
চিকিৎসাপেশা কেবল একটি পেশা নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, যেখানে রোগীর জীবন, মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা চিকিৎসকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। একজন রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তিনি কেবল শারীরিক অসুস্থতার কথাই বলেন না; অনেক সময় অত্যন্ত ব্যক্তিগত, সংবেদনশীল এবং গোপন তথ্যও চিকিৎসকের কাছে প্রকাশ করেন। এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাই রোগীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য (Personal Health Information –PHI) রক্ষা করা চিকিৎসা নীতির একটি মৌলিক স্তম্ভ।
রোগীর তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে- Confidentiality (গোপনীয়তা), Privacy (ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার) এবং Security (তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা)। Confidentiality বলতে বোঝায় চিকিৎসকের সেই পেশাগত অঙ্গীকার, যার মাধ্যমে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য অন্য কারও কাছে রোগীর অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না। রোগীরা তাদের চিকিৎসকের কাছে এমন অনেক তথ্য জানান, যা তারা অন্য কারও সাথে শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো সেই তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা। অন্যদিকে Privacy হলো রোগীর আইনি অধিকার। একজন রোগী নিজেই নির্ধারণ করবেন তার সম্পর্কে কোন তথ্য কে দেখতে বা জানতে পারবে। একজন রোগীর অধিকার আছে তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য কার কাছে প্রকাশ করা হবে বা হবে না-এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অর্থাৎ রোগীর অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন। Security বলতে বোঝায় সেই সব ব্যবস্থা বা সুরক্ষা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা, অখণ্ডতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এই ব্যবস্থা তিন ধরনের হতে পারেÑ প্রযুক্তিগত (যেমন পাসওয়ার্ড ও লগইন ব্যবস্থা), ভৌত নিরাপত্তা (যেমন লক করা ফাইল ক্যাবিনেট বা সুরক্ষিত রেকর্ড রুম), এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা (যেমন নীতিমালা, প্রশিক্ষণ এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত চুক্তি)। এই তিনটি উপাদান একত্রে রোগীর তথ্য সুরক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি করে।
বাংলাদেশে চিকিৎসকদের জন্য রোগীর গোপনীয়তা রক্ষার নীতিমালা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BM&DC)। তাদের Code of Professional Conduct, Etiquette and Ethics অনুযায়ী একজন নিবন্ধিত চিকিৎসককে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখতে হবে। এই নীতিমালা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল Declaration of Geneva-এর নীতির সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই নৈতিক বিধিমালা অনুযায়ী রোগীর তথ্য প্রকাশ করা যাবে কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে- যদি রোগী নিজে অনুমতি দেন, যদি আদালত বা আইনগত কর্তৃপক্ষ তা দাবি করে, অথবা জনস্বাস্থ্য বা বিচারিক স্বার্থে তা প্রয়োজন হয়। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রে এই নৈতিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। বিশেষ করে যখন কোনো রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী বা জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন তাদের রোগের বিস্তারিত তথ্য অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে বা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কখনও কখনও দেখা যায়, এমন চিকিৎসকেরাও রোগীর রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পদ্ধতি বা শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন, যারা সেই রোগীর চিকিৎসা টিমের সদস্যই নন। রোগী বা তার পরিবারের কাছ থেকে কোনো অনুমতিও নেওয়া হয় না। এই ধরনের আচরণ চিকিৎসা পেশার নৈতিকতার গুরুতর লঙ্ঘন।
সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতা মির্জা আব্বাস একটি কর্পোরেট হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার অসুস্থতার কারণ ও চিকিৎসা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য একজন চিকিৎসক সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। অথচ তিনি সেই রোগীর চিকিৎসা দলের অংশ ছিলেন না এবং রোগী বা পরিবারের কাছ থেকেও কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। পরে তিনি যুক্তি দেন যে, ‘মানুষ জানতে চায় বলেই তথ্য প্রকাশ করেছি।’ এই ধরনের যুক্তি চিকিৎসা নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের কৌত‚হল বা সামাজিক আগ্রহ কখনও রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের বৈধ কারণ হতে পারে না। একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রিয় অভিনেতা বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হলেও তিনি প্রথমত একজন রোগী, এবং তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য অন্য যেকোনো রোগীর মতোই সুরক্ষিত থাকা উচিত।
উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের মতো উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশে যদি কোনো চিকিৎসক এই ধরনের কাজ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি হারানো, পেশাগত লাইসেন্স স্থগিত হওয়া বা বাতিল হওয়ার মতো পরিণতিও হতে পারে। কারণ সেখানে রোগীর গোপনীয়তাকে চিকিৎসা নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চিকিৎসাপেশার মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। রোগী যদি বিশ্বাস করতে না পারেন যে তার ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ থাকবে, তাহলে চিকিৎসক–রোগী সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। এই কারণে চিকিৎসকদের উচিত- রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সাথে সংরক্ষণ করা, রোগীর অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য প্রকাশ না করা, ইগ্উঈ-এর নৈতিক বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা, এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা।
রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়ম নয়; এটি চিকিৎসা পেশার মর্যাদা, মানবিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার একটি অপরিহার্য ভিত্তি। একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসকের জন্য এই নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা শুধু পেশাগত কর্তব্যই নয়, বরং সমাজের প্রতি একটি নৈতিক অঙ্গীকার।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রান্সউইক। এসিসটেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর