চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪

সর্বশেষ:

বজলের চশমা

১৪ এপ্রিল, ২০২৩ | ১২:৩৬ অপরাহ্ণ

ইদানিং চশমাটা ভারী ভারী লাগে। অথচ কিছুদিন আগেও খুব হালকা মনে হতো। চোখ থেকে খুলে মাঝে-মধ্যে দুই ডান্ডা ধরে ওজন বোঝার চেষ্টা করি। আমার ওজনের চেয়ে চশমার ওজন বেশি অনুভূত হলে নিজেকে আউট অব অর্ডার ভাবি। মাথা ঠিক আছে কিনা পরখ করবার চেষ্টা করি। চশমাও যে মাঝে-মধ্যে ওজনে ভারী হতে পারে এ-কথার শানেনজুল আসলে অনেকেই বোঝে না। আবার হয়তো মাঝখান থেকে অনেকেই বলবে, গন কেস,  রদ্দিমাল।

মানুষ শুধুই গাইল পাড়তে জানে। চোখের সমান বিকল্প দুই টুকরো কাচের কদর বোঝে না। চশমা নতুন জীবন বানাতে জানে; সেটি  বালক থেকে বৃদ্ধ এবং নারী পর্যন্ত সকলে অর্থাৎ আবালবৃদ্ধবনিতা  জানে। অদেখাকে দেখা, দেখাকে ধূলিসাৎ করার ক্ষমতা সম্ভবত চশমা ব্যতীত আর কারো নাই। আকাশের ঘুড়ি উড়া থেকে শুক্রবারের মেঘে গভীর চুমু খাওয়া ঠোঁটের লাল জীবন, চশমার চেয়ে ভালো আর কে জানে! পুরো একটা সময়, জীবন যাপনের যাবতীয় আনন্দ উচ্ছ্বাস উদ্বেগ সবকিছুতে চশমা থাকে তৎপর। বছর কয়েক আগে চশমা বিষয়ক একটা সেমিনার হয়েছিল। বক্তাদের নানারঙরসে চশমার রোম্যান্টিককতাসহ চরিত্র হরণে ব্যস্ততা দেখেছি। কারো কারো মুখে চশমার সত্তিত্ব নিয়ে বলতে শুনেছি। চশমা কোনো বাসা কিংবা বাড়ির আরিচ-বারিছ গিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে মনখোশ করে ফ্যাসাদ বাজিয়ে দেয়Ñ তা নিয়ে খোশগল্প রাস্তাঘাটে অফিসে আড্ডায়। কেউ বা বলেছে, চশমা চসমখোর উলঙ্গ দেখলেও কসুর নাই, ইত্যাদি। আমি বলেছি, ইতিহাস। মিশরীয় সভ্যতার হায়রোগ্লিফিকসে মানুষের চশমা ব্যবহার আবিষ্কার করেছিল ইতিহাসবিদরা। বস্তুর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হওয়াকে নিকটতর ও পরিচ্ছন্ন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে কাচের প্রচলন শুরু হয়। রোমান গ্লাডিয়েটরসদের লড়াই উপভোগের জন্য সম্রাট নিরো চোখে বিশেষ ধরনের কালো কাচ ব্যবহার করতেন। খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতকে ক্ষীণ আবছায়া দৃষ্টির বিকল্প হিসাবে কাচের ব্যবহার শুরু। তবে প্রকৃত চশমার ইউজ ইতালিতে প্রথম প্রচলন হয় জিওদার্নো পিসা নামের ব্যাক্তির হাত ধরে। পিসার উদ্দ্যেশ্যে ছিল সৎ। সে চশমা ছিল দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার প্রতিকার।

অথচ, দোষ আমার নয়, চশমারও কি-না জানি না। স্টেইনলেস স্টিলের রকিং চেয়ারে নিজের এক চিলতে বারান্দায় বসে ভিটামিন ডি নিচ্ছি। ডি ডেফিসিয়েন্সি ভুগছি দীর্ঘদিন থেকে। বেশিক্ষণ এক দৃষ্টে কোথাও তাকালে কাচ ঘোলাটে হয়ে আসে। এন এইচ নারায়ণা হাসপাতাল ব্যাঙ্গালুরের পাশের একটি হাসপাতালের প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী ভিটামিন ব্লুভিট-ডি খেয়েছি, পুরো একমাস ডি ডেফিসিয়েন্সির কারণে। এতেও বেশি সুবিধা হয়েছে মনে করতে পারছি না। সকালের রোদ ভালো। তাপি ওঠার আগে গায়ে নিলে ঝর ঝরে লাগে। শীতকালে রোদের উষ্ণতা সত্যিই মধুর। এখন গা ঝিম ঝিম ত্যাড়ম্যাড়ে বৈশাখী রোদ। তবু ভালো। কারণ  করোনা পূর্ব রোদগুলো খুব থ্যাঁতলা ছিল যেন ক্রাচে ভর দিয়ে রোদ ওঠেছে। অথচ, করোনাকালে প্রকৃতি চন মনিয়ে উঠেছিল। অনেক নাম না জানা পাখি লতাগুল্ম চোখে পড়েছে। বিশেষ করে পাখিরা যেন সংগীত ফিরে পেয়েছে। মাছেরা জলাভূমি। এসব দেখেছি চশমার ভেতর দিয়ে। দেখলে হালকা লাগে, মায়া লাগে পৃথিবীকে। আরও কিছুদিন বাঁচতে ইচ্ছে করে। যখন শুনেছি একই ক্যানভাসে মৃত্যুর মহড়া চলেছে, এ বাড়িতে ও বাড়িতে করোনা পাওয়া যাচ্ছে,  তখন মনে হয় এ-জীবন অর্থহীন। বারান্দায় রকিং চেয়ারে দুলতে দুলতে জীবনানন্দ পাঠ করি, শক্তি, শামসুর, সুনীল, মাহমুদ, উৎপল কুমার বসু, শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ এরকম আরও অনেক কবি লেখক-ই যখন দুঃসহ করোনা সময়ে আমার সাক্ষী, তখন কানের খুব কাছে চুপিচুপি ভারত চন্দ্র, বিদ্যাসাগর, মধুকবি, রবীন্দ্র, নজরুল  এসে বলে, আমাদের বাদ দিওনা। আমাদের যোগ্য ধারাবাহিক উত্তরাধিকার ওরা যাদের বেশি বেশি বুকের পঁচিশ হাড়ের মতো আটকে রেখেছ বুকে।

আসলে চশমাটা ভারী নয়। কার্বন ফ্রেমের খয়েরি রঙের একটি চশমা কত ভারী হতে পারে!  মাঝে-মধ্যে ইচ্ছে হয় চোখ দুটো কোটর থেকে খুলে টেবিলে রাখি। দেখি, কত ওজন চোখের। এ চিন্তার নিজস্বতা কারো সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। চোখ দেখেছিল করোনা। চোখ তাকেও দেখেছিল। যে এমন করোনা দিনেও চোখের আড়ালে থেকেছিল। ভাবি, এটাও এক ধরনের অনুভূতি। দুঃসহ অতীত একেকটা সময় ঝেঁকে বসে, বর্তমান চোখকানা বলে। আমি নিজেকে ওর জায়গায় দাঁড় করিয়ে ভাবি, সে দিব্যি হাসছে, স্নান করছে হাতে পায়ে শরীরে সাবান ঘষে। সন্ধ্যায় ছেলেদের পড়াতে বসে হাসছে আনমনে। চিন্তাটা একদম অমূলক নয়। এটি সাধারণ মনস্তত্ত্ব, এটিই মানব জীবনের নিগূঢ় রহস্য। যে চায় এড়িয়ে চলি, বিপরীতে ঘেঁষে ঘেঁষে চলার তীক্ষèতা বৃদ্ধি পায়। সেভাবে সে, সমাজের অনুঘটক, বাধ্য সামাজিক জীব, অনুশাসনের বেড়াজাল। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষকে ছিনিয়ে নেবার তীব্র আকাঙ্খা। খুব দূর থেকে আড়চোখে দ্যাখে সে আমাকে এবং আমাকে। আমিও কি সেটা বুঝতে দিই, না দিই না। বয়স মার্বেলের মতো গড়িয়েছে কিছুদূর। মানুষ কী এভাবে থিয়োসফির সাধনা করে! জানি না।   এ-ই সাধনা ভুল। এটি থিয়োসফি নয়, কমজোর প্রেমসফি বলা যায়। মন দূর থেকে বলে, ঈশ্বরকে প্রেম দিয়ে পেতে হয়। একদিন ভাবনায় এসেছিল ঈশ্বর তিনি শুধু সমাজের রাঘববোয়াল ব্যারন সোসাইটির। লেজঅলা ঈশ্বর চিন্তা বাদ সেই সময় থেকে। কিন্তু পুরোপুরি বাদ দেয়া কি যায়! বাঙালির দোটানা মন অসুখ-বিসুখে সংকটে তিনি আবার ঘাপটি মেরে বসতে চান। পৃথিবী এখন কিছুটা সুস্থ। উহান দেশের বেটি ছেড়ে গেছে অনেকদিন।

বেলা পড়তি সময়ে বজল আহমদ ক্লান্ত অনেকটা বিপর্যস্ত। বজল আহমদ, এতক্ষণ উত্তম পুরুষের মধ্যে বাস করে নিজের অবগুণ্ঠনের শাস্তি পাচ্ছিল। এখন সে মুক্ত। তবে, অন্যজনকে মুক্ত করে দেবে এমন উদার সে নয়। সে বলে, আমার দৃষ্টি আজও অব্দি ভাঙা-গড়ার সড়ক ধরে অনেক দূরে…  কীভাবে মুক্তি! স্ত্রী হাসনা আহমেদ এর ঘুম ভাঙে প্রত্যহ বেলা করে। স্ত্রী কে সাধারণত ঘুম থেকে ডাকে না। অসুস্থ শরীর গত দু’বছর আগে ফিমার ভেঙে যাওয়াতে চেন্নাই বেলোর হাসপাতালে হিপজয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট হয়েছিল। সে-ই থেকে অনর্থক   ঘাটাঘাটি করে না। বারান্দা থেকে ঘরে প্রবেশ করে বজল আহমদ লক্ষ্য করে, স্ত্রী বেশ ফুরে ফুরে মেজাজ নিয়ে সোফায় বসে দিব্যি বেশ কিছু সংসারের হিসাবনিকাশ নিয়ে ব্যস্ত।

Ñআজ খুব তাড়াতাড়ি উঠলে মনে হয়। হঠাৎ ঘরে সকালের সূর্য কেন?

স্ত্রী কোনো কথা না বলে হাতে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে বলে, মেহমান আসবে বাজার করে নিয়ে এসো।

কথা মাটিতে পড়তে দেয় না। বলতে থাকে গলায় কপট ঝাঁজ ও মিষ্টি মিশিয়ে, খবর তো রাখনা। চশমা নিয়ে সেমিনার করে বাড়ি ফিরে এখনও ভাবছ  চশমাসহ ইতিহাস উদ্ধার করে এসেছ। এবার ইতিহাস না দেখে চশমা দিয়ে বাজার ও জিনিসপত্রের লাগামহীন দর দেখে এসো। তুমি তো সোজা পথে যাবে, পারলে উল্টোদিকে ঘুরে পুড়ে ছারখার হওয়া বঙ্গবাজারও দেখে এসো। চশমা ছাড়া কিছু তো দেখ না। স্ত্রীর কথার পাল্টা জবাব দিতে ইচ্ছে করে না।

চশমার কাচ পরিস্কার করতে করতে বজল ভাবে, আমি আসলে কিছুই দ্যাখি না। চশমা দ্যাখে, চশমা ভারী এবং চোখের অতিরিক্ত সুন্দর সারি সারি মেঘ দ্যাখে, রমজান মাসের আকাশ দ্যাখে, ধোঁয়ায় কয়লা হওয়া বঙ্গবাজারের ছাইভস্ম ও দ্যাখে। চশমা যে দ্যাখে এটা কেউ বোঝেনা।

চোখের চেয়ে চশমার দায়িত্ব এখন অনেক বেশি।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট