চট্টগ্রাম শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

দায়িত্ব, পুনর্গঠন ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ৮:০৯ পূর্বাহ্ণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের জোট। গণতন্ত্রের মৌলিক সৌন্দর্য এখানেই— জনগণ রায় দেয়, নেতৃত্ব সেই রায়ের ভার বহন করে। এখন সময় উল্লাসের নয়; দায়িত্ব গ্রহণের।
এবারের নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটেও জনগণ স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বলেছে। অর্থাৎ জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেয়নি; তারা কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত রূপান্তরের পক্ষে মত দিয়েছে। এই দ্বৈত ম্যান্ডেট নতুন সরকারের হাতে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। জনগণের এই স্পষ্ট সম্মতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাই হবে গণতান্ত্রিক শাসনের প্রথম শর্ত।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর প্রতি আজ জাতির প্রত্যাশা বহুমাত্রিক। এই প্রত্যাশা কেবল দলীয় সমর্থকদের নয়; ধনী, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষের। ব্যবসায়ী থেকে কৃষক, শহর থেকে গ্রাম, সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ—সবার জন্য সমান সুযোগ, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে নতুন সরকারের প্রথম অঙ্গীকার। রাষ্ট্রের নীতি যেন কোনো অর্থনৈতিক অবস্থান, ধর্মীয় পরিচয় বা ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে বৈষম্য তৈরি না করে—এই নৈতিক অবস্থান থেকেই নীতি-নির্ধারণ শুরু হওয়া উচিত।

 

নিরাপত্তা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের স্থিতি: জনজীবনের মৌলিক প্রশ্ন
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন হতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে, ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে, এবং সামাজিক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন থাকে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় যেন কোনো প্রকার প্রতিহিংসা, সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতা মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে—এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এখন সবচেয়ে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাজার যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়। কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি ও বাজার মনিটরিং জোরদার করা—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আর্থিক ও রাজস্ব নীতি প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

 

প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন: অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা
গত এক দশকে প্রশাসনে দলীয়করণ, আর্থিক খাতে অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের স্ফীতি, নির্বাচন ও বিচার ব্যবস্থায় আস্থার সংকট—এসব আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোকে দুর্বল করেছে। জবাবদিহিতার অভাব দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। শুধু আইন প্রণয়ন নয়; আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগই হবে প্রকৃত পরীক্ষা। গণভোটে জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে, সেই সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে একটি কার্যকর, দক্ষ ও সীমিত আকারের মন্ত্রিসভা গঠন জরুরি—যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা স্থান পাবেন। বিশেষভাবে একজন বা একাধিক প্রথিতযশা শিক্ষাবিদকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। কারণ শিক্ষানীতির পুনর্গঠন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অসম্ভব।

 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা
ঘুষ ও দুর্নীতি রাষ্ট্রের শিরায় শিরায় বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একটি কার্যকর সরকার যদি সত্যিই পরিবর্তনের বার্তা দিতে চায়, তবে ঘুষের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি ঘোষণা ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রশাসনে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা বিস্তার, অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—এসবের সমন্বয়ে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দমন করতে হবে। জনগণ যে ‘হ্যাঁ’ বলেছে, তা দুর্নীতির ধারাবাহিকতাকে নয়; পরিবর্তনকে।

 

প্রযুক্তি: নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চায়, তবে প্রযুক্তিকে কেবল একটি খাত হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ই-গভর্ন্যান্স, ডেটাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন, ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে।
একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম গড়ে তুলতে হবে, যাতে তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা ও প্রস্তাব সরাসরি নীতি-নির্ধারণের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এতে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি হবে অংশগ্রহণমূলক ও গতিশীল।

 

অর্থনীতি ও শিল্পায়ন: কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই একমুখী নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ওষুধ, আইটি সেবা ও হালকা প্রকৌশল শিল্প—এসব খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
বিস্তৃত শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণে জোর দিতে হবে। কর্মসংস্থানই হবে সামাজিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

 

জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক ভারসাম্য
অভ্যন্তরীণ সম্পদ অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, আমদানি উৎস বৈচিত্র্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি প্রণয়ন—এসব টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল প্রতিদ্বন্দ্বী, শত্রু নয়। সংসদকে কার্যকর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। জনগণের রায়কে সম্মান জানানো মানে ভিন্নমতকেও মর্যাদা দেওয়া।

 

সুশাসন: ম্যান্ডেটের প্রকৃত পরীক্ষা
জনগণ ভোট দিয়েছে পরিবর্তনের আশায়, এবং গণভোটে সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট সমর্থন দিয়েছে। এই ‘হ্যাঁ’ একটি আস্থার অঙ্গীকার।
আজকের এই সন্ধিক্ষণে নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান—নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিন, ঘুষের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করুন, শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদদের অন্তর্ভুক্ত করে দক্ষ মন্ত্রিসভা গঠন করুন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করুন এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিন।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রায়ে নয়, দায়িত্বে। জনগণ তাদের কাজ সম্পন্ন করেছে; এখন পালা নেতৃত্বের। যদি এই ম্যান্ডেটকে সুশাসন, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় তবে এ নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হবে না— এটি হবে বাংলাদেশের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট