চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে পরিবেশ সুরক্ষায় সুস্পষ্ট রোডম্যাপ জরুরি
পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরির্বতনের অভিঘাতের দিক থেকে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ

নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে পরিবেশ সুরক্ষায় সুস্পষ্ট রোডম্যাপ জরুরি

আবসার মাহফুজ

২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১২:১২ অপরাহ্ণ

নির্বাচনের মৌসুম এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মেনিফেস্টোতে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, ডিজিটালাইজেশন- এই পরিচিত শব্দগুলো ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু যে ভিত্তির ওপর এসব উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকে, সেই প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রশ্নটি প্রায়ই থাকে উপেক্ষিত, অস্পষ্ট কিংবা আলঙ্কারিক কয়েকটি বাক্যে সীমাবদ্ধ। অথচ একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় পরিবেশ আর আলাদা কোনো ‘খাত’ নয়; এটি জীবন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় সুস্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও দায়বদ্ধ অঙ্গীকার এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের দিক থেকে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষিজমি অনুর্বর হচ্ছে, সুপেয় পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে। নদীভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। পাহাড়ে নির্বিচার কাটার ফলে ভূমিধস, বন উজাড়, আদিবাসী জীবনের বিপন্নতা, সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন প্রতিনিয়ত প্রতিশোধ নিচ্ছে মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের। শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে ঢাকাকে প্রায়ই বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে দেখা যায়। নদী-খাল ভরাট, শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্যে জলাশয় বিষাক্ত হওয়া, প্লাস্টিক দূষণ, শব্দদূষণ- এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার লক্ষণ।

 

এই ব্যর্থতার বড় অংশই রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সংকট থেকে জন্ম নেয়। নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলো ভোটারকে কী দেখাতে চায়, কোন প্রতিশ্রুতি দিলে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা বাড়বে, এই হিসাবেই মেনিফেস্টো রচিত হয়। পরিবেশ সুরক্ষা যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি ফল দেয়, যেহেতু এতে কিছুক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি লাভের বদলে নিয়ন্ত্রণ, বিধিনিষেধ ও শৃঙ্খলার কথা আসে, তাই এটি সহজে রাজনৈতিক স্লোগানে রূপ নেয় না। ফলে মেনিফেস্টোতে পরিবেশ নিয়ে থাকে সাধারণ প্রতিশ্রুতি ‘সবুজায়ন বাড়ানো হবে’, ‘নদী রক্ষা করা হবে’, ‘দূষণ কমানো হবে’; কিন্তু কীভাবে, কোন সময়সীমায়, কোন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয়, কোন বাজেট ও কোন জবাবদিহির মাধ্যমে, এসব প্রশ্নের উত্তর থাকে অনুপস্থিত।

 

আজকের পৃথিবীতে পরিবেশগত অস্পষ্টতা মানেই ভবিষ্যতের বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানো। জলবায়ু পরিবর্তন কেবল তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাড়লে মানুষ শহরমুখী হবে, শহরের ওপর চাপ বাড়বে, বস্তি বিস্তার ঘটবে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। কৃষিতে অনিশ্চয়তা বাড়লে খাদ্যের দাম বাড়বে, দরিদ্রমানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসবই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে। কাজেই পরিবেশ সুরক্ষা কোনো ‘সবুজ রোমান্টিসিজম’ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ও কঠিন প্রশ্ন।

 

আর এখানেই নির্বাচনী মেনিফেস্টোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মেনিফেস্টো কেবল নির্বাচনী দলিল নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দলের দর্শন, অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার লিখিত প্রতিশ্রুতি। যদি সেখানে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে, কাঠামোবদ্ধভাবে ও পরিমাপযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হয়, তবে তা শুধু ভোটারকে বার্তা দেয় না, বরং নির্বাচনের পর সরকার গঠিত হলে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও আদালতের কাছে জবাবদিহির একটি ভিত্তিও তৈরি করে। অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে জবাবদিহি কঠিন; সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে তা সহজ।

 

প্রশ্ন হলো, সুস্পষ্ট অঙ্গীকার বলতে আমরা কী বুঝি? প্রথমত, লক্ষ্য নির্ধারণ। উদাহরণস্বরূপ, বায়ুদূষণ কমানো বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? পাঁচ বছরে পিএম২.৫-এর গড় মাত্রা কত শতাংশ কমানো হবে? কোন শহরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে? দ্বিতীয়ত, নীতিগত ও আইনি কাঠামো। বিদ্যমান পরিবেশ আইন ও বিধিমালা কতটা কার্যকর, কোথায় সংশোধন প্রয়োজন, কোথায় কঠোর প্রয়োগ দরকার- এ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান থাকা জরুরি। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জনবল, প্রযুক্তি ও স্বাধীনতা কীভাবে বাড়ানো হবে? চতুর্থত, বাজেট ও অর্থায়ন। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ, জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন তহবিল ব্যবহারের স্বচ্ছতা, এসব ছাড়া প্রতিশ্রুতি অর্থহীন। পঞ্চমত, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি। স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ, বিজ্ঞানী ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় কীভাবে যুক্ত করা হবে?

 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট খাত আছে, যেগুলো মেনিফেস্টোতে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নদী ও জলাশয় রক্ষা তার একটি। নদী কেবল পানিপ্রবাহের পথ নয়; এটি জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, কৃষি ও সংস্কৃতির ধারক। কিন্তু অবৈধ দখল, দূষণ ও নাব্য সংকটে নদীগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি মেনিফেস্টোতে নদী দখলমুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়সীমা, শক্তিশালী কমিশন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আনার প্রতিশ্রুতি না দেয়, তবে ‘নদী বাঁচাও’ স্লোগান কাগজেই থেকে যাবে।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো বন ও জীববৈচিত্র্য। সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি প্রাকৃতিক ঢাল, কার্বন সিংক এবং লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। পাহাড়ি বনাঞ্চলেও একইভাবে পরিবেশ ও মানবজীবন জড়িয়ে আছে। কিন্তু উন্নয়নের নামে বন উজাড়, অবৈধ দখল, বন্যপ্রাণী পাচার চলছেই। মেনিফেস্টোতে যদি বন সংরক্ষণকে উন্নয়নের বিরোধী হিসেবে না দেখে, বরং টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখার স্পষ্ট দর্শন না থাকে, তবে সংকট কাটবে না।

 

শহর ও নগরায়ণের প্রশ্নটিও পরিবেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সবুজ খোলা জায়গার অভাব, খাল-জলাধার ভরাট- এসব শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই মেগাপ্রকল্পের কথা বলে, কিন্তু নগরপরিবেশের মৌলিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষিত থাকে। মেনিফেস্টোতে যদি শহুরে সবুজায়ন, গণপরিবহনভিত্তিক পরিকল্পনা, বর্জ্যব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত রূপরেখা না থাকে, তবে উন্নয়নপ্রকল্প শেষ হলেও নাগরিক দুর্ভোগ কমবে না।

 

জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা রাখলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিপূরণ, অভিযোজন অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবিতে দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর মেনিফেস্টোতে এই বৈশ্বিক লড়াইয়ের কৌশল স্পষ্ট না হলে সরকার পরিবর্তন হলেও নীতির ধারাবাহিকতা থাকে না।

 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিবেশকে অনেক সময় ‘উন্নয়নের বাধা’ হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি উল্টো। পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন হয়, তা দীর্ঘস্থায়ী নয়। নদী ভরাট করে, পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে যে অবকাঠামো গড়ে ওঠে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় খরচ ও ক্ষতির জন্ম দেয়। কাজেই পরিবেশবান্ধব নীতি মানেই অর্থনৈতিক আত্মঘাতিতা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিনিয়োগ।

 

ভোটারদের ভূমিকাও এখানে কম নয়। রাজনৈতিক দলগুলো মেনিফেস্টোতে যা রাখে, তার পেছনে ভোটারদের প্রত্যাশা বড় ভূমিকা রাখে। যদি ভোটাররা পরিবেশ প্রশ্নে সচেতন হয়, যদি গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ মেনিফেস্টো বিশ্লেষণ করে পরিবেশগত অঙ্গীকারের ঘাটতি তুলে ধরে, তবে দলগুলো বাধ্য হবে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে। অর্থাৎ এটি একমুখী দাবি নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক চর্চা।

 

গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনের সময় মেনিফেস্টো নিয়ে আলোচনা হয় ঠিকই, কিন্তু তা প্রায়ই রাজনৈতিক স্লোগান, ক্ষমতার হিসাব বা অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে। পরিবেশ ও জলবায়ু প্রশ্নে গভীর বিশ্লেষণ, তুলনামূলক মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই খুব কম দেখা যায়। এই ঘাটতি পূরণ না হলে পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্ন রাজনৈতিক এজেন্ডায় প্রান্তিকই থেকে যাবে।

 

প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নটি আদতে নৈতিক প্রশ্নও বটে। আমরা কী ধরনের দেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চাই? দূষিত বাতাস, বিষাক্ত পানি, উজাড় বন আর অনিশ্চিত খাদ্যব্যবস্থা, নাকি এমন একটি দেশ, যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতি সহাবস্থান করে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ব্যক্তিগত আচরণে নয়, রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রতিফলিত হতে হবে। আর সেই নীতির প্রথম লিখিত রূপ হলো নির্বাচনী মেনিফেস্টো।

 

তাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমরা বলতে চাই, পরিবেশকে আর প্রান্তিক ইস্যু হিসেবে দেখবেন না। প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষাকে রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে আনুন। মেনিফেস্টোতে দিন সুস্পষ্ট লক্ষ্য, স্পষ্ট সময়সীমা, শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি। মনে রাখতে হবে, পরিবেশ রক্ষা মানেই কেবল গাছ বাঁচানো নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন। এই সত্য যত দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পাবে, তত দ্রুত আমরা একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশের পথে এগোতে পারব।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট