চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

ক্রীড়াঙ্গনকে সংঘাত-বিভাজনের ক্ষেত্র নয়, সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত

ক্রীড়াঙ্গনকে সংঘাত-বিভাজনের ক্ষেত্র নয়, সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত

আবসার মাহফুজ

১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৫:৪৪ অপরাহ্ণ

ক্রিকেট দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল একটি খেলা নয়, এটি এই জনপদের মানুষের আবেগ, পরিচয় ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। উপমহাদেশের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে- যখন ক‚টনীতি ব্যর্থ হয়েছে, তখন ক্রিকেট দুই দেশের জনগণের মধ্যে সংলাপের দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই ক্রিকেটই আজ আবার এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে, যেখানে খেলার নীতি, ন্যায্যতা ও নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির চাপে। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল একটি ক্রীড়াবিতর্ক নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক শান্তি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি রাজনৈতিক-সামাজিক সংকেত।

 

ভারতে সা¤প্রতিক বছরগুলোতে উগ্রবাদী রাজনীতির বিস্তার নতুন কিছু নয়, তবে খেলাধুলার মতো তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ক্ষেত্রেও এর নগ্ন-উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক (ঋৎধহপযরংব) আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি লিগে একজন বিদেশি ক্রিকেটারকে নেওয়া বা না নেওয়া সাধারণত পারফরম্যান্স, কৌশল ও আর্থিক বিবেচনার বিষয়। সেখানে ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের যুক্তি টেনে এনে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া মানে খেলাটিকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো। মোস্তাফিজের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিলামে রেকর্ডমূল্যে দল পাওয়া একজন প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারকে ‘নিরাপত্তা’ কিংবা ‘জনগণের আবেগ’-এর অজুহাতে বাদ দেওয়ার ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, এখানে ক্রিকেটীয় যুক্তির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে উগ্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চাপ।

 

এই উগ্রবাদী প্রবণতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের দাবি করে। ‘শত কোটি মানুষের আবেগ’ বা ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় অনুভূতি’- এই ধরনের বক্তব্য আসলে সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে এবং ভিন্নমত বা ভিন্নপরিচয়ের মানুষকে সহজেই শত্রæতে পরিণত করে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে এমন ভাষা ব্যবহার করা হলে তা শুধু একজন খেলোয়াড় বা একটি দলকে নয়, পুরো অঞ্চলের ক্রীড়াপরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। কারণ ক্রিকেটের মতো আন্তর্জাতিক খেলায় অংশগ্রহণ মানেই পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা। যখন কোনো দেশের খেলোয়াড়কে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনিরাপদ বা অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়, তখন সেই নিশ্চয়তা ভেঙে পড়ে।

 

এর প্রভাব সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে এসে পড়ে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুস্তরপূর্ণ- সহযোগিতা, বিরোধ, পারস্পরিক নির্ভরতা সবই সেখানে বিদ্যমান। খেলাধুলা এই সম্পর্ককে অনেক সময় ইতিবাচক দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু সা¤প্রতিক ঘটনাবলি দেখাচ্ছে, উগ্রবাদী শক্তিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ইতিবাচক জায়গাগুলো সংকুচিত করতে চাইছে। ক্রিকেটকে লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টি করা আসলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ানোর একটি কৌশল। এর ফলে ভবিষ্যতে শুধু ক্রিকেট নয়, অন্যান্য ক্রীড়া-আয়োজন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এমনকি অর্থনৈতিক সহযোগিতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

 

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভারতে বিশ্বকাপে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিক্রিয়ামূলক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। এটি দেখায় যে, ক্রীড়াঙ্গনে নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয় বাংলাদেশ। তবে একইসঙ্গে এটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তোলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি যদি এই ধরনের পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ ও দৃঢ় ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও দেশ নিরাপত্তা ও বৈষম্যের অজুহাতে বড় টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়াতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

ক্রিকেটে উগ্রবাদী হস্তক্ষেপের নেতিবাচক প্রভাব বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি খেলোয়াড়দের মানসিক নিরাপত্তা নষ্ট করে। একজন পেশাদার ক্রিকেটার মাঠে নামার আগে যদি নিজের পরিচয়, জাতীয়তা বা ধর্ম নিয়ে চিন্তিত থাকতে বাধ্য হন, তাহলে তার পারফরম্যান্স ও ক্যারিয়ার দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয়ত, এটি ফ্র্যাঞ্চাইজি ও বোর্ডগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে ক্রীড়াপ্রশাসন তার নৈতিক ভিত্তি হারায়। তৃতীয়ত, দর্শকদের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি হয়। ক্রিকেট তখন আর সবার খেলা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি পক্ষের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় এই বিভাজন আরও বিপজ্জনক, কারণ অঞ্চলটি আগে থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্তবিরোধ ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতায় পরিপূর্ণ। এখানে খেলাধুলা যদি ঐক্যের বদলে বিভেদের হাতিয়ার হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে তরুণপ্রজন্ম, যারা খেলাধুলার মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের শিক্ষা পেতে পারত, তারা উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ানে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

 

প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কয়েকটি স্তরে ভাবতে হবে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ভূমিকা। আইসিসিকে অবশ্যই স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, যাতে কোনো খেলোয়াড় বা দল রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত কারণে বৈষম্যের শিকার না হয়। নিরাপত্তার যুক্তি যদি তোলা হয়, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ, প্রমাণভিত্তিক ও সবার জন্য সমান। দ্বিতীয়ত, জাতীয় বোর্ডগুলোর দায়িত্ব। বিসিসিআইসহ সব বোর্ডকে বুঝতে হবে- স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপ মেনে নিলে দীর্ঘমেয়াদে তাদেরই বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্রীড়াপ্রশাসনকে রাজনীতি থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে হবে। তৃতীয়ত, খেলোয়াড় ও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সম্মিলিত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটারদের সংগঠনগুলোকে এই ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। একা কোনো দেশের বোর্ড প্রতিবাদ করলে তা দুর্বল হতে পারে, কিন্তু সম্মিলিত কণ্ঠ আন্তর্জাতিক মহলে প্রভাব ফেলতে পারে। চতুর্থত, গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা উগ্রবাদী বয়ানকে প্রশ্ন করবে, তথ্যভিত্তিক আলোচনা তৈরি করবে এবং খেলাধুলাকে ঘৃণার রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখাবে। উসকানিমূলক শিরোনাম ও একপাক্ষিক বিশ্লেষণ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে- এটি এড়িয়ে চলা জরুরি।

 

সবশেষে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ক্রীড়াভিত্তিক ক‚টনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। দ্বিপাক্ষিক বা আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট, খেলোয়াড় বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ প্রশিক্ষণ- এসব উদ্যোগ পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে পারে। সরকারগুলোর উচিত ক্রীড়াঙ্গনকে সংঘাতের ক্ষেত্র নয়, বরং সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা। এতে উগ্রবাদী শক্তির প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে সৃষ্ট এই সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে- যদি এখনই সতর্ক না হওয়া যায়, তবে ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলাও রাজনৈতিক উগ্রতার বলি হতে পারে। পরাজয় তখন শুধু একটি দলের বা একটি দেশের হবে না; পরাজয় হবে ন্যায্যতা, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের। এই পরাজয় ঠেকাতে প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, নীতিগত দৃঢ়তা এবং সর্বোপরি খেলাকে খেলা হিসেবে দেখার ও রাখার সম্মিলিত অঙ্গীকার।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট