
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য (এমপি) তার নির্বাচনী এলাকার সকল নাগরিকের প্রতিনিধিÑতিনি যে রাজনৈতিক দল থেকেই নির্বাচিত হোন না কেন, অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচিত হন। জনগণের প্রতিনিধিত্বের এই সাংবিধানিক মর্যাদা রক্ষার্থে নাগরিক ও প্রতিনিধির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক, সম্মানজনক ও জবাবদিহিমূলক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক, সরকারি কাঠামোবদ্ধ পাবলিক অফিস নেই। নাগরিকদের প্রয়োজনে ব্যক্তিগত বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করতে হয়, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী এবং নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যদের জন্য একটি বাধ্যতামূলক পাবলিক অফিস স্থাপনের লক্ষ্যে এই বিল প্রণয়ন প্রস্তাব করা হচ্ছে।
বিলের উদ্দেশ্য : ১) নাগরিক ও নির্বাচিত প্রতিনিধির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ নিশ্চিত করা। ২) নাগরিকের মানবিক মর্যাদা ও গোপনীয়তা (Privacy) রক্ষা করা। ৩) ব্যক্তিগত বাসভবন-নির্ভর সাক্ষাৎ সংস্কৃতি থেকে গণতান্ত্রিক অফিস-ভিত্তিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর। ৪) সংসদ সদস্যদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি। ৫) গণতন্ত্রকে ব্যক্তি-নির্ভর নয়, প্রতিষ্ঠান-নির্ভর কাঠামোতে রূপান্তর।
প্রেক্ষাপট ও সমস্যা বিশ্লেষণ : বর্তমান ব্যবস্থায়- নাগরিকদের প্রায়ই এমপির ব্যক্তিগত বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করতে হয়। এতে নাগরিকের নিজের অধিকার উপস্থাপনে মানসিক সংকোচ (hesitation) তৈরি হয়। ব্যক্তিগত পরিবেশে সাক্ষাৎ নাগরিকের গোপনীয়তা ও মর্যাদাকে প্রভাবিত করে। রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটানোর প্রবণতা সৃষ্টি হয়। সংসদ সদস্যের মধ্যে ‘জমিদারী মনোভাব’ গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। সকল নাগরিকের সমান প্রবেশাধিকার (Equal Access) নিশ্চিত হয় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের প্রতিনিধি ও নাগরিকের সম্পর্ক ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া আবশ্যক।
প্রস্তাবিত বিধানসমূহ :
ধারা ১: সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও কার্যকারিতা- এই আইন ‘জাতীয় সংসদ সদস্য (নির্বাচনী এলাকা পাবলিক অফিস স্থাপন ও পরিচালনা) আইন, ২০২৬’ নামে অভিহিত হবে এবং গেজেট প্রকাশের ৬ মাসের মধ্যে কার্যকর হবে।
ধারা ২: অফিস স্থাপন বাধ্যতামূলক : ১) প্রতিটি সংসদ সদস্য তার নির্বাচনী এলাকায় একটি স্থায়ী পাবলিক অফিস স্থাপন করবেন। ২) অফিসটি সরকারি অনুমোদিত স্থানে হবে এবং ব্যক্তিগত বাসভবনের সঙ্গে যুক্ত হবে না। ৩) সংসদ সচিবালয় অফিসের নকশা, মানদণ্ড ও কাঠামো নির্ধারণ করবে।
ধারা ৩: অফিস পরিচালনা কাঠামো: ১) একজন পূর্ণকালীন অফিস সেক্রেটারি নিয়োগ বাধ্যতামূলক। ২) প্রয়োজন অনুযায়ী সহকারী কর্মচারী নিয়োগ করা যাবে। ৩) অফিস সাপ্তাহিক পাঁচ কার্যদিবস খোলা থাকবে (সরকারি অফিসের আদলে)। ৪) নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে সংসদ সদস্য সরাসরি নাগরিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
ধারা ৪: নাগরিক সেবা ব্যবস্থা : ১) সাক্ষাৎ পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে হবে। ২) অভিযোগ ও আবেদন রেজিস্টার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। ৩) ডিজিটাল রেকর্ড ও অনলাইন আবেদন ব্যবস্থার ধাপে ধাপে প্রবর্তন। ৪) নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার্থে পৃথক সাক্ষাৎ কক্ষ (Private Consultation Room) থাকবে।
ধারা ৫: অর্থায়ন : ১) অফিস স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট সরকারি বরাদ্দ থাকবে। ২) ব্যয় সংক্রান্ত বার্ষিক অডিট বাধ্যতামূলক। ৩) ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে অফিস পরিচালনা করা যাবে না।
ধারা ৬: জবাবদিহিতা : ১) সংসদ সদস্য বছরে অন্তত একবার জনসাধারণের উদ্দেশ্যে অফিস কার্যক্রমের রিপোর্ট প্রকাশ করবেন। ২) সংসদ সচিবালয় তদারকি ও মূল্যায়ন করবে। ৩) আইন লঙ্ঘন করলে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রত্যাশিত সুফল : নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা। প্রতিনিধিত্বে সমতা ও স্বচ্ছতা। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণতন্ত্রে উত্তরণ। দুর্নীতি ও অনানুষ্ঠানিক প্রভাব হ্রাস। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আধুনিকায়ন।
উপসংহার : একজন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত প্রভাবশালী ব্যক্তি নন; তিনি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কও প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত বাসভবনে সাক্ষাৎ সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিপক্কতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যের বাধ্যতামূলক পাবলিক অফিস প্রতিষ্ঠা গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত, মর্যাদাপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক করবে। এই বিল বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে উত্থাপনযোগ্য একটি প্রগতিশীল ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুান্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর