চট্টগ্রাম রবিবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৪

একুশের ভাবনা : বাংলা ভাষার সার্টিফিকেশন পরীক্ষা

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১১:০০ অপরাহ্ণ

পৃথিবীতে বাংলাদেশীরাই একমাত্র জাতি, যে মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, অসহযোগ আন্দোলন করেছেন এবং যার ফলশ্রুতিতে আজ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বরকত, রফিক, সালাম, জাব্বার ও আরো অনেক নাম না জানা শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাভাষা তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা ও আন্দামান দ্বীপে বাংলা ভাষার প্রচলন রয়েছে। তবে অনেকেই শুনলে অবাক হবেন যে পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ সিয়েরা লিওন, যা আট্লান্টিক সাগরের পাড়ে অবস্থিত, সেই দেশেও বাংলা ভাষায় অনেক স্থানীয় লোকজন কথা বলে থাকেন।
এই দেশটি ১৯৯১ সাল থেকে সিভিল ওয়ার-এ লিপ্ত ছিল। ইউএন সিয়েরা লিয়নে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ইউএন পিচ কিপিং ফোর্সকে সেখানে মোতায়ন করে। সৌভাগ্যবশত পিচ কিপিং-এর বিশাল অংশ ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহীনির সদস্য। এদের কঠিন পরিশ্রমের ফলে সিয়েরা লিওন-এর ৮ মিলিয়ন লোকের জীবনে শান্তি ফিরে আসে। বাংলাদেশী বাহিনী সিয়েরা লিওন-এর জনগণের জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলেন এবং স্থানীয় লোকজন বাংলাভাষা শিখে বাংলাদেশী পিচ কিপিং ফোর্স-এর সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। বাংলাদেশীদের সহায়তায় আস্তে আস্তে দেশটিতে শান্তি ফিরে আসে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০২ সালে সিয়েরা লিওন-এর প্রেসিডেন্ট জনাব আহমদ তিজান কাবাহ্ বাংলা ভাষাকেও তার দেশের একটি অফিসিয়াল ভাষা হিসাবে অনর্ভুক্ত করার কথা বলেছিলেন বলে কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু অফিসিয়ালী এই ঘোষণাটির সত্যতা জানা যায় নাই। তবে ইউটিউব ভিডিওতে সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষায় কথা বলতে অনেক সিয়েরা লিওনবাসীকে দেখা যায়।
যেই ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে এবং চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে, শহীদ হয়েছিলেন বরকত, রফিক, সালাম, জব্বর সহ আরো অনেকে এবং সকল বাংলাদেশীদের সার্বিক আন্দোলনে আমরা বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে পেরেছি সেটাই ছিল আমাদের বিশাল অর্জন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালে আর একজন বাংলাদেশী-কানাডিয়ান রফিকুল ইসলাম ইউএন-এর তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনানকে মাতৃভাষার গুরুত্ব বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইউএন ১৯৯৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দেন। কানাডার টরোন্টো শহর এবং উইনিপেগ শহরে রয়েছে স্থায়ী শহীদ মিনার। যেখানে কানাডিয়ান বাংলাদেশীরা ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ফুল নিয়ে শহীদ দিবস পালন করে থাকেন।
পৃথিবীতে ২০০ মিলিয়নের বেশী লোক বাংলা ভাষায় কথ বলে থাকেন। ভাষা হিসাবে বাংলার স্থান পৃথিবীতে ৫ম। আমরা জানি যে ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে বেশী মানুষ কথা বলেন। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড সহ অনেক দেশে পড়ালেখা, চাকুরী এবং ইমিগ্রেশনের জন্য আইইএলটিএস (ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম) অথবা টোফেল (টেস্ট অফ ইংলিশ এজ এ ফরেন ল্যাংগুয়েজ) পরীক্ষা দিয়ে ভাষার সার্টিফিকেশন নিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৪ সালে প্রথম টোফেল পরীক্ষা চালু করে। বৃটিশ কাউন্সিল ১৯৮০ সালে আইইএলটিএস সিস্টেম তৈরী করে এবং ১৯৮৯ থেকে পরীক্ষা শুরু হয়।
পৃথিবীর অনেক দেশেই যেমন জাপান, চীন, জার্মানি, কোরিয়াতে পড়ালেখা অথবা চাকুরী করতে গেলে ভাষাশিক্ষার সার্টিফিকেশন নেওয়া বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে ইদানীং অনেক ভারতীয়, শ্রীলংকান, পাকিস্তানী, চাইনিজ, কোরিয়ান রাশিয়ান লোকজন কাজ অথবা ব্যবসার সুবাধে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। বিশেষ করে আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোতে ভারতীয়, নেপালি, শ্রীলংকান ও পাকিস্তানী ছাত্র/ছাত্রী প্রতিবছর নিয়মিতভাবে ভর্তি হচ্ছেন। এই ক্ষেত্রে আমি মনে করি আমদের দেশে বাংলা ল্যাংগুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম (বিএলটিএস) চালু করা দরকার। বিএলটিস চালু হলে বিদেশীদের অবৈধভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হতে পারে। কারণ আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় অবৈধভাবে কাজ করছে বলে কথিত আছে। বিএলটিএস সার্টিফিকেশনের জন্য একটি আলাদা অটোনোমাস সংস্থা তৈরী করা যেতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে একটি জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, যাতে করে বিএলটিএস-এর মাধ্যমে বিদেশী চাকুরী প্রার্থী অথবা ছাত্র/ছাত্রীরা কোন ধরনের হয়রানির শিকার না হয় এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অথবা টাকার বিনিময়ে যাতে বিএলটিএস সার্টিফিকেশন দেওয়া না হয়।
বিএলটিএস চালু হলে বাংলাদেশীদের জন্য একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হবে। এক্ষেত্রে যেই বিদেশী ছাত্র/ছাত্রী বাংলাদেশে পড়ালেখা করতে আসবে তাদের জন্য বেসিক বাংলা ভাষার ৩-৬ মাসের বাংলাভাষা কোর্স বাধ্যতামূলক করা জরুরি বলে আমি মনে করি। আমরা যদি বিএলটিএস-এর জন্য মানসম্মত একটি প্রোগাম তৈরী করে একটা ইনিস্টিটিউট দাঁড় করাতে পারি তাহলে আমাদের একুশের আত্মত্যাগ ও বাংলা ভাষার গৌরব রক্ষা করা যথাযথ হবে বলে আমার ধারনা।

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুন্সউইক।
এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট