চট্টগ্রাম সোমবার, ২২ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

‘জাতীয় শিশু-অধিকার সুরক্ষা কমিশন’ গঠন সময়ের দাবি

জিয়া হাবীব আহসান

২১ আগস্ট, ২০২৩ | ৯:৫৫ অপরাহ্ণ

জাতিসংঘ শিশু-সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষা তথা জুবিন্যাল জাস্টিস বাস্তবায়নে ‘জাতীয় শিশু-অধিকার সুরক্ষা কমিশন’ গঠন জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার নিশ্চিত করতে যেমন হিউম্যান রাইটস কমিশন আছে তেমনি শিশুর সুরক্ষা ও শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে চাইল্ডস রাইটস কমিশন হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বহু দেশে ‘শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন’ থাকলেও বাংলাদেশে নেই। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর যৌননির্যাতন, অপহরণ, খুন, গুমসহ বিভিন্নরকম নিপীড়নের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বাজেট প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ লক্ষ শিশু এখনো শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এদের মধ্যে কেউ একেবারেই স্কুলে যায় না। আবার কেউ ভর্তি হলেও পরে ঝরে পড়ছে  বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার আগে থেকে কমলেও তা এখনো অন্যান্য দেশে তুলনায় বেশি।

শিশু অপহরণ, ধর্ষণ, খুন ও গুমের ঘটনায় বছরের পর বছর ডাক্তারী পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া যায় না, বিলম্বে চার্জশিট প্রদান ও ট্রায়ালের কারণে সাক্ষী ও আলামত নষ্ট হয় এবং আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ফলে শিশুনির্যাতনের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৩ সালের শিশু আইন, বাস্তবায়নেও নানা সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আইনও শিশুদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রদানেও আশানুরূপ কার্যকর প্রতিয়মান হচ্ছে না। শিশুসংক্রান্ত বিষয়টি শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে, শিশুদের জন্য আলাদা কোন অধিদপ্তর নেই।

বাজেটে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়, তা জিডিপির শতাংশের সবচেয়ে কম বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়। সরকার জাতীয় শিশু অধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় শিশু অধিকার কমিশন আইন ২০১৮ প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও অজ্ঞাত কারণে তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। পিতা-মাতা-অভিভাবকহীন অসুস্থ অবহেলিত সুবিধাবঞ্চিত ভাসমান পথশিশুদের সুরক্ষা দিতে এবং শিশু অধিকার বাস্তবায়নে সঠিক ভূমিকা পালনের জন্য সারা দেশে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। বর্তমানে টাস্কফোর্স বা নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও দেশের সিংহভাগ শিশুদের কল্যাণে তা তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

‘জাতীয় শিশু সুরক্ষা কমিটি’ গঠিত হলে এসব বিষয় তদারকীতে সুবিধা হবে। শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় তথা শিশুদের উপর অত্যাচার, অন্যায় বন্ধ এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং পীড়িত শিশুদের বিশেষ যত্ন এবং সুরক্ষা সম্পর্কিত সমস্যাগুলো প্রস্তাবিত কমিশন বিবেচনায় এনে তার উপযুক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থাও করবেন, শিশু অধিকার সংগঠিত হলে কমিশন তা তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় সুরক্ষার পদক্ষেপ নিবেন, এ কমিশন হবে স্বাধীন এবং শিশু অধিকার বাস্তবায়নে প্রশাসন, সরকার তাদের কাজে অনুচিত হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বলৎকার, যৌনহেনস্তা, বুলিং, অবৈধ শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং অল্পবয়সে গর্ভধারণসহ শিশুদের জন্য নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন বিষয়গুলোও তারা দেখভাল করবে। লক্ষ লক্ষ শিশুর মাথায় ছাদ নেই, রাস্তায় বসবাস করে ও শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত শিশুদের বিরাট অংশ বৈষম্যের শিকার ও বিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হয়। এদেশে ১০২টি শিশু-আদালত থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার মামলা বিচারাধীন ও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থা আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি, পুলিশ শিশুদের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে তাদের শিশু আইনের প্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। এই সববিষয়ে সরাসরি তদারকির জন্য পযরষফ ৎরমযঃং পড়সসরংংরড়হ বা ‘শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে সুচিন্তিত পদক্ষেপ সময়ের দাবি।

লেখক: জিয়া হাবীব আহসান, সিনিয়র আইনজীবী, কলামিস্ট, উন্নয়ন ও সুশাসনকর্মী।

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট