
ঢেউখেলানো চুলের ওপর সাদা শাড়ির পাড়। বড় চশমার কাচের নিচে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। মাইক হাতে নিতেই ভেসে এলো সেই মার্জিত, শিক্ষিত অথচ অবিচল কণ্ঠস্বর। কখনও সংযত, কখনও কঠিন বার্তা। থেমে থেমে বাক্য জোড়া লাগানোর সেই স্বতন্ত্র ভঙ্গি।
ঠিক এভাবেই ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ডে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে চারদলীয় জোটের জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার ১৪ বছর পর, আরেকটি জানুয়ারি। সেই একই পলোগ্রাউন্ড। আবার জনসমুদ্র, আবার স্লোগান। এবারেরটা বিএনপির নির্বাচনী মহাসমাবেশ। তবে এবার তিনি নেই; নেতাকর্মীদের চোখের জল আর স্মৃতির ভেতরেই এখন তার চির ঠিকানা।
গতকাল রবিবার বেগম জিয়ার রেখে যাওয়া পলোগ্রাউন্ডের সেই মঞ্চে যেন অভিষেক হলো পুত্র তারেক রহমানের। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সর্বশেষ চট্টগ্রাম সফরে এসেছিলেন ২০০৫ সালের ৬ মে। তখন তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের পক্ষে ভোট চাইতে লালদিঘি মাঠে আয়োজিত সভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। তারপর দীর্ঘ দুই দশকের বিরতি। সেদিনের ৩৯ বছরের তারেক রহমান এখন ষাটের দোরগোড়ায়। মাঝের ওই সময়টা তার জীবনে ছিল ঝড়ের মতো; এক-এগারোর সময়ে গ্রেপ্তার, রিমান্ডের নামে শারীরিক নির্যাতন, প্রবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে অনিশ্চিত দিন, ভাই হারানোর বেদনা, মাকে তিলে তিলে নিভে যেতে দেখা। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ফেরা। দলের প্রধান হিসেবে এটিই তার প্রথম চট্টগ্রাম সফর, ঠিক ২০ বছর পর।
তারেক রহমানের এই সফর ঘিরে তাই নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ যেমন ছিল, তেমনি বেগম জিয়াকে মনে করে অনেকের ভিজেছে চোখ।
মাথায় প্যাঁচানো লাল-সবুজের পতাকা, গায়ে দলের লোগো-খচিত টি-শার্ট। বান্দরবান থেকে আসা জাহাঙ্গীর আলম বললেন, ‘তারেক রহমানকে দেখতে এসেছি। তার সঙ্গে খালেদা জিয়াকে একই মঞ্চে দেখলে ভালো লাগতো। কিন্তু সেটি যে আর কোনও দিন হবে না।’ বলতে বলতে চোখ যেন ঝাপসা হয়ে ওঠে পঞ্চাশের জাহাঙ্গীরের।
১৪ বছর আগে খালেদা জিয়ার জনসভায় এসেছিলেন পেকুয়ার রহিম উদ্দিন। এবার এলেন তারেক রহমানের মহাসমাবেশে। স্মৃতিতে ডুব দিয়ে তিনি বললেন, আপসহীন নেত্রীর সেই সমাবেশের সব মনে আছে। তিনি আপস করে বিদেশে গেলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি তাকে হারাতাম না। কিন্তু তিনি দেশের মানুষকে ছেড়ে যাননি। আর গত ১৫ বছর সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে নেত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে আমাদের কাছ থেকে দ্রুত বিদায় নিয়েছেন। আজ তারেক রহমানের পাশে যদি দেশনেত্রী বসতেন, কত ভালো লাগতো!
সমাবেশে ছিল তরুণদের ঢল; যারা ২০০৫ সালের তারেক রহমানকে দেখেননি, খালেদা জিয়ার ভাষণও শোনেননি সরাসরি। তারা গল্প শুনেছেন বাবার মুখে কিংবা চায়ের দোকানের আড্ডায়। এবার তারা সরাসরি তারেক রহমানের সমাবেশে এসে সেই আক্ষেপ যেন দূর করলেন।
রেডিসন ব্লু বে-ভিউ থেকে পলোগ্রাউন্ড; দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। অথচ সেই পথ পাড়ি দিতে তারেক রহমানকে বহনকারী লাল-সবুজের বাসটির সময় লাগলো ৪০ মিনিটেরও বেশি। এত সময় লাগার একটাই কারণ, তারেক রহমানকে ঘিরে জনতার আবেগের বিস্ফোরণ। সেই জনস্রোতের ঢেউ কেটে কেটে পলোগ্রাউন্ডে প্রবেশ করতেই মাঠজুড়ে ওঠে স্লোগানের গর্জন। পাশাপাশি কেউ মোবাইলে তারেক রহমানকে বন্দী করছেন, কেউ নীরবে তাকিয়ে ছিলেন মঞ্চের দিকে; যেন বেগম জিয়া থেকে তারেক রহমান- ইতিহাস বদলের মুহূর্ত নিজ চোখে নিশ্চিত করছেন। তারেক রহমানও বেগম জিয়ার মতো হাত নেড়ে অভিবাদন নিলেন, বসলেন সেই মাঝখানের চেয়ারটাতে, যেটা একটা সময় বরাদ্দ ছিল বেগম জিয়ার জন্য।
সেসব দেখে নেতাকর্মীদের কেউ কেউ বলছিলেন, ‘নেত্রী নেই, কিন্তু তার ছায়া আছে।’ রবিবারের লাখো জনতার ভিড়ে তাই যেমন ছিল উচ্ছাস, তেমনি ছিল অনুপস্থিত এক নেত্রীর বিশাল স্মৃতির ভারও। অদৃশ্য হয়েও যেন বেশি করে তিনি ছিলেন মহাসমাবেশজুড়ে। সেই নেত্রীর নাম- বেগম খালেদা জিয়া।
পূর্বকোণ/সিজান