চট্টগ্রাম শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

বেলা ফুরাবার আগে

সূর্য্যানী ভট্টাচার্য

১২ জানুয়ারি, ২০২৪ | ৭:০৫ অপরাহ্ণ

এক ষাটোর্ধ আন্টির ডায়েট চার্ট নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন এক আংকেল। আন্টির শারীরিক সমস্যা তেমন কিছু নেই। বয়স হচ্ছে। পরবর্তীকালে যাতে শরীরে সমস্যা না হয় তাই চার্ট নেওয়া। করে দিয়েছিলাম। মেপে ভাত, দুধ, ঘি, মাছ, মাংস।

 

আংকেল পরশু ফোন করলেন। আমতা আমতা করে বললেন, সূর্য্যানী একটা অন্যায় আবদার করতে ফোন করেছি। আমি বললাম, বলো আংকেল। 

 

তিনি বললেন, এই জানুয়ারির শেষে একদিন তোমার আন্টি কি কচুরি আলুরদম খেতে পারেন? আমি নিজের ডায়েট প্ল্যানে চিট ডে এলাও করি। তাই অসুবিধা ছিল না উনি একদিন কচুরি তরকারি খেলে। তাও, ডায়েটিশিয়ান তো। ওইভাবে বলতে পারি না। বললাম কেন আংকেল, অ্যাভয়েড করা যাবে না?

 

আংকেল বললেন, আসলে জানুয়ারির শেষে আমাদের বিবাহবার্ষিকী। ওই দিন তোমার আন্টিকে নিয়ে ঘুরতে যাব। আমার এই শুনেই ভারি ভালো লেগেছিল। বলে ফেলতে যাচ্ছিলাম, ঠিক আছে। আন্টি সেইদিন যা খেতে ইচ্ছে খেতে পারেন।

 

কিন্তু আংকেল বলে চলেছেন, আসলে জানো পুরুলিয়ায় যেখানে আমাদের বাড়ি সেখান থেকে একটু দূরে একটা ছোট পাহাড় আছে। সেই পাহাড়ের কাছে একটা ছোট মতো চায়ের দোকান ছিল। সকালের দিকে কচুরি তরকারি বানাত বেশ ভালো সেই দোকানে। আমি তখন কলেজ পাশ করা বেকার। তোমার আন্টি ওই দোকানের সামনে দিয়ে যখন স্কুল যেত, আমি তোমার আন্টিকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম ওইখানে। তখন পাড়া গাঁয় এসব নিষিদ্ধ ব্যাপার ছিল। তাই শুধু শুধু দোকানে দাঁড়িয়ে থাকলে পাছে লোকে বুঝে ফেলে, নিত্যদিন আমি কচুরি খেতাম সেখান থেকে। সেই কচুরি স্বাদে ভালো হলেও পেটের পক্ষে মোটেই খুব একটা ভালো ছিল না। রোজ একপেট অম্বল নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। কিন্তু তাও পরের দিন যেতাম। ওই যে কয়েক মিনিট, তোমার আন্টি ওখান দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুল যেত, ওই সময়টুকুর জন্য।

 

তারপর চাকরি বাকরি পেলাম। তোমার আন্টি কলেজ পাস করল। বিয়ে হলো। সংসারের পাকে চক্রে ভুলেই গিয়েছিলাম সে সব কথা। সেদিন হঠাৎ মনে পড়ল। দিন তো ফুরিয়ে আসছে। তাই ভাবলাম, একবার তোমার আন্টিকে নিয়ে ঘুরে আসি। সেই দোকান আজ আর নেই। কিন্তু সেই জায়গাটা আছে। সেই সময়টা চলে গেছে, কিন্তু সেই পাহাড়, সেই পাহাড় চূড়ায় মন্দির, সেই স্কুল তারা তো আছে।

 

আমি বললাম, আর আংকেল সেই মনটাও আছে একই রকম, আর ভালোবাসাটাও।

 

আংকেল বলল, ইয়েস ইয়ং লেডি। তা আছে।

 

ভালোবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস। গোলাপি গোলাপি শিমূল ফুলের মতো। বাক্সবন্দি করে পাথর বেঁধে জলের নিচে দীর্ঘকাল ফেলে রেখে তার কথা ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু আবার কখনও মনে পড়লে যদি কেউ সেই বাক্স খোলে, বাতাস পেলেই সেই শিমুল ফুলের পাপড়ি অবাধ্য হয়ে উঠবে।

 

এই যে আমার পিসি সকাল থেকে বসে বসে এই ঠান্ডায় কচুরি বানালো, কেন? ভালোবাসে বলেই না? আমি কী নিজে কচুরি বানিয়ে খেতে পারি না? বেশ পারি। কিন্তু তাও, আহা মেয়েটা আর ক’দিন পর চলে যাবে, একা একা সব করতে হবে ওকে, তাই একটু রেধে খাওয়াই – এই ভাবনাটা আসে ভালোবাসে বলেই না?

 

আজ ব্রেকফাস্ট করতে করতে ভাবছিলাম, দূরে কোথাও পাহাড়ের সামনে দুটো মানুষ গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বয়সের ভারে ক্লান্ত কিন্তু মনটা রয়ে গেছে সেই একই। কলেজ পাস করা ছেলেটির আর স্কুল যাওয়া মেয়েটির মতোই। অজস্র ভেঙে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া, পরিণতি না পাওয়া ভালোবাসার দিকে তাকিয়ে তারা বলছে, দেখো আমরা পারলাম।

 

ভালোবাসা সংক্রমিত হোক।

 

আর আমি কচুরি খাই জানালার ধারে বসে বসে।

 

 

পূর্বকোণ/জেইউ/পারভেজ

শেয়ার করুন