চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই, ২০২২

সর্বশেষ:

১৭ জুন, ২০২২ | ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

মনিরুল ইসলাম রফিক

ইসলামের মহান প্রচারক হযরত শাহ জালাল (রহ.)

হযরত শাহ জালাল (র.) গোটা উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে এক সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাধকপুরুষ। তিনি ছিলেন হেদায়েতের আকাশে দীপ্তিমান সূর্য, অধর্মাচারণ ও বেদআতের অন্ধকারকে বিদুরণকারী। যে সকল মহাপুরুষের পদার্পণের ফলে পূর্ববাংলা বর্তমানে বাংলাদেশ হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছিল হযরত শাহ জালাল ইয়ামানী (র.) তাদের মধ্যে একজন। তিনি আরবদেশের ইয়ামান শহরে জন্মগ্রহণ করেন বলে তাকে ইয়ামানী বলা হয়। তিনি জীবনে কখনও বিয়ে করেননি। এই কারণে তার আর এক উপাধি ছিল মুজাররাদ। তার পিতার নাম কেউ বলেন মোহাম্মদ, আবার কেউ বলেন শেখ মোহাম্মদ এবং পিতামহের নাম ছিল শেখ মোহাম্মদ ইবরাহীম। তার পিতা ছিলেন কোরাইশ বংশীয় এবং মাতা ছিলন সাইয়্যেদ খানদানের। হযরত শাহ জালাল মাতৃগর্ভে থাকতেই তার পিতা শেখ মোহাম্মদ সাহেব অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে শহীদ হন। তিনি হিজরী ৬৭১ সালে ইয়ামানে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ৭০৩ সালে সিলেটে আগমন করেন। তার বয়স তিনমাস পূূর্ণ না হতেই তার মাতাও ইন্তেকাল করেন, ফলে তিনি এতিম হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় তার খালু সাইয়্যেদ আহমদ কবীর (র.) তাকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে যান এবং গরুর দুধ খাওয়ায়ে প্রতিপালন করেন। বয়:প্রাপ্ত হয়ে তিনি খালুর কাছেই দ্বীনী ইলম শিক্ষা করতে থাকেন। সাইয়্যেদ আহমদ কবির (র.) যাহেরী ও বাতেনী ইলমপূর্ণ জ্ঞানী, শ্রেষ্ঠ আলিম ও কামিল ওলি ছিলেন। শাহ জালাল (র.) কে তিনি নিতান্ত আগ্রহ ও মনোযোগ সহকারে শিক্ষা ও দীক্ষা প্রদান করতে থাকেন। ফলে তিনি যাহেরী ইলম ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে অতুলনীয় হয়ে উঠেন। তার কঠোর পরিশ্রম ও রিয়াযতের তুলনা বিরল। আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য তিনি সংসার ত্যাগ করে নির্জন বসতি অবলম্বন করেন। কোন কোন সময় দীর্ঘদিনের জন্য তিনি গহীনজঙ্গলে গিয়ে ইবাদাতে মশগুল থাকতেন।
কোন কোন কিতাবে দেখা যায়, উপরোক্ত ঘটনার পর হযরত শাহ জালাল একরাতে স্বপ্নযোগে হুযুর আকরাম (স.) কর্তৃক আদিষ্ট হন যে, ‘তুমি বাংলাদেশে গমনপূর্বক ইসলাম প্রচারে মশগুল হও। তথাকার খোদাদ্রোহী আস্তানাসমূহে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করে দাও। আর মানুষদেরেকে শিরক ও কুফরীর অন্ধকার হতে মুক্ত করে ঈমানের আলোর দিকে নিয়ে আস। স্বপ্নের মধ্যে হুজুর (স.) তার হাতে একটু মাটি দিয়ে বললেন, এই মাটিটুকু তোমার সঙ্গে রাখ, বাংলাদেশের যে স্থানের মাটির সঙ্গে রঙ্গে ও গন্ধে এই মাটির মিল দেখবে সেখানেই তুমি নিজের আস্তানা স্থাপন করে প্রচারকার্য আরম্ভ করবে। কোন কোন গ্রন্থে দেখা যায়, হযরত আহমদ কবীর (র.) হযরত শাহ জালালের শুভস্বপ্ন শ্রবণ করে তাকে বাংলাদেশের দিকে রওয়ানা হতে আদেশ করলেন এবং একমুষ্টি মাটি তার হাতে দিয়ে বললেন, বাংলাদেশের যে স্থানে এই মাটির অনুরূপ মাটি দেখতে পাবে সেই স্থানেই তুমি নিজের আস্তানা স্থাপন করবে।
পীরের আদেশপ্রাপ্ত হয়ে হযরত শাহ জালাল (র.) ১২ জন মুরিদকে নিয়ে হিন্দুস্থানের দিকে রওয়ানা করে নিজের জন্মভূমিকে শেষবারের জন্য দেখার উদ্দেশ্যে ইয়ামনের দিকে চললেন। হযরত শাহ জালাল (র.) এর জন্মভূমি ইয়ামান ত্যাগপূর্বক দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করলেন। তিনি হযরত সাইয়্যেদ আহমদ কবির (র.) প্রদত্ত মাটিগুলি জনৈক খাদেমের হাতে দিয়ে বলে দিলেন, পথের যেই স্থান দিয়ে আমরা গমন করব প্রত্যেক জায়গার মাটির সাথে তুমি এই মাটি মিলিয়ে দেখবে। এই কাজের ভার তোমার উপর অর্পণ করা হলো। এই মুরীদের নাম হল চাশনী পীর। অতপর তিনি দিল্লী হতে এলাহাবাদে গমন করে সাইয়্যেদ নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন সাধক নাসিরুদ্দীন সিলেটে রাজা গৌরগবিন্দের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে যাচ্ছিলেন। রাজা গৌরগোবিন্দ যাদুবিদ্যায় বিশারদ একজন ইসলামধর্মবিদ্বেষী অধিপতি ছিলেন। পূর্বে তিনি ছিলেন গৌড়ের অধিপতি। হযরত শাহ জালালের এক ভক্ত কর্তৃক গৌড় বিজিত হওয়ার পর তিনি সিলেটে এসে রাজত্ব করতে থাকেন। এই রাজা একবার বুরহানুদ্দীন নামে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষের হাত কর্তন করেন এবং তার শিশুপুত্রকে হত্যা করেন এই অপরাধে যে তাদের পরিবারে গরু জবাই করা হলো এবং এর অংশ বিশেষ কোন প্রাণীর খাদ্য হয়ে রাজার দৃষ্টি সীমায় গিয়ে পড়েছিল।
পুত্রশোকে কাতর শেখ বুরহানুদ্দীন হাতের ক্ষত শুকিয়ে যাওয়া মাত্র পুত্রহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের চিন্তায় পাগলপ্রায় হয়ে গোপনে দিল্লী গমনপূর্বক সুলতান আলাউদ্দীনের দরবারে উপনীত হয়ে গৌরগোবিন্দের অত্যাচার ও নির্মম হত্যাকান্ডের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। সুলতান এই করুণকাহিনী শ্রবণ করে বড়ই মর্মাহত হলেন এবং গৌরগোবিন্দকে যথোচিত শাস্তি দেওয়ার জন্য স্বীয় ভাগিনা সেকান্দর শাহকে এক বিরাট সেনাবাহিনীর অধিনায়ক করে সিলেট অভিমুখে প্রেরণ করলেন। সেকান্দর শাহ বাহিনী সোনারগাঁয় পৌঁছলে গৌরগোবিন্দ তাদের প্রতি অগ্নিবান নিক্ষেপ করিতে লাগলেন। কেউ কেউ বলেন, ব্রহ্মপূত্র নদী পার হলে অগ্নিবান নিক্ষেপ করা আরম্ভ হয়েছিল। মুসলমান সৈন্যগণ ইতিপূর্বে কখনও অগ্নিবানের সম্মুখীন হয়নি। কিভাবে অগ্নিবান হতে আত্মরক্ষা করতে হয় তারা তা জানত না। কাজেই অগ্নিবানে দগ্ধ হয়ে বহু মুজাহিদ শাহাদাৎ বরণ করলেন।
এই অবস্থা দেখে সেকান্দর শাহ্ প্রথমে সসৈন্য পশ্চাৎপদ হলেন। তৎপর আবার অগ্রসর হতে লাগলেন কিন্তু এবারেও পরাজিত হলেন। অনুরূপভাবে তৃতীয়বার আক্রমণ করেও কৃতকার্য হতে পারলেন না। অবশেষে মাত্র ৩৬০জন অবশিষ্ট সৈন্যসহ দিল্লী অভিমুখে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে হযরত শাহ্ জালাল (রহ.) এর সহিত তার সাক্ষাৎ হল। সেকান্দর শাহের মুখে আনুপূর্বিক সমুদয় ঘটনা অবগত হয়ে হযরত শাহ জালাল (র.) সেকান্দর শাহ্কে আশ্বাস দানপূর্বক বললেন, আমিও শিরক এবং কুফরীকে ধ্বংস করে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করার জন্য এতদঞ্চলে এসেছি।
হযরত শাহ জালাল (র.) ইয়ামেন হতে মাত্র বারজন মুরীদ সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু সিলেট পর্যন্ত পৌছতে পৌছতে তার মুরীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩৬০জনে। হযরত শাহ্ জালাল (র.) ৩৬০জন মুরীদ এবং বাদশাহের প্রেরিত সেনাদলসহ সোনারগাঁয়ে সেকান্দর গাযীর সাথে গিয়ে মিলিত হলেন। নতুন সৈন্যের আগমনে সেকান্দর শাহেরও আনন্দিত হওয়া স্বাভাবিক। তিনি শাহ জালালের (র.) পরিচয় পেয়ে সমুদয় ঘটনা তার নিকট ব্যক্ত করলেন এবং এটাও বললেন যে, গৌরগোবিন্দের যাদুক্রিয়াই তাদের পরাজয়ের প্রধান কারণ।
হযরত শাহ জালাল (র.) তাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, কোন ভয় বা চিন্তার কারণ নেই। হযরত মুসা (আ.) যেভাবে ফেরাউনের সমস্ত যাদুকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিলেন, আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে আমরাও গৌরগোবিন্দের যাদুবিদ্যা নিস্ফল করে দেব। তিনি যখন ইসলামধর্মের অবমাননা করেছেন, তখন তার পরাজয় এবং সিংহাসনচ্যুতি সুনিশ্চিত ও অনিবার্য হয়ে উঠেছে। গৌরগোবিন্দ মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আধ্যাত্মিক ও সমরতাত্তি¡ক প্রস্তুতি দেখে তার পরাজয় অনিবার্য বুঝতে পারলেন। সুতরাং তিনি পশ্চাতের দিকে গোপনে পালিয়ে গেলেন। এরপর তার পরিণাম কি হয়েছে জানা যায়নি। হযরত শাহ জালাল পূর্ববৎ সুরমা নদী পার হয়ে সিলেট শহরে প্রবেশ করলেন। এটা ৭০৩ হিজরীর ঘটনা। হযরত শাহ জালাল (র.) স্বীয় ওয়াদা অনুযায়ী সিলেটের সিংহাসন সেকান্দর শাহকে দান করলেন। বর্তমানে যেখানে হযরত শাহ জালাল (র.) এর মাযার অবস্থিত, সেখানকার মাটির সহিত তার সঙ্গের মাটির রং মিলে যাওয়ায় তিনি সেখানেই আস্তানা স্থাপন করলেন। সঙ্গীয় মুরীদানের মধ্যে হাজী ইউসুফ, হাজী খলীল এবং শাহযাদা আলীকে নিজের নিকট রেখে অপরাপর মুরীদগণকে ধর্মপ্রচারের জন্য অন্যান্য দিকে পাঠিয়ে দিলেন।
হযরত শাহ জালাল (র.) ৩০ বছর বয়সে সিলেটে আগমন করেন এবং ৩০বছরকাল সিলেটে নিজের আস্তানায় থেকে এবাদত বন্দেগী করেন। আর দুইবছরকাল সফরে অতিবাহিত হয়। ৬২বছর বয়সে ৭৩৩হিজরী সনে যিলকাআদার ২০ তারিখ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তিনি ইন্তিকাল করেন এবং নিজের হুজরার ভিতরের সমাহিত হন। তার মাযারের চারদিকে চারটি পাকা স্তম্ভ রয়েছে। পূর্বপাশে শাহযাদা আলী সাহেবের মাযার ও উত্তর-পশ্চিম দিকে উযীরযাদা মকবুল খাঁর কবর অবস্থিত। উক্ত সমতল ভূমির পশ্চিম দিকে একটি সুরম্য মসজিদ। যেয়ারতকারীরা সেখানে বসে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করে থাকেন।
১৬৯৭ সনে ঢাকার ফৌজদার মুরাদ বখশ সাহেব শাহ জালালের দরগাহের জন্য একটি বড় ডেগ প্রস্তুত করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। উক্ত ডেগটি ভাসতে ভাসতে সিলেটের চাঁদনী ঘাটে গিয়ে ভিড়ল। বহু লোক ডেগটি দেখার জন্য নদীর তীরে এসে উপস্থিত হল। ডেগের পার্শ্বে লেখা ছিল প্রস্তুতকারকের নাম ইয়ার মামুদের পুত্র শেখ আবু সাঈদ মোহাম্মদ জাফর জাহাঙ্গীর নগরের অধিবাসী। সিলেটের দরগাহের জন্য পাঠান হল। প্রেরক মুরাদ বখশ ফৌজদার। হযরতের শপথ করে বলছি, এই ডেগ কেউ দরগাহের সীমার বাইরে নিবেন না। ওজন পাঁচমণ সাড়ে তিন সের। এ সমস্ত লেখা দেখে সকলে আশ্চর্যান্বিত হল। অনেকেই সেটাকে ধরে তীরে উঠানোর চেষ্টা করল; কিন্তু ধরতে গেলেই সেটা মধ্যনদীর দিকে সরে যায়। পরক্ষণেই আবার ঘাটে এসে লাগে। অবশেষে দরগাহের খাদেম সারে কাওম আবুল আব্বাস আহমদ সাহেবকে সংবাদ দেওয়া হলে তিনি আসলেন এবং ডেগটিকে তীরে উঠিয়ে হাতীর পিঠে তুলে দরগাহে নিয়ে গেলেন। ডেগটি আজও শাহ জালাল সাহেবের দরগাহে বিদ্যমান আছে।

মনিরুল ইসলাম রফিক অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত খতীব।

পূর্বকোণ/এস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট