চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

আমি আমার মায়ের কথা বলছি

রেজা মতিন

১২ মে, ২০১৯ | ১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সময়টা ১৯৮৩ সাল জানুয়ারি মাসের ২৪ তারিখ শীতকাল। আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছি মা আমায় গোসল সেরে খেতে আসতে বললেন। আমি বললাম আপনি ছোট ভাই বোনদের নিয়ে বসেন আমি আসছি। গোসল শেষে ঘরে ফিরতেই খাবার টেবিল থেকে ছোট বোন চিৎকার করে বলল, ‘ভাইয়া, দেখ মা এর কি হয়েছে কথা বলতে পারছে না’। আমি মা কে জিজ্ঞেস করতেই মা ইশারায় আমাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে মুখে শব্দ নেই। আমি চিৎকার করে জানতে চাইলাম মা কি হয়েছে? মা হাত ইশারায় আমাকে বলছে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। এইটুকু বলে মা চোখ বন্ধ করলেন। আমার সাথে মা এর সর্বশেষ কথা। এরপর ডাক্তার এলেন যথারীতি মা কে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হল। জানতে পারলাম মা স্ট্রোক করেছেন। টানা দুইদিন হাসপাতালের বিছানায় চোখ বন্ধ করে মা আমার সাড়া শব্দহীনভাবে শুয়ে আছেন। হঠাৎ তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় মা এর মুখ থেকে ‘আহ উহ’ করে একটু আওয়াজ হল। আমরা সবাই খুশি এই বুঝি মা এর জ্ঞান ফিরছে। বুক ভরা আশা নিয়ে রাতে বাড়ি ফিরলাম। মনে মনে ভাবছি হয়ত আগামীকাল সকালে মা আমার চোখ খুলবে, কথা বলবে। রাতে যথারীতি আমার বড় ভাইয়ের সাথে ঘুমিয়েছি মাঝ রাতে স্বপ্ন দেখছি ‘সাদা আলখেল্লা’ পরিহিত মুখ দেখা যাচ্ছে না কেউ একজন আমাকে বলছেন এই শোন একটি সাইনবোর্ড এনেছিস কেনো, দুটি আনতে পারলি না। একটি তোর বাবা- আরেকটি তোর মায়ের জন্য (এখানে বলে রাখা প্রয়োজন ১৯৮২ সালের ১৭ নভেম্বর আমার বাবা হার্ট এট্যাকে মারা যান। উনার কবরের উপর লাগানোর জন্য তৈরি করা সাইনবোর্ডটি তখন আমাদের বাসায় ছিল। যা হোক বাবার কথায় পরে আসছি।) স্বপ্নে দেখা সেই আলখেল্লা পরিহিত মানুষটিকে তখন আমি কান্না করে বলছি আপনি এসব কি বলছেন। আমার বাবা মারা গেছে এইজন্য একটি সাইনবোর্ড (নামফলক) এনেছি। আমার মা বেঁচে আছেন তার জন্য কেন সাইনবোর্ড আনব। আমি জানি না এই স্বপ্ন কতক্ষন স্থায়ী ছিল। কেঁদে কেঁদে মাথার বালিশ চোখের পানিতে ভিজিয়েছি। শুধু এইটুকু মনে আছে শত চিৎকার আর কান্না করেও আমার বড় ভাইকে আমি জাগাতে পারছি না। হয়ত সে কিছুই শুনছে না। তবে আমার কানে ফজরের আযান এর শব্দ ভেসে এল। কান্না আর চিৎকারের এক পর্যায়ে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর কখন ঘুমের কোলে ঢোলে পড়েছে জানি না। হঠাৎ আমার বড় খালার মেঝো ছেলে ইকবাল ভাইয়ের কান্না আর চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে বলছে আমার হেলেনা খালা আর বেঁচে নাই। ফজরের আযানের পূর্বেই নাকি মা মারা গেছে। সেদিন অর্থাৎ ২৭ শে জানুয়ারি ১৯৮৩ সাল সেই সকাল বেলার তখনই স্বপ্নে দেখা সেই আলখেল্লাধারীর কথা আমার মনে হল। আর এও বুঝলাম আমার মা সেই সময়ই (আলখেল্লাধারীর সাথে কথা বলার পরেই) মারা গেছেন। এরপর কি হয়েছিল আমার ঠিক মনে নেই। তবে এতটুকু শুনেছি বাবার মৃত্যুর পর অনেক কেঁদেছিলাম কিন্তু বাবার মৃত্যুর মাত্র ৭০ দিনের মাথায় মা এর মৃত্যুতে আমার চোখে পানি আসে নি, আমাকে শতচেষ্টা করেও কেউ কাঁদাতে পারে নি। আমি কাঁদতেও পারিনি মায়ের মৃত্যুর পর বেশ ক’বছর। বেঁচে থাকা আমার নানু সবসময় আমাদের বলতেন, “তোদের বাবাই আমার মেয়েকে জোর করে সাথে নিয়ে গেছে। আমার মেয়ের তো এত তাড়াতাড়ি তোদের ছেড়ে চলে যাবার কথা ছিল না”। নানুর একথা গুলোর অর্থ তখন ঠিক বুঝতে পারি নাই। পরবর্তীতে বুঝেছিলাম কারণ আমার বাবা হঠাৎ মারা যাবার পর দেখতাম আমার মা আমাদের কারো সাথেই ঠিক মত কথা বলতেন না। সবসময় চুপ করে কি যেন ভাবতেন। আমি আমার দাদুকে দেখিনি তবে দাদাকে অল্প সময় পেয়েছিলাম। আমার বাবা-মা মারা যাবার পরও বেশ ক’বছর আমার নানা নানু বেঁচেছিলেন। তাদের কাছে শুনেছি। আমার বাবা ও মামা উভয়েই বন্ধু ছিলেন। সেই সুবাদে বাবার নানুদের বাসায় যাতায়াত ছিল। মা কে বাবা পছন্দ করতেন। তবে বিয়েটা হয়েছিল দুই পরিবারের সম্মতিতেই। বাবা-মায়ের মধ্যে প্রচন্ড ভালবাসা ছিল। এই জন্যই নানু আমার বাবাকে নিয়ে ঐ কথাগুলো বলেছিলেন। আমরাও পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছিলাম বাবা-মায়ের প্রচন্ড মিলের কথাগুলো। বাবা বাইরে থেকে বাসায় ঢোকার সময় নিজের ফেরার কথা জানান দিতেন গলায় কাশির শব্দ করে এবং পায়ের জুতার একটু আওয়াজ করে। ঘরে এসেই চিৎকার করে আমাদের বলতেন এই তোদের মা কোথায়, চিৎকার করে মা কে ডাকতেন “হেলি তুমি কোথায় (আমার মায়ের নাম হেলেনা বেগম। বাবা মাকে হেলি বলে ডাকতেন)”। দেখা যেত মা হয়ত রান্না ঘরে বাবার চিৎকারে দৌড়ে এসে হেসে হেসে জবাব দিতেন আপনার জন্য কি কোথাও যেতে পারব না। ঘরে আমরা সবাই আছি কিন্তু বাবা আমাদের সাথে মা এর সাথে কথা বলার আগে কথা বলতেন না। বাবার মৃত্যুর পর এভাবে মায়ের মৃত্যু। এরপর নানুর কাছে শোনা এবং নিজের স্মৃতিতে গেঁথে থাকা ঐসব দৃশ্যগুলোই প্রমাণ করে আমার বাবার প্রচন্ড ভালবাসার টানেই আমার মা চলে গেছেন। আমার নানু সত্যি কথাই বলেছিলেন। আমার বাবার অতি ভালবাসায়ই আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট