
গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডার (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, ‘এর মধ্যেই বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়- বিক্রির ক্ষেত্রে কমিশন বৃদ্ধি, বিইআরসির একতরফা দাম ঘোষণা বন্ধ করাসহ ছয়দফা দাবিতে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট।’ একদিকে গ্যাস সংকট, অন্যদিকে ধর্মঘট- ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অবশ্য জ্বালানিখাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিইআরসি’র সাথে রিটেইলারসহ সবপক্ষের বৈঠকের পর ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ৪ জানুয়ারি ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের কেজিতে চার টাকা ৪২ পয়সা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। কিন্তু বাজারে আড়াই হাজার, তিন হাজার টাকা দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। পরিচিত একজন সিলিন্ডার ব্যবহারকারী বলেন, ‘গত সপ্তাহে গ্যাস কিনেছি আড়াই হাজার টাকায়, এখন তো টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না। এদিকে কোথাও সিলিন্ডার নাই।’ আমরা লক্ষ্য করেছি যে, এলপিজি সংকটে গ্রাহক ভোগান্তি গত ৮ জানুয়ারি হতে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে চরমে পৌঁছায়। গ্যাসসিলিন্ডার সংকটে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক বাসায় রান্না বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সিলিন্ডার গ্যাস না পেয়ে বৈদ্যুতিক চুলা অথবা কাঠের চুলায় রান্নার কাজ সারতে দেখা গেছে অনেক পরিবারকে। এই সুযোগে বৈদ্যুতিক চুলার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট প্রভাব ফেলেছে অলিগলির রেস্তোরা কিংবা চায়ের দোকানেও। গ্যাস না থাকায় গত ৯ জানুয়ারি হতে অনেক রেস্তোরা বন্ধ হয়েছে। মূলত উৎপাদনকারি কোম্পানি থেকে সাপ্লাই না থাকায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসসিলিন্ডার সংকটের কারণে দোকান বন্ধ রেখেছেন খুচরা ব্যবসায়ীরাও। তাঁরা বলছেন, ধর্মঘটের কারণে বড় ব্যবসায়ী কিংবা ডিলারদের কাছ থেকে কোনো সরবরাহ পাচ্ছেন না তাঁরা। এদিকে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘ব্যক্তিখাতের কারসাজির কারণেই বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।’
এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার সংকটের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ১৮টি কোম্পানি এলপি গ্যাস বাজারজাত করছে। কিন্তু লাইসেন্স নিয়েছে ৫৮টি প্রতিষ্ঠান। বাকিরা বাজারে নাই। সিলিন্ডার গ্যাসেরও অনেক কোম্পানি আছে, যার মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো বসুন্ধরা এলপিজি, ওমেরা এলপিজি, যমুনা গ্যাস, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, বিএম এনার্জি, লাউফস গ্যাস, টোটালগ্যাস, নাভানা এলপিজি, এলপি গ্যাস লিমিটেড, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, ইন্ডেক্স এলপি গ্যাস লিমিটেড প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কোম্পানি। কোম্পানিগুলো বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারে (যেমন: ৫ কেজি, ১২ কেজি, ৪৫ কেজি) গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। এলপিজি পানির চেয়ে হালকা হওয়ায় ১ কেজি এলপিজি বেশি আয়তন দখল করে, যা প্রায় ১.৮ থেকে ২.০ লিটার। এই সমস্ত কোম্পানি সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধি করে সংকট তৈরি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের এলপি গ্যাসের বাজার এখন ৩২ হাজার কোটি টাকার। প্রতিনিয়ত পণ্যটির বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে অসম একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাজারে একধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের সংকট কমাতে সরকার কী পরিকল্পনা নিয়েছে, তা আমরা জানিনা।
এলপি গ্যাস নিয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯১০ সালে আমেরিকাতে এলপি গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং ১৯১২ সাল থেকে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়, যা মূলত রান্না ও গরম করার কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। পরবর্তীতে এটি যানবাহন ও শিল্পে ব্যবহৃত হতে থাকে, বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশকে এর গার্হস্থ্য ব্যবহার জনপ্রিয়তা পায়। বিশ্বব্যাপী এই গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। গ্যাস উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে, অ্যাঙ্গোলা, আজারবাইজান, ইরাক, মালয়েশিয়া, মোজাম্বিক, নরওয়ে, পেরু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ জোটের সদস্যভুক্ত দেশগুলো বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ৭১ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে। অপর দিকে বিশ্বে গ্যাস রপ্তানির মোট ৮০ শতাংশই জোগান দেয় ১০টি দেশ। ১০ গ্যাস রপ্তানিকারক দেশের শীর্ষ রয়েছে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই-দেশ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশে এলপিজি নীতিমালা হয় ২০১৬-১৭ সালে। ২০১৬ সালে খসড়া নীতিমালা হয়েছিল। ২০১৭ সালে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু নীতিমালায় কিছু বিষয় কেউ মানতে চাচ্ছে না। তা হলো, নীতিমালায় আছে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টন এলপিজির ইনস্টলেশন করতে হবে। এ পরিমাণ মজুদ না থাকলে সারা দেশে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এলপিজি ধান বা চালের মতো পণ্য না। এখানে সব জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি এলপিজি সরবরাহ করতে হয়, সব জায়গায় একটা ফ্যাসিলিটি তৈরি করতে হবে। যদি কোনো উদ্যোক্তা এটা না করেন তাহলে এখানে কাজ করা সম্ভব হবে না। এলপিজির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্টোরেজ ও ইমপোর্ট। আমাদের নিজস্ব কোনো এলপিজি নেই। রিফাইনারি থেকে মাত্র ১৫ হাজার টন আসে। বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন এলপি গ্যাস কোম্পানি বিতরণ করে, যা শতকরা ২ ভাগের বেশি না। এজন্য আমরা মনে করি, এ ধরনের ইনস্টলেশন করতে হলে সব জায়গায় স্যাটেলাইট করতে হবে। বার্জে করে নিয়ে যেতে হবে। গ্যাসের মতো অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। যেখানে গ্যাসের সিলিন্ডার নেয়া যাবে না, সেখানে লাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাইপের মাধ্যমে যে সংযোগ দেয়া হয়- এটাকে বলা হয় ‘রেটিকুলেটেড সিস্টেম’। এখন এ ব্যবস্থায় বেশির ভাগ অ্যাপার্টমেন্টে সংযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু একক বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটা হচ্ছে ইমপোর্ট। এরপর স্টোরেজ, এটা খুব ব্যয়বহুল। এরপর বিতরণের জন্য এলপিজি সিলিন্ডার লাগবে। এখানে বিশাল একটা খরচের ব্যাপার আছে। এরপর বিতরণের জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। বিতরণের পর আবার স্টোরেজ করতে হবে। আবার রেটিকুলেটেড সিস্টেম করতে হবে। এটা অনেকটাই গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মতো কাজ। স্বল্পমূলধনে এটা করা সম্ভব না। এদিকে, এলপি গ্যাস নিয়ে চলমান সংকট নিরসনে সরকার, আমদানিকারক এবং ব্যবসায়ীসহ সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, ‘সরকারের কাছে আমদানির উর্ধ্বসীমা শিথিল করার জন্যও বলা হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত যেন আমদানি করা যায় সে বিষয়ে মালিকপক্ষের কাছে আহ্বান জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।’
আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, বাংলাদেশে অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিজেদের স্বার্থ দেখেন। অর্থাৎ শুধুমাত্র মুনাফার চিন্তায় তাঁরা মশগুল থাকেন। ভোক্তাদের অসুবিধার কথা খুবই কম চিন্তা করা হয়। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা যখন মন্ত্রী-এমপি হয়, তখন ব্যবসার স্বার্থ দেখেই আইন প্রনয়ণ করা হয়। দেশ ও জনগণের স্বার্থ সেখানে জলাঞ্জলি দেয়া হয়। দুর্নীতি আমাদের নীতি নির্ধারকদের রক্তে মিশে গিয়েছিলো। মডেল মসজিদ নির্মাণের সময়ও শত কোটি টাকা টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ছিলো। গৃহহীন মানুষকে ঘর নির্মাণ (অনুদান) করে দেয়ার সময়ও ঘুষ নেয়া হতো। প্রত্যেক সরকারি প্রকল্প হতে দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হতো। এমন কোন প্রতিষ্ঠান নাই, যেখানে দুর্নীতি হতো না। আজকের এলপিজি সংকটের পেছনে দুর্নীতিকেই অনেকে দায়ি করেছেন। এলপিজি নীতিমালাতেই গন্ডগোল বলে মনে করেন অনেকেই। সাথে যুক্ত হয়েছে- অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফার লোভ। গ্যাসসিলিন্ডার মজুত রেখে ‘সংকট’ দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া, গ্যাসসিলিন্ডারে ওজনে কম দেয়ার অভিযোগ সবসময় পাওয়া যায়। আমরা মনেকরি, এলপিজি গ্যাস আমদানি, বিপনন, উৎপাদন, ডিলার কমিশন ইত্যাদির জন্য সময়োপযোগি ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। অসাধু ব্যবসায়ীরা যেনো গ্যাস মজুত করে ভোক্তাদের কষ্ট দিতে না পারেন, যেনো ওজনে কম দিতে না পারেন- সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদেরকে আমদানিপর্যায়ে মূল্যসাশ্রয়ের জন্য বিকল্প দেশ খুঁজে বের করতে হবে। গ্যাসব্যবসায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আগামীর নির্বাচিত সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, ভোক্তাদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে দ্রুত গ্যাস সংকট নিরসনের ব্যবস্থা নেবেন।
পূর্বকোণ /ইবনুর