
আজ শনিবার (২৪ জানুয়ারি) বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র, বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের ছোট ভাই এবং বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক আরাফাত রহমান কোকোর ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী।
দিবসটি উপলক্ষে সকাল থেকেই বনানী কবরস্থানে কোকোর কবরের পাশে কোরআন তেলাওয়াত করছেন আলেম ও হাফেজরা। শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী।
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার এক কঠিন সময়ে মালয়েশিয়ায় আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন আরাফাত রহমান কোকো। সে সময় তার মা খালেদা জিয়া গুলশানে নিজ কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবরোধে ছিলেন। প্রিয় পুত্রের মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। মায়ের পক্ষে শেষবার সন্তানের মুখ দেখার বিষয়টি নিয়েও সে সময় রাজনীতির নোংরা কৌশলের সাক্ষী হতে হয় দেশবাসীকে।
মৃত্যুকালে কোকোর বয়স ছিল ৪৫ বছর। চার দিন পর ২৮ জানুয়ারি তার মরদেহ দেশে আনা হয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও আরাফাত রহমান কোকো দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের আড়ালেই ছিলেন।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ১/১১-এর সেনাসমর্থিত সরকারের সময়ে মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ার পরই তিনি মূলত দেশবাসীর নজরে আসেন।
রিমান্ডে নেওয়ার পর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলে তার শরীরে মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন তিনি। সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও টেলিভিশনের ফুটেজে প্রায়ই তাকে বুক চেপে ধরে থাকতে দেখা যেত। ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য তিনি সপরিবারে থাইল্যান্ড যান।
পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় বসবাস শুরু করেন। গুরুতর অসুস্থতার পাশাপাশি দেশে মায়ের ওপর চলমান নিপীড়নের খবরে তিনি মানসিকভাবে চরম উদ্বেগের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে তার জীবনাবসান ঘটে।
১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ঘরে জন্ম নেন আরাফাত রহমান কোকো। জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার শৈশব কাটে। ১৯৭১ সালের ২ জুলাই পাকিস্তানি সেনারা ঢাকায় অভিযান চালিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে তার দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন বন্দিদশায় থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার মাধ্যমে তারা মুক্তি পান।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর মায়ের স্নেহ ও তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন কোকো। ছোটবেলা থেকেই শান্ত ও নিরবে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও রাজনীতির পরিবর্তে ব্যবসা ও ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও বিনয়ী। ঘনিষ্ঠজনদের মতে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হয়েও তিনি সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। নব্বইয়ের দশকে বাকিতে মোটরসাইকেলের তেল কেনা কিংবা পথশিশুদের জন্য খেলনা ও চকলেট নিয়ে হাজির হওয়া ছিল তার স্বভাবসুলভ আচরণ। মালয়েশিয়াতেও স্ত্রী শর্মিলা রহমান এবং দুই মেয়ে জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমানকে নিয়ে সাধারণ ভাড়াবাসায় বসবাস করতেন এবং নিজেই সন্তানদের স্কুলে আনা–নেওয়া করতেন।
ক্রীড়াপ্রেমী কোকো বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি বিসিবির ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তার গৃহীত অনেক কর্মসূচির সুফল আজও পাচ্ছে দেশের ক্রিকেট। এ ছাড়া তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের এক্সিকিউটিভ কমিটির কালচারাল সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
নিরহংকার, প্রচারবিমুখ ও মানবিক এই ক্রীড়া সংগঠকের অবদান ও স্মৃতি আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন তার অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী।
পূর্বকোণ/পিআর