সাঈদুল আরেফীন

২০ এপ্রিল, ২০২৩ | ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

মুসলমানদের জন্যে ঈদের প্রবর্তন ঘটেছে আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে। সেই থেকে শুরু। পিছু হটেনি মুসলমান সম্প্রদায়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর থেকেই মুসলমানদের জীবনে ঈদের সওগাত নেমে আসে। আমাদের প্রিয় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২৪ খৃষ্টাব্দের ১শাওয়াল ছাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে প্রথম ঈদুল ফিতরের নামাজে ইমামতি করেন। ্ধসঢ়;এরপর থেকে সারা মুসলিম জাহানে ঈদুল ফিতরের সূচনা হয়। ঈদুল ফিতর প্রাচীন বাংলার উৎসবগুলোর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে। যদিও এদেশে প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে ঈদের গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। তবুও বলা যায়, আজ আমরা অধীর আগ্রহে যে ঈদ উৎসবের আমেজের জন্য অপেক্ষা করে থাকি, এদেশে সে ইতিহাসের সূচনা হয় প্রায় আশি থেকে একশ বছর আগে। মূলত  ফিতর শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ভাঙ্গা। এই দিন সারা মুসলিম জাহান একত্রিত হয়ে রোজা ভঙ্গের দিনকে উৎসবে পরিণত করার মাধ্যমে আনন্দময় ভুবন রচনা করে। সকল মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরিত করে গলায় গলা মিলিয়ে একই উঠোনে দাঁড় করিয়ে দেয়ার মধ্যেই মুসলমানরা অপার আনন্দ লাভ করে।

পবিত্র কোরানে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, সকল প্রকার কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সত্যিকার সিয়াম সাধনা করতে হবে। তারপরই আসে ঈদের সার্থকতা। পবিত্র ঈদ মানুষের জন্য আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠবে। একমাস সফল সংযমের পর বেজে ওঠে আসল সুর। পবিত্র রমজান শেষে যখনই শাওয়ালে চাঁদ ওঠে আকাশে। এর চাইতে বড়ো আনন্দময় দিন মুসলমানাদের জীবনে আর কী হতে পারে?  পাক ভারত উপমহাদেশে আমাদের বাঙালি জাতির অন্যতম প্রধান কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর সৃষ্টি ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে/ এলো খুশীর ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে/ শোন আসমানী তাগিদ/ সোনাদানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ/ জাকাত মুর্দা মুসলিমদের আজ/ ভাঙাইতে নিদ/’ গানটি ধ্বণিত হয় আকাশে বাতাসে।

আজকাল ঈদের অনেক রকমফের হয়ে গেছে। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার ছোঁয়া গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও ভর করেছে। বলা চলে সেকালে গ্রামের ঈদ আর শহুরে ঈদের মধ্যে কিছু পার্থক্য তো ছিলোই । প্রতিবছর উৎসবের আমেজ প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় আনন্দের সুবাতাস। স্বাধীনতার পর থেকেই সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় উৎসবগুলো প্রতিপালিত হয়ে এসেছে। দেখা গেছে, মুসলমানদের ঈদ উৎসবে যোগ দিয়ে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা ও আনন্দ ভাগ করে নেয়। এখানে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঈদ মুসলমানের হলেও আমরা এখানে স্পষ্টভাবে মানুষের মধ্যে মহামিলনের সার্বজনীন উৎসব হিসেবে দেখে আসছি। উগ্র সাম্পদ্রায়িক পরিস্থিতি মাঝে মধ্যে আমাদের এই চেতনার মধ্যে চিড় ধরাবার চেষ্টায় খুব একটা সুবিধ করতে পারেনি আজো। যেটা বাঙালি মুসলমানদের  চিরন্তন ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতায় অটুট আছে এখনো। ফলে ঈদ কেবল পার্থিব উৎসবের বিষয় নয়, বিশ্বভ্রাতৃত্ব গড়ার সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ ঈদোৎসব ধর্মীয় আঙ্গিক ছাড়িয়ে প্রত্যেক ধর্ম বর্ণ ও গোত্রের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার পরে দেখা গেছে ঈদোৎসবকে ঘিরে একসময়ের স্বনামধন্য ‘সাপ্তাহিক  বিচিত্রা’ মেতে ওঠতো ছেলেমেয়েদের ডিজাইন নিয়ে। সেই থেকে ফ্যাশনের সাথে গা লাগায় তারুণ্য। বিচিত্রার পর সাপ্তাহিক রোববারে সেই ট্রেন্ড দেখল প্রজন্মের তরুণরা। আজকাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নানা ফ্যাশন হাউস, বুটিক হাউস কতো শত ডিজাইনার। কাপড় চোপড়ই নয়, গয়না-গাটি কোনকিছুতেই বাঙালি আজ পিছিয়ে নেই। সময়ের বিচারে পোশাক শিল্পে দাঁড়িয়ে গেছে অসংখ্য ব্রান্ড কোম্পানি। কেউ পিছয়ে নেই। প্রথিতযশা ডিজাইনাররা মাতিয়ে রাখে ঈদ শপিংকে শত বর্ণে রঙে। সতের কোটি মানুষের দেশে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে সম্পৃক্ত হয়েছে। ঈদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক, বৈষয়িক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।

এখনো দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ঈদের দিন থেকে পুরো নগর ফাঁকা হয়ে যায়। গ্রামবাংলায় ছুটে যাওয়ার যে জৌলসু তা থেকে বাঙালি মুসলমান সহ নানা ধর্মের মানুষকে বিচ্যূত করা যায়নি। শহুরে ঈদ মানে ফাঁকা নগর।  যানজট কোলাহল মুক্ত সুনসান পরিবেশ। শহর এবং গ্রামের দু‘জায়গাতে দু‘রকম ভাবে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ঈদ উদযাপিত হয়। সব শিশু কিশোর এবং বয়স্করা এখনো মায়া মমতার বন্ধনে মিলে মিশে ঈদ পালন করে মমতার  বন্ধনে। যদিও গ্রাম গঞ্জের ঈদ আজো এতো বিলাসবহুল হয়ে ওঠেনি। গ্রামের অধিকাংশ কৃষিজীবীকে ঈদ পালন করতে হলে তাদের ফসল উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে হতো। কৃষকের ছেলেমেয়েরা ঘরে ফসল উঠলেই পরে ঈদের নতুন জামা কিনতে পারে। নইলে বছর ভেদে চাঁন রাতে ছেলেমেয়েরা পুরনো জামাকাপড় নতুন করে কেঁচে অথবা ঘষে মেজে পরিষ্কার করে ঈদের উৎসবে মেতে ওঠার পর্ব সেরেছে। তবে গ্রামের ঈদে আজো দেখা  যায়, দল বেঁধে শিশু কিশোরদের ছুটে চলা এ পাড়া  ও পাড়া। এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে কিংবা দূর গ্রামের কোন আতœীয় স্বজনের বাড়ীতে। ঈদ সেলামির পাশাপাশি সেমাই, রান্না করা ভালো খাবার দাবার তো থাকছেই। এছাড়া, মজার ব্যাপার হলো গ্রামে ঈদের আয়োজনে থাকে নানা পণ্য ও খেলাধুলা সমাদৃত গ্রাম্য মেলা। মেলা বসে নদীতীরে, গ্রাম্যহাটে বটতলায়,স্কুল মাঠে মেলার মধ্যে থাকে লোকজ হাতের তৈরি নানা সামগ্রী নকশী করা পাখা, পুতুল, রঙিন হাঁড়ি, মিঠাই, বাঁশের বাঁশি, ষাঁড় ও মহিষের লড়াই ইত্যাদি। হা-ডু-ডু, ফুটবল, গোলাছুট, দাঁড়িয়াবাধা, ক্রিকেট ইত্যাদি ম্যাচ আয়োজনে ঈদকে করে বড়োই প্রাণবন্ত। আরো আছে নাগরদোলা, ঘোড়ার দৌড়, নৌকা বাইচ, মারফতি ও মুর্শিদি গানের জমজমাট আসর। তবে, নগর সভ্যাতার ছোঁয়া পেয়ে আজকাল গ্রামের সেইসব ঐতিহ্যবাহি দৃশ্যাবলী অনেকটা ম্লান হতে বসেছে। আমরা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধরে রাখতে চাই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক অর্থনৈতিক সংস্কৃতির অনস্বীকার্য যে মেলবন্ধন তা থেকে আমাদের পিছু হটার পথ নেই। একসময়  গ্রামাবংলার শাশ্বত সেই রূপের সাহচর্যে থেকে সাধক গায়ক শাহ আবদুল করিম গেয়েছেন, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…। আমরা সেই উৎসবমুখর সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে চাই। মুসলমানদের এ ঈদ উৎসব যেন পরিণত হয়ে ওঠে মহামিললনের ব্যতিক্রমধর্মী উৎসবে। চেতনায়, বিকাশে ও  সম্প্রীতির মূল শিকড়ে প্রোথিত হয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ঈদের সত্যিকার অহিংস উৎসবে মাতাতে চাই। সে প্রত্যয়ে  ঈদ সবার জন্য সুন্দর মঙ্গলময় হোক প্রত্যাশা এই।

লেখক : কবি, কথা সাহিত্যক ও গবেষক।

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট