চট্টগ্রাম বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৬

সর্বশেষ:

মানহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার: শুধু সিলগালা নয়, চাই কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা

মানহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার: শুধু সিলগালা নয়, চাই কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

১ এপ্রিল, ২০২৬ | ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো মানহীন ও অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের বিস্তার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা অন্তত ১,০২৭টি; অন্যদিকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৫,২৩৩। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

 

এটি নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভুল চিকিৎসা, ভুয়া রিপোর্ট, অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তির মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, নিরাপত্তাহীন এক্স-রে ব্যবস্থা, কেমিক্যালের অনিরাপদ ব্যবহার, ভুয়া চিকিৎসক এবং অদক্ষ নার্স ও আয়া দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার মতো ভয়াবহ অনিয়ম এখন অনেক ক্ষেত্রেই নিত্যদিনের বাস্তবতা। ফলে রোগীরা পড়ছেন মারাত্মক ঝুঁকিতে।

 

বর্তমান আইনে লাইসেন্স ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে পরিচালিত কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বহু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হলেও, কিছুদিন পরই সেগুলোর অনেকগুলো আবার চালু হয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে-শুধু সিলগালা করে কি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব?

 

প্রকৃতপক্ষে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবৈধ প্রতিষ্ঠানের তালিকা জানলেও সেগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারছে না। এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, পর্যাপ্ত জনবল নেই। দ্বিতীয়ত, সিভিল সার্জনদের নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। তৃতীয়ত, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। ফলে অভিযানের কার্যকারিতা অনেক সময় সাময়িক পর্যায়েই আটকে থাকে।

 

সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ, হালনাগাদ ও নির্ভুল ডাটাবেজ। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কতগুলো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক রয়েছে, সেগুলোর অবস্থান, মালিকানা, লাইসেন্সের অবস্থা, সেবার ধরন এবং অনিয়মের মাত্রা-সবকিছুর একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান বৈধ, কোনটি অনিয়মে চলছে, আর কোনটি সম্পূর্ণ অবৈধ-এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা গেলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া অনেক সহজ হবে।

 

তবে তালিকা তৈরি করাই শেষ কথা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কার্যকর, কঠোর এবং স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। শুধুমাত্র সিলগালা করে কোনো লাভ নেই, কারণ এতে প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তীতে আবার চালু হওয়ার সুযোগ পায়। তাই অভিযানের সময় শুধু দরজা বন্ধ করে দেওয়া নয়; প্রতিষ্ঠানের সব যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, সংরক্ষিত নথিপত্র ও কার্যক্রম-সংশ্লিষ্ট উপকরণ জব্দ করা জরুরি। এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ল্যাবের যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটারের সরঞ্জাম, রোগীর রেকর্ড-সবকিছু ক্রোক করে নিয়ে গেলে পুনরায় অবৈধভাবে কার্যক্রম চালানো অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।

 

এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট জেনেরিক সিজার লিস্ট প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে প্রতিটি অভিযানে একই মানদণ্ড অনুসরণ করা যায়। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ধরন অনুযায়ী কোন কোন যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম, ওষুধ, রেজিস্টার, লাইসেন্স নথি, আর্থিক কাগজপত্র বা রোগীর নথি জব্দ করতে হবে-তার একটি মানসম্মত তালিকা থাকা প্রয়োজন। এতে অভিযানে স্বচ্ছতা ও আইনি দৃঢ়তা দুটোই বাড়বে।

 

পাশাপাশি, অভিযান পরিচালনার সময় একটি সমন্বিত টিম থাকা অপরিহার্য। সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং জব্দকৃত মালামাল পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন থাকতে হবে। অভিযান শেষে জব্দতালিকায় মালিক বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তির স্বাক্ষর নেওয়া হলে সেটি আইনি ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑএ ধরনের অপরাধকে শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম হিসেবে না দেখে, জনজীবনের জন্য বিপজ্জনক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা। ভুল চিকিৎসা, ভুয়া রিপোর্ট, অযোগ্য ব্যক্তির চিকিৎসা কার্যক্রম, কিংবা অনিরাপদ চিকিৎসা পরিবেশের কারণে যদি রোগীর ক্ষতি বা মৃত্যু ঘটে, তবে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটি অন্যদের জন্যও একটি দৃঢ় বার্তা হয়ে দাঁড়ায়।

 

শুধু দমনমূলক ব্যবস্থা নয়, একটি শক্তিশালী মনিটরিং কাঠামোও গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অবৈধ ও মানহীন বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য আলাদা মনিটরিং উইং গঠন করতে হবে। এই ইউনিটের অধীনে সারাবছর নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগ যাচাই, ফলোআপ অভিযান এবং লাইসেন্স নবায়ন-সংক্রান্ত কঠোর মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিমূলক সম্পৃক্ততাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই তদারকি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।

 

ডিজিটাল মনিটরিং এবং জনসচেতনতা বাড়ানোও এখন সময়ের দাবি। অনলাইনে লাইসেন্স যাচাইয়ের সহজ ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানের বৈধতার তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা, এবং অভিযোগ জানানোর জন্য একটি কার্যকর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে এই সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সাধারণ মানুষ যদি সহজেই জানতে পারেন কোন প্রতিষ্ঠান বৈধ আর কোনটি নয়, তাহলে অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বাজারও সংকুচিত হবে।

 

তবে সব প্রতিষ্ঠানকে একই দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানকে মানসম্মত কাঠামো, দক্ষ জনবল, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে আনা সম্ভব, সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতারণা, ভুয়া চিকিৎসা, ভুয়া রিপোর্ট এবং গুরুতর অনিয়মের মাধ্যমে মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, তাদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই।

 

সবশেষে বলতে হয়, মানহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রশাসনের একক দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। মানুষের জীবন নিয়ে কোনো আপস চলতে পারে না। তাই সময় এসেছে শুধু সিলগালার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে একটি কঠোর, সমন্বিত, আইনসম্মত এবং স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের। স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণা ও অবহেলার এই বিপজ্জনক চক্র ভাঙতেই হবে-জনস্বার্থে, ন্যায়ের স্বার্থে, এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে।

 

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রান্সউইক, কানাডা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, ডালহৌসি ইউনিভার্সিটি।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন