চট্টগ্রাম সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

চাপের মুখেই কি দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের বৈধ করলো ইসি

চাপের মুখেই কি দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের বৈধ করলো ইসি

অনলাইন ডেস্ক

১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৬:৪৬ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছু রাজনৈতিক দলের চাপের মুখে ঢালাওভাবে দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে।

এ সুযোগ নিয়ে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রায় দুই ডজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সেই সাথে একটি দলের চাপের মুখে ঋণ খেলাপিদেরও নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য কারও বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে সেটি ত্যাগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও নির্বাচন কমিশন সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ উঠছে।

বাংলাদেশের সংবিধানেও বলা আছে, বাংলাদেশ বাদে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকলে একজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন যে, নির্বাচনের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিত্যাগ সংক্রান্ত আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এর সুযোগ নিয়েই মূলত এবার দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ কিংবা বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে টানা ৯ দিনের আপিল শুনানির শেষ দিনে রোববার কমিশনের এমন সিদ্ধান্তের পর এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।

যদিও রোববার শুনানি শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, পক্ষপাতিত্ব করে কোনো রায় তারা দেননি।

“আমরা অনেক বিশ্লেষণ করে যেটা সঠিক মনে করেছি, আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে আন্ডারস্ট্যান্ডিং, ক্যাপাসিটির আলোকে করেছি,” বলেছেন তিনি।

বিএনপির কুমিল্লা-১০ আসনের মনোনীত প্রার্থী আব্দুল গফুর ভুঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। তার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে আপিল হয়েছিল। যদিও তার মনোনয়নপত্র বাতিল হবার কারণ হলো তিনি আপিল শুনানিতেই আসেননি।

পাশাপাশি কুমিল্লা-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের তুরস্কের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য তার প্রার্থিতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছে কমিশন।

যদিও এ দুজন ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আরও অন্তত ২০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এসেছিল। তাদের কয়েকজনের মনোনয়ন পত্র বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং অফিসার।

আবার কয়েকজনের মনোনয়নপত্র টিকে যাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে অন্য প্রার্থীর পক্ষ থেকে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এসেছিল।

কিন্তু গত তেরই জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধি দল সিইসির সাথে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতের পর মি. খান প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান যে, দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি না করার জন্য বলেছেন তারা।

“কিছু প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব সমস্যা রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে সে নির্বাচনের যোগ্য হবে। আরপিওতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব কোনো প্রার্থীর থাকলে সেটা হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে। কিন্তু নির্বাচনী হলফনামায় শুধু হ্যাঁ বা না উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য যাবতীয় ডকুমেন্ট দাখিল করতে বলা হয়নি। এজন্য কিছু রিটার্নিং অফিসার প্রার্থিতা অবৈধ করেছেন,” বলেছেন মি. খান।

তিনি এসময় আরও বলেন, “তাদের (যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে) প্রার্থিতা বাতিলও হচ্ছে। কিন্তু আইন সবার জন্য সমান করা উচিত। জামায়াতে ইসলামীর দু’জন একই কারণে বাতিল হয়েছেন। আমরা মনে করি তাদেরও রিভিউ করার সুযোগ দেয়া উচিত। আমরা অনুরোধ করেছি এ নিয়ে যেন জটিলতা সৃষ্টি করা না হয়”।

বিএনপি ও নির্বাচন কমিশনের সূত্রগুলো বলছে, মূলত ওই বৈঠকে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে কমিশনকে নমনীয় হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল বিএনপি।

তবে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়ে ওঠে ফেনী-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতার বিরুদ্ধে ওই আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ করে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার পর।

আপিল আবেদনে বলা হয়েছিল, “আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। কিন্তু, হলফনামায় তিনি সেই তথ্য গোপন করেছেন। হলফনামায় মিন্টু দাবি করেছেন, ৯ ডিসেম্বর তিনি তার মার্কিন নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু গত ৪ ডিসেম্বর মার্কিন পাসপোর্ট ব্যবহার করে আব্দুল আউয়াল মিন্টু থাইল্যান্ডে গেছেন”।

এর আগে শনিবার মানিকগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানমের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এনে করা আপিলের শুনানির সময় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এসব বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে রোববারই বিকেলে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সিইসির সাথে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

পাশাপাশি তিন দফা দাবিতে রোববার সকাল থেকে নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল।

মি. আলমগীরের সাথে বৈঠকের পর কমিশন আবার নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে এবং এরপর ঐদিনই সন্ধ্যায় দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে করা আপিলগুলোর একে একে রায় দেওয়া শুরু করে কমিশন।

এতে দেখা যায়, যাদের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ ছিল তাদের মধ্যে আব্দুল গফুর ভুঁইয়া ও মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ছাড়া বাকী সবার প্রার্থিতা বৈধ করে দেয় কমিশন।

এমনকি রিটার্নিং অফিসার এই অভিযোগে এর আগে দুই জন জামায়াত প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেছিল তারাও তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

ইসির সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি মহাসচিবের সাথে বৈঠকের পর কমিশন দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা প্রার্থীদের প্রার্থিতা বৈধ করতে নিজেরাই একটা ক্রাইটেরিয়া ঠিক করে নেন।

আর সেটি হলো- ২৯শে ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের আগে যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন করেছে এবং এ সংক্রান্ত ফি জমা দিয়েছে তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হবে।

শেষ পর্যন্ত এই নীতি কার্যকর করার কারণেই দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা কমপক্ষে ২০ জন প্রার্থীর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

আইনি অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েছে ইসি?
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ডঃ আব্দুল আলীম বলছেন, এ বিষয়ক আইনে থাকা অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে এ সিদ্ধান্ত দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে জাতীয় নির্বাচনের অংশ নিতে পারবেন না, মানে সংসদ সদস্য হতে পারবেন না।

পাশাপাশি আরপিওতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব কোনো প্রার্থীর থাকলে সেটা হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে। এজন্য সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামায় একটি সুনির্দিষ্ট ঘর রয়েছে। যেখানে প্রত্যেক প্রার্থীকে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “আমাদের দেশে দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারার বিষয়টি আইন ও সংবিধানে স্বীকৃত বিষয়। সুতরাং কেউ যদি নাগরিকত্ব ত্যাগ না করেন তাহলে তিনি জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না”।

কিন্তু কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদনের পর সেই আবেদন গৃহীত হয়েছে কি-না অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরিত্যাগ হয়েছে কি-না সে সম্পর্কিত আর কোনো প্রমাণাদি জমা দেওয়ার বিধান প্রার্থীদের জন্য নেই।

আর রোববার কমিশনও প্রার্থিতা বৈধতার জন্য যে ক্রাইটেরিয়া ঠিক করে তাহলো- মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন পর্যন্ত যারা এ ধরনের আবেদন করেছেন তাদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হবে।

এভাবেই আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে কমিশন দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থাকা প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করলো বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ডঃ আব্দুল আলীম।

ওদিকে মনোনয়নের বৈধতা বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে মোট ৪২১ জন তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা কিছু প্রার্থীও।

রোববার শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোঃ সানাউল্লাহ নিজেই বলেছেন, মনে কষ্ট নিয়ে তারা ঋণখেলাপি প্রার্থীদের ছাড় দিয়েছেন।

“আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়,” বলেছেন তিনি।’

আবার ঋণখেলাপি হওয়ায় চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করেছে ইসি। কিন্তু চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। মি. চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিলের আবেদন করে ইসিতে আপিল করেছিল দুটি ব্যাংক।

এ বিষয়ে শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন। তিনি একই সঙ্গে তিনি প্রার্থীকে সতর্ক করে বলেন, “মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন”। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা 

পূর্বকোণ/কায়ছার 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট