চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ১:০৯ অপরাহ্ণ

বানিয়াসান্তায় বিউটি’র ‘রক্তের ইতিহাসের সাক্ষ্য’

‘বিউটি সার্কাস ‘ কাহিনি ও সংলাপে প্রান্তিক চরিত্রের চিরায়ত দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। সার্কাসকে ঘিরে আবর্তিত গল্পে একজন নারীর জীবন সংগ্রামের গল্পো, চিত্রায়ন এক কথায় অসাধারণ। তবে, সার্কাস সংস্কৃতির বাইরে গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ ছিলো ; সেটি মুখ্যত প্রশংসার দাবিদার। গল্পের শুরুতে বেশ ভালো হয়েছে ; কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্পটি অতীতের স্মৃতি, পিতৃহত্যার প্রতিশোধ এমন সব গতানুগতিক পথে হেঁটেছে ‘ বিউটি সার্কাস ‘। এইখানে আরো অনেক বেশি প্যাচওয়ার্কের প্রয়োজন ছিল।

ছবি মুল চরিত্র বিউটি (জয়া আহসান) নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘বিউটি সার্কাস‘ দলের মালিক ও দক্ষ খেলোয়াড়। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিউটি সার্কাসের খুব নামডাক। মানুষজন বিউটির সার্কাস খেলা দেখার জন্যে তাবু-প্যান্ডেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বিউটি তার দল নিয়ে বানিয়াসান্তা নামক একটি গ্রামে সার্কাস খেলা দেখাতে যায় যেখানে তার ওপর তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নজর পড়ে— রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী নবাব (তৌকীর আহমেদ), বানিয়াসান্তার শেষ জমিদার মির্জা মোহাম্মদ বখতিয়ার (ফেরদৌস) ও চোরাকারবারি রঙলাল (এবিএম সুমন)। তিনজনই বিউটির প্রেমে পড়ে যায় এবং তাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিউটি এদের কারো প্রেমেই পড়ে না। কারণ বিউটিকে বানিয়াসান্তায় এনেছে তার অতীত, প্রতিশোধের স্পৃহা। বিউটির কাছে সেটি ‘ রক্তের ইতিহাসের সাক্ষ্য ‘।

স্ক্রিপ্ট লেখা, অডিশনিং, পরিচালনা, সম্পাদনা, প্রাক-প্রোডাকশন এবং পোস্ট-প্রোডাকশনের মাধ্যমে প্রাথমিক প্লট কল্পনা করা থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াটির প্রতিটি পর্যায়ে অনেক ছোট-বড় উপাদানের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণ আসলে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অবশ্যই আর্থিকসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এটির পরিবর্তন ঘটে। কম বাজেটে উচ্চ প্রত্যাশার ছবি নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাই একটি গল্পের উচ্চাশা অংশটুকু কমিয়ে কম বাজেটে যতটুকু সম্ভব হয়, সে অনুসারে পরিকল্পনা করা উচিত বলে আমি মনে করি।

বিউটি সার্কাস দেখে মনে হয়েছে এটি একটি স্বাধীন চলচ্চিত্র, যা একটি বৃহৎ বাজার দর্শকের পরিবর্তে একটি বিশেষ বাজারকে লক্ষ্য করে নির্মাণ করা হয়েছে । চলচ্চিত্র সমালোচক এবং চলচ্চিত্র অধ্যয়ন পণ্ডিতরা এটিকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন।

ছবিটির আনুষ্ঠানিক গুণাবলী, অভিনয়, শুটিং লোকেশান ভারতীয় উপমহাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র থেকে আলাদা বলে চিহ্নিত করেছে। সান-এন্ড-স্যান্ড কালার প্যালেটে আকাশী নীল এবং পরিচ্ছদের কাজে আশাবাদী দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে। ১৯৫০ এর দশকের ককটেল পোশাকের মতো একটি স্বপ্নের সার্কাস পোশাক সিনেমাটিতে সত্যিই মানিয়েছে।

ছবি অন্যান্য উপাদানগুলির মধ্যে সামাজিক বাস্তববাদ শৈলী; জয়া আহসানের কর্তৃত্বপূর্ণ অভিনয়ের উপর জোর দেওয়া; একটি স্পষ্ট, লক্ষ্য-চালিত গল্প উপস্থাপন , চরিত্রগুলির চিন্তাভাবনা এবং স্বপ্নের উপর ফোকাস- এক কথায় অসাধারণ। দেশী চলচ্চিত্র শিল্প বা সিনেমা, চলচ্চিত্র ধারার নিজস্ব স্বতন্ত্র নিয়ম রয়েছে ; সেটি ছাপিয়ে গেছে ‘বিউটি সার্কাস ‘। সার্কাসে অপেশাদার জয়া নিজের নৈপুণ্য ও ঝুঁকির সবটুকু প্রকাশ করেছেন।

তবে, বানিয়াসান্তা নামের গ্রামটিকে ফুটিয়ে তোলা যায় নি। গ্রাম বা লোকেশানের জনবসতি খুব বেশি এবং একটি বিল্ট পরিবেশের বৈশিষ্ট্যের মতো শহুরে পরিবেশের আবহ ফুটে উঠেছে ; যেটি সার্কাসের আদলে ফুটে উঠেছে সত্য – গ্রামকে আরো বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা যেতো।

গ্রামীণ শহরগুলি বা শহরের বাইরের অংশে অবস্থিত ভৌগলিক অঞ্চলে সার্কাসের আধিক্য আছে ; কিন্তু শহুরে অঞ্চলের জীবন খুব দ্রুত, কিছুটা জটিল, যেখানে গ্রামীণ জীবন সহজ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়। এমন স্বাচ্ছন্দ্যে সার্কাসের গ্রামিণ পরিবেশটা কিছুটা ভিন্ন হতে পারতো।

বলতে গেলে নগর বন্দোবস্তের মধ্যে শহর, ছোট শহর – অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গ্রামীণ জনপদে গ্রাম এবং গ্রামগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ; সেটিই আসলে গ্রামীণ সংস্কৃতির মূল অনুষঙ্গ। ‘বিউটি সার্কাস ‘ নির্মিত পরিবেশের অস্তিত্বের কারণে শহরাঞ্চলে প্রকৃতি থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা থাকা উচিত ছিল ।

বানিয়াসান্তার শেষ জমিদার মির্জা মোহাম্মদ বখতিয়ার (ফেরদৌস) চরিত্রে আরও বৈচিত্র্যের সংযোজন করা উচিত ছিল। তবে গ্রামীণ অঞ্চলগুলির সংস্কৃতি, দ্বন্দ্ব, প্রথাগত ক্রোধ, জীবন যুদ্ধের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে বিউটি সার্কাস। কোন চরিত্রে অভিনয়ে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় নি।

যখন সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টি আসে তখন নগরবাসী আরও ভাল সুযোগের সন্ধানে ঘন ঘন তাদের পেশা বা বাসস্থান পরিবর্তন করায় তারা অত্যন্ত নিবিড় থাকে। তবে গ্রামাঞ্চলে মানুষের পেশাগত বা আঞ্চলিক গতিশীলতা তুলনামূলকভাবে কম নিবিড়। ‘বিউটি’ চরিত্রে এই বিষয়টি গল্পে উপেক্ষিত হয়েছে।

স্বাধীনতাপূর্ব সার্কাস সংস্কৃতির সাথে আশির দশকের পিকেট ফেন্স পারফেকশনের যোগসাজশ আছে , ড্রেসগুলি খুব কমই চকচকে এবং ত্রুটিহীন হয়- যতটা দর্শকের ধারনায় জমা থাকে । ‘বিউটি সার্কাস’ এ ড্রেসিং কনসেপটি গতানুগতিক হলেও মানিয়েছে।

ইউরোপীয়দের সংস্কৃতিতে সার্কাস অনেকটাই স্থিতিস্থাপক সাংস্কৃতিক সেক্টর। বিস্ময়কর সার্কাস পারফরম্যান্সের মাধ্যমে জনগণের বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিশ্বের অন্যান্য অংশে উন্নীত করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাদের সার্কাস টিমগুলো। বিশ্বের সমস্ত কোণে তাদের তরুন সার্কাস দলের বিস্তৃতি ঘটেছে। তারা গর্বের সাথে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে তাদের অনন্য এবং রঙিন সংস্কৃতি দেখিয়েছে ; সেখানে বাঙালি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পুরোটাই উল্টো। যেমন : ইথিওপিয়ান সার্কাস শিল্প বর্তমান বিশ্বের সমসাময়িক সার্কাস শিল্প বিকাশে একটি বিশেষ স্বাদ যোগ করেছে। আর বাঙালিদের ক্ষেত্রে নানা দ্বন্দ, সামাজিক আচার বিবর্তনের সাথে সাথে সেই শিল্পের অকাল মৃত্যু ঘটেছে।

প্রতিটি জনসংখ্যার নির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠী কীভাবে মিডিয়া এবং বিনোদনকে গ্রহণ করে সে সম্পর্কে এই ছবিটির কিছু দৃশ্য গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলির উপর ফোকাস করে যে কোনও আচরণগত পরিবর্তন, একটি চির-পরিবর্তিত ল্যান্ডস্কেপে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির অনুষঙ্গগুলির জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগুলির উপর জোর দেয়া হয়েছে।

দর্শকদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন বিনোদন বিন্যাস অন্বেষণ, বয়সের ডেমোগুলিকে সবচেয়ে বিনোদনমূলক বলে মনে করা, টিভি, স্ট্রিমিং, চলচ্চিত্র এবং সঙ্গীতের উপলব্ধি, বিনোদনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা এবং সমাজে এর অনুভূত নেতিবাচক প্রভাব, চলচিত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব খুব শক্তিশালী কিনা – সেটি বুঝতে আমি মুক্তির শুরু থেকে সরকারি অনুদানের ‘ছবি’ বিউটি সার্কাসের কাটতি বিশ্লেষণ করতে চাই।

লেখক : ওয়াহিদ জামান, সাংবাদিক

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট