
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে। তপশিল ঘোষণার পর এক মাসেরও বেশি সময়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতীক পেয়ে আজ থেকেই মূলত ভোটের লড়াইয়ে মাঠে নামছেন প্রার্থীরা। প্রচার শুরুর আগেই সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যদিও নির্বাচন ঘিরে আগেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ এসেছে। সারাদেশ থেকে প্রার্থীদের সতর্ক করে শোকজ নোটিশ ও জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে।
তপশিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ করা হবে। এর আগে ২১ দিন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সুযোগ পাবেন প্রার্থীরা। আজ থেকে প্রচার শুরু হয়ে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত প্রচারণা চালানো যাবে।
এই অবস্থায় গতকাল বুধবার সারাদেশের ২৯৮ আসনের ১৯৮১ জন প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ১৭৩২ এবং ২৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। আপিল বিভাগের নির্দেশে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের নতুন সীমানায় ভোট গ্রহণের তারিখ ঠিক রেখে পুনঃতপশিল হওয়ায় এই দুটি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত ও প্রতীক বরাদ্দ এখনও হয়নি।
এর আগে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর মঙ্গলবার মধ্যরাতে ইসি থেকে ২৯৮ আসনে এক হাজার ৯৬৭ জন বৈধ প্রার্থী রয়েছেন বলে জানানো হয়। তবে বুধবার সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করে ইসি জানায়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ১৪ জন বেড়ে ১৯৮১ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী আছেন ঢাকা-১২ আসনে। সর্বনিম্ন প্রার্থী রয়েছে পিরোজপুর-১ আসনে ২ জন।
শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু আজ
প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা আজ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নামছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করবেন সিলেট থেকে। সেখানে গতরাতে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের পর আজ সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দেবেন তিনি। এরপর মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ৬টি সমাবেশে যোগদান শেষে রাতেই ঢাকায় ফিরবেন তারেক রহমান।
আজই ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। প্রথম দিনে রাজধানীতে নিজের ঢাকা-১৫ আসন ছাড়াও মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে জনসভা করবেন। কাল শুক্রবার পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং রংপুরের জনসভার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন শফিকুর রহমান।
অন্যদিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আজ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দীন ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সমাধি এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করবেন। তিন নেতার সমাধি ও কবর জিয়ারত শেষে প্রচারণা কর্মসূচি জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত অগ্রসর হবে।
অন্য দল ও জোটের মধ্যে ৯টি বাম ও প্রগতিশীল দলের সমন্বয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারাভিযান আজ বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও শপথ গ্রহণের মাধ্যমে শুরু হবে এই প্রচারাভিযান।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও বিএনপি জোট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের প্রার্থী জেনায়েদ সাকি আজ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার চরলহনিয়াতে তাঁর বাবা ফজলুর রহমানের কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রচারণা শুরু করবেন।
শেষ হলো প্রতীক বরাদ্দ
বুধবার সারাদেশে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়গুলোতে একযোগে শুরু হয় প্রতীক বরাদ্দের কার্যক্রম। রিটার্নিং কর্মকর্তারা দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অথবা তাদের প্রতিনিধিদের হাতে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি তুলে দেন। দলীয় প্রার্থীদের প্রতীক সংরক্ষিত ও আগেই জানা থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কে কোন প্রতীক পেলেন, সেটি নিয়েই বেশি কৌতূহল দেখা দেয়। পছন্দের প্রতীক পেয়ে বেশির ভাগ স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন উচ্ছ্বসিত। তবে কোনো কোনো আসনে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী একই প্রতীক পছন্দ করলে রিটার্নিং কর্মকর্তারা আলোচনার মাধ্যমে প্রতীক বরাদ্দ দেন।
প্রতীক গ্রহণকালে প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালা মেনে চলার লিখিত অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর দিতে হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্যে সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার তাগিদ দেন। প্রতীক বরাদ্দকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিল রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়গুলোতে।
কোন দলের কতজন প্রার্থী
ইসির নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৬০টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও নিবন্ধন স্থগিত আছে। আরও ৮টি দল প্রার্থী না দেওয়ায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৫১টিতে দাঁড়ায়। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩৮টি দল অংশ নিয়েছিল।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি দলের মধ্যে বিএনপির ২৮৮ প্রার্থী দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ বরাদ্দ পান। জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থী ২২৪ জন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের প্রার্থী ৩২ জন। চরমোনাইর পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী ২৫৩, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের ১৯২ প্রার্থী, গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের ৯০ প্রার্থী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ‘কাস্তে’ মার্কার ৬৫ প্রার্থী, ইনসানিয়াত বিপ্লবের ‘আপেল’ প্রতীকের ৪২ প্রার্থী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ‘মই’ প্রতীকের ৩৯ প্রার্থী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ‘রিকশা’ প্রতীকের ৩৪ প্রার্থী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ‘ঈগল’ প্রতীকের ৩০ প্রার্থী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ-মার্কসবাদী) ‘কাঁচি’ প্রতীকের ২৯ প্রার্থী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির ‘তারা’ মার্কার ২৬ প্রার্থী, খেলাফত মজলিসের ‘ঘড়ি’ মার্কার ২১ প্রার্থী, জনতার দলের ‘কলম’ প্রতীকের ১৯ প্রার্থী, গণসংহতি আন্দোলনের ‘মাথাল’ প্রতীকের ১৭ প্রার্থী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ‘আনারস’ প্রতীকে ১৫ প্রার্থী, আমজনতার দলের ‘প্রজাপতি’ প্রতীকের ১৫ প্রার্থী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ‘ছাতা’ প্রতীকের ১২ প্রার্থী, জাতীয় পার্টি-জেপির ‘বাইসাইকেল’ প্রতীকের ১০ প্রার্থী, নাগরিক ঐক্যের ‘কেতলি’ প্রতীকের ১১ প্রার্থী, বাংলাদেশ জাসদের ১১ প্রার্থী ‘মোটরগাড়ি’, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ‘কোদাল’ প্রতীকের ৭ প্রার্থী, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএলের ‘হারিকেন’ প্রতীকে ৬ প্রার্থী, জমিয়তে উলামায়ে বাংলাদেশে ‘খেজুরগাছ’ প্রতীকের ৪ প্রার্থী, গণফোরামের ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকের ১৯ প্রার্থী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির ‘গরুরগাড়ি’ প্রতীকে ৫ প্রার্থী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ‘বটগাছ’ প্রতীকে ৮ প্রার্থী, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ‘চেয়ার’ প্রতীকে ১৯ প্রার্থী, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) ‘ছড়ি’ প্রতীকে ২০ প্রার্থী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী পার্টির ‘বই’ মার্কার ৩ প্রার্থী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) ২ প্রার্থী ‘ফুলকপি’ প্রতীকে লড়বেন।
এছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ‘মোমবাতি’ প্রতীকে ২৬ প্রার্থী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ‘ডাব’ প্রতীকে ১৮ প্রার্থী, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ‘হুক্কা’ প্রতীকে ১৩ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ‘আম’ প্রতীকে ২৩ প্রার্থী, মাইনোরিটি জনতা পার্টির ‘রকেট’ প্রতীকে ৮ জন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) ‘হাতি’ প্রতীকে ১২ প্রার্থী, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) ‘একতারা’ প্রতীকে ১৯ প্রার্থী এবং জাকের পার্টির ‘গোলাপ ফুল’ প্রতীকে ৭ জনসহ অন্য দলের প্রার্থীরা নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে লড়ছেন।
এদিকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার আগের দিনও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, তারা এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষে ইসির তালিকায় দেখা যায়, তাদের ৭ জন প্রার্থী আছেন। তখন জাসদ বলেছিল, তারা কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে ইসির প্রকাশিত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, দলটির ৬ জন প্রার্থী আছেন এই নির্বাচনে। এছাড়া ১৪ দলের আরেক শরিক গণতন্ত্রী পার্টির একজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বলে প্রার্থী তালিকায় দেখানো হয়েছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক
ইসির প্রতীক তালিকার ১১৯টি থেকে দলীয় ৬০টি বাদে অন্য প্রতীকগুলো ২৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য বরাদ্দ করা হয়। এতে ফুটবল, হাঁস, কলস, ঘুড়ি ইত্যাদি প্রতীক বরাদ্দ পান তারা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে আলোচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ‘হাঁস’ প্রতীক। ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম নীরবকে ‘ফুটবল’ প্রতীক দেওয়া হয়েছে। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা ডা. তাসনিম জারা প্রতীক পেয়েছেন ‘ফুটবল’।
আচরণবিধি প্রতিপালনে কঠোর পদক্ষেপ ইসির
গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণা হয়। এরপর থেকে নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা কঠোরভাবে প্রতিপালনের দিকে জোর দিচ্ছে ইসি। এ জন্য প্রতিটি উপজেলা ও থানায় ন্যূনতম দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে তারা। তপশিল ঘোষণার পরদিন থেকে ভোটগ্রহণের দুই দিন পর পর্যন্ত মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।
এবার আচরণবিধি প্রতিপালনে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে; যার নেতৃত্বে থাকবেন ৩০০ জন বিচারক। এরই মধ্যে এসব বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিচারিক ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। ফলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য এই কমিটি তাৎক্ষণিক বিচার ও শাস্তি দিতে পারবে।
কী করা যাবে, কী করা যাবে না
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এ ভোটের প্রচারে পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব প্রচারণার লক্ষ্যে রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক, পিভিসি বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন বা ব্যানার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। প্রচারের সময় মাইকের শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে।
একইসঙ্গে প্রচারে বিলবোর্ডের ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী এক সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। বিলবোর্ডের দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট। এছাড়া বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে কোনোভাবেই জনসাধারণ বা যানবাহন চলাচল এবং পরিবেশ বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না। শুধু ডিজিটাল বিলবোর্ডে আলোর ব্যবহার করা যাবে। এর বাইরে সব ধরনের আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
আচরণ বিধিমালায় সামাজিক মাধ্যমে ভোটের প্রচারেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়–প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না। ঘৃণাসূচক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচনসংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সব ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাবে না। প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাসূচক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া নির্বাচনী স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। এমন ধরনের সব কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার ও প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। গুজব ও এআইর অপব্যবহার বন্ধে অপরাধ বিবেচনায় শাস্তির বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) এবার নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।
আচরণবিধিতে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে ভোটার স্লিপ বিতরণ করা যাবে। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করা যাবে না। এছাড়া আচরণ বিধিমালায় সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তী/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না।
আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তসাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
তবুও আচরণবিধির লঙ্ঘন দেদার
ইসির এত কড়াকড়ি থাকার পরও গত কয়েকদিনে দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। সারাদেশে থেকে প্রায় অর্ধশত অভিযোগ এসেছে বলে জানিয়েছে ইসি। এসব কারণে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অনেক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও শোকজ বা জরিমানা করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতীকসহ পোস্ট বা লিফলেট বিতরণের অভিযোগে কিছু এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় বিএনপির অভিযোগের ভিত্তিতে ইসি জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ চার দলকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে। খোদ নির্বাচন কমিশনের সামনে লিফলেট বিতরণ করার পাশাপাশি ভোট চান ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মামুনুল হক। পরে তাঁকে শোকজ করা হয়। এছাড়া ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীকে শোকজ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া অনেক প্রার্থীকে জরিমানাও করা হয়েছে।
মাঠের এমন পরিস্থিতিতে কঠোরতার বদলে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। একাধিক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আচরণবিধি সঠিকভাবে পালন করা হলে নির্বাচন সুন্দরভাবে হবে। এ জন্য আপনাদের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।’
পূর্বকোণ/সিজান