চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

স্মরণ: অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.)

যিকরু হাবিবীল ওয়াহেদ

৩০ জানুয়ারি, ২০২৪ | ৫:৪০ অপরাহ্ণ

মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে মন্থন করে যাঁরা ইসলামের ঠিক রূপরেখা মানুষের সামনে উপস্থাপনপূর্বক বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশে ইসলামের উদ্যানকে নিজেদের বর্ণনার পারঙ্গমতায়, চরিত্রের মাধুর্যে, বিরামহীন সাধনা ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে, দক্ষতা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে সুবিস্তৃত, সুশোভিত এবং পরিপুষ্ট করেছেন তাঁদের মধ্যে বাংলার প্রাজ্ঞ আলেম সমাজহিতৈষী অধ্যক্ষ আল্লামা মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.)অন্যতম।

 

অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের বীর প্রসবিনী উপজেলা রাউজানের ঐতিহ্যবাহী গশ্চি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শ্রদ্ধাভাজন পিতা হলেন সর্বজনাব সমাজপতি সুফী হাজী দুলা মিয়া (রহ.)। হুযুরের পিতা এলাকার ফরহেজগারী পরোপকারী এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাই স্বাভাবিক কারণেই বাল্যকালে অধ্যক্ষ হুযুর কড়া ধর্মীয় অনুশাসন ও সম্ভ্রান্ত পরিবেশ এবং পরিসরে বেড়ে ওঠেন। যার প্রভাব তাঁর পরবর্তী জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিভাত ঘটে।

 

অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) এর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি পারিবারিক পরিবেশে সমাপ্ত হয়। এরপর চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ দারুল উলুম এবং ওয়াজেদিয়া আলিয়ায় শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর উচ্চ শিক্ষা লাভার্থে ১৯৪১ সালে তদানীন্তন অবিভক্ত ভারতবর্ষের ইউপি জেলা মুরাদাবাদে ছদরুল আফাজিল আল্লামা ছৈয়্যদ নঈম উদ্দিন মুরাদাবাদী (রহ.) এর প্রতিষ্ঠিত জামেয়া নঈমীয়াতে ভর্তি হন। সেখানে খুব স্বল্প সময়ে নিজের মেধার প্রখরতায় আচার আচরণের মাধুর্যে অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি তাঁর ওস্তাদ ছদরুল আফাজিল (রহ.)’র নজর কাড়েন। জামেয়া নঈমীয়ায় ছদরুল আফাজিল (রহ.) এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিক্ষায় অধ্যক্ষ হুযুর তাফসির শাস্ত্র, হাদিস শাস্ত্র, বিশেষ করে ফিকহ শাস্ত্রে অগাধ ব্যুৎপত্তি লাভ করে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রায় এক যুগ অধ্যয়নের পর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

 

মহান আল্লাহ্ তায়ালার মনোনীত ধর্ম ইসলামের সঠিক শিক্ষা বিতরণের মহান মানসে অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে বোয়ালখালী চরণদ্বীপ রজভীয়া ইসলামীয়ায় প্রধান মুহাদ্দেস হিসাবে যোগদান করে বেশ কয়েক বছর অত্যন্ত দক্ষতা এবং সুনামের সহিত স্বীয় দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৯৬৪ সালে স্বীয় পীর ও মুর্শিদ আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রহ.) এর প্রতিষ্ঠিত ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ায় অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বেশ সুনামের সহিত এবং বেশ দক্ষতার সাথে উক্ত দায়িত্বের আনজাম দেন। মাঝখানে বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক কাজ করেন অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.)।

 

পরবর্তীতে যখন চট্টগ্রামের পূর্বে তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে ১৯৭৬ সালে হুযুর কেবলা আল্লামা তৈয়্যব শাহ (রহ.) এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় চন্দ্রঘোনা মাদ্রাসা এ তৈয়্যবীয়া অদুদীয়ায় প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করে খুব স্বল্প সময়ে চট্টগ্রামের অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন এবং বছরখানেকের ভিতর মাদ্রাসার মূল ভবনের দ্বিতল পর্যন্ত নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য স্থানীয় তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান (মরহুম) সৈয়দুল হককে সম্পাদক করে সুযোগ্য সুদক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে প্রাজ্ঞতার পরিচয় দেন। পরবর্তীতে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) শিক্ষাকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

 

অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) এর ভাষা বাচনভঙ্গি অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং তথ্যবহুল হওয়ায় হুযুরের ওয়াজ নছিহত ছিল মনোমুগ্ধকর। সেই কারণে মোনাজির হিসেবে হুযুরের সুখ্যাতি ছিল পুরো দেশজুড়ে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রচার প্রসারে অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) এর ভূমিকা অতি উজ্জ্বল এবং প্রশংসনীয়। এমন বহু এলাকায় নিজের টাকা মেধা শ্রম দিয়ে সুন্নীয়তের প্রচার প্রসার করেছেন, যেখানে ইতিঃপূর্বে কখনোই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ সালাম পেশ করা হয়নি। সে কারণেই তৎসময়ে তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের রাহবার হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন।

 

অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) অত্যন্ত দক্ষ সংগঠক ছিলেন। যার কারণে সংগঠন প্রিয় ছাত্রদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ছাত্রসেনার প্রতিষ্ঠাকালীন শহীদ- হুযুরের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র শহীদ হালিম হুযুরের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনাকে চন্দ্রঘোনা তৈয়্যবীয়া মাদ্রাসায় এবং উত্তর চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন। মোদ্দাকথায় চট্টগ্রামজুড়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এবং ছাত্রসেনা প্রতিষ্ঠায় হুযুরের ভূমিকা ছিল আকাশচুম্বি।

 

এছাড়াও ‘ইসলাহুল মুসলেমীন বাংলাদেশ’ নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে ব্যাপক কাজ করেন অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.)। সমাজচিন্তক হিসেবেও অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) এর ভূমিকা অত্যুজ্জ্বল। তিনি নিজ জন্মস্থান দক্ষিণ রাউজানের আপামর জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে তদানীন্তন স্পিকার ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীকে দক্ষিণ রাউজানকে স্বতন্ত্র থানা করার প্রথম প্রস্তাব দেন। চৌধুরী হুযুরের প্রস্তাবে দক্ষিণ রাউজানকে স্বতন্ত্র থানা করার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। সেই কারণে বোদ্ধামহলে হুযুরকে দক্ষিণ রাউজানকে স্বতন্ত্র থানা করার স্বপ্নদ্রষ্টাও বলা হয়ে থাকে।

 

কাদেরিয়া তরিকার মহান সাধক আলে রাসুল সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রহ.) হতে মহান কাদেরিয়া তরিকার খিলাফত প্রাপ্ত হন অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.)। তিনি জীবদ্দশায় তাঁর পীর ও মুর্শিদ আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রহ.) এর সাথে তরিকতের কাজের আনজাম দিতেন। পাশাপাশি তিনি কাদেরিয়া তরিকার প্রসারার্থে নিজ বাড়ির পাশে খানকায়ে কাদেরিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সহস্রাধিক মুরিদ পুরো দেশজুড়ে কাদেরিয়া তরিকার প্রচার প্রসারে এবং খেদমতে নিয়োজিত আছেন। সর্বোপরি তিনি কাদেরিয়া তরিকার একজন মহান পীর ছিলেন।

 

অধ্যক্ষ মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করার পাশাপাশি নিজের বাড়ির পাশেই প্রতিষ্ঠা করেন গশ্চি তৈয়্যবীয়া রহমানিয়া মাদ্রাসা। যা এখনো অত্র অঞ্চলে জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

 

ঈমান ইসলাম ও সুন্নিয়তের মহান দিকপাল বাংলার প্রাজ্ঞ আলেম সমাজহিতৈষী অধ্যক্ষ আল্লামা মুফতি হাবিবুর রহমান নঈমী সিরিকোটি (রহ.) পার্থিব জগতের সকল লেনদেন সাঙ্গ করে এবং বহুমুখী অবদান অবশেষে ১৪০৯ হিজরির পবিত্র হজের মাসের ১লা জিলহজ্ব বুধবার রাত ৮ ঘটিকার দিকে মহান প্রভুর একান্ত সান্নিধ্যে গমন করেন। তাঁর নামাজে জানাজা পড়ান, উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদিস শরীফ বিশারদ, আলে রাসুল সৈয়্যদ ওবায়দুল মোস্তাফা মুহাম্মদ নূরুচ্ছফা নঈমী আশরাফী (রহ.)। তাঁর নামাজে জানাজায় লক্ষাধিক মুসলমান অংশগ্রহণ করেন।

 

ইসলামী জগতের এ মহান ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠিত গশ্চি তৈয়্যবীয়া রহমানিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাঁর প্রবর্তিত স্বীয় পীর ও মুর্শিদ আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রহ) এর ওরশে পাক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ইংরেজি হিসেবে প্রতিবছর ৩০ জানুয়ারি তারিখে। পরবর্তীতে হুযুরের ইন্তেকালের পর উক্ত তারিখে তাঁরও ওরশে পাক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তাই আসুন দলে দলে হুযুর কেবলা আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রহ.) এর পরশ ধন্য গশ্চি হাবিবীয়া দরবার শরীফে ছুটে যায় এই পড়ে পড়ে–

“আশেকে মোস্তাফা কেবলা শাহ হাবিবর রহমান
উছ খলিফায়ে আখির পে লাখো সালাম।”

 

লেখক: কলামিস্ট, সংগঠক

 

পূর্বকোণ/জেইউ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট