চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৬ মার্চ, ২০২৬

সর্বশেষ:

একটি স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও কৌশলগত মডেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কার

একটি স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও কৌশলগত মডেল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কার

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

৬ মার্চ, ২০২৬ | ৮:৫০ অপরাহ্ণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক নেতৃত্বের পদ। জাতীয় জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়টির ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুত্ব বিবেচনায়, উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া হওয়া উচিত স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক, কৌশলগত এবং জনজবাবদিহিমূলক। একটি কাঠামোবদ্ধ উন্মুক্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে শক্তিশালী করবে।

 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদে সাধারণত দেশ-বিদেশে উন্মুক্ত আবেদন আহ্বান করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশি-কানাডিয়ান অধ্যাপক অমিত চাকমার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিকভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ অনেকাংশে রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে। তবে আশা করি, এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এখনই সময়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্তত দেশে-বিদেশে অবস্থানরত যোগ্য বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের ভিসি পদে আবেদনের সুযোগ দেওয়া উচিত।

 

কেন এটি জরুরি? ১) যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। ২) বন্ধ দরজা বা রাজনৈতিক প্রভাবের ধারণা কমাবে। ৩) প্রবাসী শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করবে। ৪) মেধাভিত্তিক নিয়োগের বার্তা দেবে।

 

প্রয়োজনীয় যোগ্যতা : ভিসি পদের জন্য সুস্পষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ জরুরি। আবেদনকারীর থাকতে হবে- বিশিষ্ট একাডেমিক সাফল্য, গবেষণায় নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা (ডিন/প্রো-ভিসি/ভিসি পর্যায়ে অগ্রাধিকার), আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতা, সুশাসন ও নৈতিকতার স্বচ্ছ রেকর্ড, স্বাধীন অনুসন্ধান ও নির্বাচন কমিটি। ভিসি নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন অনুসন্ধান ও নির্বাচন কমিটি গঠন অত্যন্ত প্রয়োজন। একটি বহুমাত্রিক ও স্বাধীন নির্বাচন কমিটিতে থাকবেন- জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট/সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট অ্যালামনাই, বাইরের স্বনামধন্য একাডেমিক ব্যক্তিত্ব, সুশাসন ও অর্থব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, সঙ্গে স্পষ্ট মূল্যায়ন মানদÐ ও স্কোরিং পদ্ধতি অনুসরণ করা আবশ্যক।

 

সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন : আবেদন যাচাইয়ের পর ৩-৫ জন প্রার্থীকে নিম্নোক্ত মানদণ্ডে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে- ১. একাডেমিক প্রভাব (প্রকাশনা, উদ্ধৃতি, গবেষণা অনুদান)। ২. নেতৃত্বের সাফল্য। ৩. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভিজ্ঞতা। ৪. নৈতিক ও প্রশাসনিক সততা। ৫. জাতীয় উচ্চশিক্ষা লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

 

উন্মুক্ত ভিশন উপস্থাপন (একাডেমিক ফোরাম) : সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত প্রার্থীদের একটি উন্মুক্ত একাডেমিক ফোরামে তাঁদের পাঁচ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে। এই উপস্থাপনা উন্মুক্ত থাকবে- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই এবং আমন্ত্রিত গণমাধ্যমের (যথাযথ নিয়ন্ত্রণসহ) সদস্যদের জন্য।

 

পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় আবশ্যিক বিষয়সমূহ : ক) শিক্ষার মানোন্নয়ন : পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন,    আউটকাম-বেইজড শিক্ষা, শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি, ডিজিটাল লার্নিং সংযোজন, শিক্ষাদানের মূল্যায়ন সংস্কার। খ) গবেষণা উন্নয়ন: গবেষণা তহবিল বৃদ্ধির কৌশল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পিএইচডি তত্ত্বাবধানের মানদণ্ড, আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা কেন্দ্র, গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণ। গ) সুশাসন সংস্কার : পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, পারফরম্যান্স ভিত্তিক জবাবদিহিতা। ঘ) আর্থিক টেকসই পরিকল্পনা : আয়ের উৎসের বৈচিত্র্য, এন্ডাওমেন্ট ফান্ড গঠন, অ্যালামনাই ফান্ডরেইজিং, শিল্পখাতের অংশীদারিত্ব, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি। ঙ) অবকাঠামো উন্নয়ন : স্মার্ট ক্যাম্পাস উদ্যোগ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, শিক্ষার্থীদের আবাসন উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস পরিকল্পনা। চ) বৈশ্বিক র‌্যাংকিং কৌশল : প্রকাশনা প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক শিক্ষক বিনিময়, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং, মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ।

 

অংশীজনদের মতামত গ্রহণ : উপস্থাপনার পর- শিক্ষক পরিষদ মতামত প্রদান করতে পারে। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি লিখিত মতামত জমা দিতে পারে। অ্যালামনাই সংগঠন পরামর্শ প্রদান করতে পারে। এই মতামত চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

 

চুড়ান্ত মূল্যায়ন কাঠামো : নির্বাচন নিম্নোক্ত ওজনের ভিত্তিতে হতে পারে- একাডেমিক উৎকর্ষ (৩০%), নেতৃত্ব ও সুশাসন (২৫%), পাঁচ বছরের পরিকল্পনার বাস্তবতা (২৫%), গবেষণা ভিশন (১০%), আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক টেকসইতা (১০%)। স্বচ্ছ স্কোরিং ব্যবস্থা নিয়োগ প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে।

 

পারফরম্যান্স চুক্তি ও বার্ষিক পর্যালোচনা : নির্বাচিত উপাচার্যের সঙ্গে পাঁচ বছরের একটি পারফরম্যান্স চুক্তি করা উচিত, যাতে থাকবে- নির্দিষ্ট কর্মসূচি ও লক্ষ্য (কচও), বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন, মধ্যমেয়াদি স্বাধীন মূল্যায়ন, জবাবদিহিতার কাঠামো।

 

উপসংহার : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেবল একজন প্রশাসক নন; তিনি হবেন একজন দূরদর্শী একাডেমিক নেতা, যার থাকবে সুস্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য কৌশলগত পরিকল্পনা। উন্মুক্ত আহ্বান, কাঠামোবদ্ধ সংক্ষিপ্ত তালিকা, জনসম্মুখে ভিশন উপস্থাপন এবং পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়ন-এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে উপাচার্য নিয়োগ আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এমন সংস্কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আগামী দশকে টেকসই একাডেমিক উৎকর্ষের পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

 

[বি.দ্র.: অতীতে দেখা গেছে, উপাচার্য নিয়োগের পর শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে ফুল দেওয়া একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। আশা করি, বর্তমান সরকারের আমলে ভিসির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবরে ফুল দেওয়ার জন্য কোনো অলিখিত নিয়ম আরোপ করা হবে না।]

 

লেখক-ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুন্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

পূর্বকোণ/সিজান

শেয়ার করুন