
বৈশ্বিক সংকট ও জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সঙ্গে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ও সশরীর শ্রেণি কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মহানগরীর সরকারি ও বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই পরিকল্পনার আওতায় আসার কথা। তবে সরকারের এমন পরিকল্পনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনায় ‘আতঙ্কে রয়েছেন’ শিক্ষক-অভিভাবক। তাদের ভয়, করোনাকালের সময় অনলাইন ক্লাসের কারণে বহু শিশু শিক্ষার্থী মোবাইল বা ডিভাইসে আসক্ত হয়ে গেছে। সেখান থেকে তাদের কিছুতেই ফেরানো যাচ্ছে না। এই অবস্থায় আবারও অনলাইনে ক্লাসের পরিকল্পনা করলে আরও শিশুর ভবিষ্যত অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। তাছাড়া উপযুক্ত তদারকি না থাকায় অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে আসলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। তাই অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে প্রয়োজনে দিন বা ক্লাসের সংখ্যা কমিয়ে আনলে সেটা বরং সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। করোনার সময়টা ছিল প্রাণঘাতী স্বাস্থ্য সমস্যা। এখনতো সেরকম সমস্যা নাই। এটাও মাথায় রাখতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো প্রাথমিক স্তরেও সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার একটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন নির্দেশনার আলোকে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে অনলাইনভিত্তিক ক্লাস চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটি আপাতত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো চ‚ড়ান্ত হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে তিন দিন সরাসরি (অফলাইন) এবং তিন দিন অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জোড়-বিজোড় তারিখ বা শিক্ষার্থীদের রোল নম্বর অনুযায়ী ক্লাস ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের দিনগুলোতেও শিক্ষকদের সশরীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পাঠদান পরিচালনা করতে হবে। আর বিজ্ঞানসহ ব্যবহারিক বিষয়গুলোর ক্লাস ল্যাবে সরাসরি সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হবে।
আব্দুর রহমান
সাবেক প্রধান শিক্ষক
নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে সব অভিভাবক সচেতন না। সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইন ক্লাসের কথা বললেই অনেক অভিভাবক বাচ্চাদের হাতে মোবাইল বা ডিভাইস তুলে দেন। তবে বাচ্চারা এটার যথাযথ ব্যবহার করছে কিনা তা আর তদারকি করার প্রয়োজন মনে করেন না। আবার ক্লাস চলাকালীন বিদ্যুৎ চলে গেলে ওয়াইফাই বন্ধ হয়ে যায়। আসল কথা হচ্ছে অনলাইন ক্লাসে এমন অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
তিনি আরো বলেন, তারপরও কিছু কিছু অভিভাবক বা ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে, যারা এটা থেকে ফ্রুটফুল হবে। ভালো রেজাল্ট পাবে কিন্তু সবাই পাবে না। তিনদিনের জায়গায় যদি সরকার চারদিন স্বশরীরে ক্লাস করাতে পারে তাহলে একদিন বাড়তি বন্ধ দিলে হচ্ছে। বর্তমানেতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে দুইদিন বন্ধ রয়েছে। তখন তিনদিন বন্ধ থাকলো। অন্যদিকে, অনলাইনে যে ক্লাসটা নিয়েছে সেটা কতটুকু ইফেক্টিভ হয়েছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি এটা তদারকি করেন তাহলে অনেকটা উপকার হবে বলে মনে করছি।
হাসিনা জাকরিয়া
শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বলেন, এটা সবার জানা যে করোনাকালীন সময়ে অনলাইন ক্লাস বাচ্চাদের কী পরিমাণ ক্ষতি করেছে। যা এখনও আমাদের বাচ্চারা পোষাতে পারেনি। এই সময়ে এসে যদি আমরা আবার একই কাজ করি, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চালু করে তা সুবিধার চেয়ে কী পরিমাণে অসুবিধা হতে পারে তা ভাবনার বিষয়।
তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আমরা কোয়ালিটি টিচিং বা গুণগত শিক্ষা যেটাকে বলি সেটা অনলাইনে হয় না। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে মনোযোগী হয় না। স্বশরীরে একটি ক্লাসে যতটুকু মনোযোগ দেয় তা অনলাইন ক্লাসে কখনো দেয় না। আবার শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর রেসপন্স করবে এই জিনিসটা খুবই ঘাটতি দেখা যায়। অনলাইন ক্লাস চালু রেখে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কাজ করতে থাকে। তাই আমার মতামত হচ্ছে স্বশরীরের ক্লাস প্রয়োজনে একদিন কমিয়ে হলেও চালু রাখা।
এস এম মজিবুর রহমান
প্রধান শিক্ষক
মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি উচ্চ বিদ্যালয়
মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমান বলেন, করোনাকালীন সময়ে অনলাইন ক্লাসের ফলে শিক্ষার্থীদের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, এত সময় পরেও আমরা তা পোষাতে পারিনি। আবার যদি অনলাইন ক্লাস শুরু হয়, গ্রামে বা মফস্বলে শিক্ষার্থীরা চূড়ান্তভাবে পিছিয়ে পড়বে।
বাচ্চাদের মন মানসিকতা এবং নৈতিককতা সব কিছুর জন্য স্কুল ক্যাম্পাস বড় ভূমিকা রাখে। স্কুলের পরিরবর্তে শিক্ষার্থীরা বাসায় বসে বসে অনলাইনে ক্লাস করলে মা-বাবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন না। বাচ্চাদের হাতে একটি ডিভাইস তুলে দিলে তা ফেরত নেয়া খুব কঠিন। এরফলে ধীরে ধীরে তারা ডিভাইসমুখী হয়ে যাবে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তারা সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করা শুরু করবে।
জ্বালানি তেলের সমস্যার জন্য সরকার সপ্তাহে তিনদিন অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা করছে। তবে আমার মনে হয় স্বশরীরে তিনদিন ক্লাসের পরিবর্তে যদি চারদিন করা হয় তাহলে শিক্ষাথীদের বেশি উপকার হবে।
এছাড়া, প্রয়োজনে সাত পিরিয়ডের জায়গায় ছয় পিরিয়ড কিংবা ছয় পিরিয়ডের জায়গায় পাঁচ পিরিয়ড করতে পারে। করোনাকালীন সময়ে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অনলাইন ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না। তখন তো একটা মহামারী ছিল। এখন তো সেটা নেই। সোজা কথা হচ্ছে যে নৈতিকতার অবক্ষয় এবং লেখাপড়ার মধ্যে যে ভাটা আসবে তা কাভার করা খুব কঠিন হবে। তবে কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে অনলাইন ক্লাস চালু করা যেতে পারে।
মুহাম্মদ তজল্লী আজাদ
প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল
কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ তজল্লী আজাদ বলেন, একটি বিশেষ কারণে সরকার অনলাইন ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে সরকার হয়তো চিন্তা করছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পরিবর্তে হলেও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে চালু রাখি। কিন্তু করোনার সময়ে অনলাইন ক্লাসে তেমন কোন সুফল আসেনি। বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের মুখোমুখি হয়ে ক্লাসের যে পাঠদান সেটাই হচ্ছে কার্যকরি। তবে সরকার আমাদের যে নির্দেশনা দিবে আমরা সেভাবে কাজ করবো।
তিনি আরো বলেন, অনলাইন ক্লাসের কথা শুনে অনেক অভিভাবক ইতোমধ্যে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের হাতে যদি আবার ফোন চলে যায়, তা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন হবে এ আশঙ্কায়। তিনদিন হোক বা চারদিন হোক পুরোটা যদি স্বশরীরে ক্লাস হয় তা অনেক কার্যকর হবে। এরমধ্যে যদি অনলাইন ক্লাস যুক্ত হয় তাহলে স্বশরীরে যে ক্লাস হবে শিক্ষার্থীরা সেটাকেও অবহেলার মধ্যে নিয়ে যাবে।
পূর্বকোণ/ইবনুর