
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় ঢোকা ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে তিন শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে পুলিশ, যা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ইতিহাসে নজিরবিহীন একটি ঘটনা।
গত শনিবার ওইসব ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম যেমন রয়েছে, তেমনি দেখা যাচ্ছে একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতাদের নাম।
তাদের মধ্যে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সংখ্যাই বেশি, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
তালিকায় বিএনপি’র কয়েকজন স্থানীয় নেতার নাম রয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে, কারাগারে বন্দি ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন) নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের নামও।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান সিএমপি কমিশনার।
“এগুলো হচ্ছে সন্ত্রাসী। এদের বিরুদ্ধে তো নিয়মিত মামলাসহ নানান ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তো আমি চিন্তা করলাম যে, এটা এমন একটা এক্সট্রা কাজ যেটা করে রাখলে ভালো,” বিবিসি বাংলাকে বলেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ।
এর আগে, গত নভেম্বরে ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারের নির্দেশ’ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মি. আজিজ। তার এবারের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
“পুলিশ যদি কাউকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে বা কারো বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে পুলিশের উচিৎ তাকে আটক করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। কিন্তু সেটা না করে যেভাবে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি রীতিমত হাস্যকর এবং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন।
গ্রেফতারের পরিবর্তে এলাকায় অবস্থান ও প্রবেশ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছেন কেউ কেউ।
“সন্ত্রাসীদের মধ্যে যারা এতদিন চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন, সিএমপির এমন আদেশের ফলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, এখন তারা অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারেন। তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।
সিএমপি’র গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রথম দফায় ৩৩০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে তালিকার ২২৭ নম্বরে থাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর আতাউল্লাহ চৌধুরী আগেই মারা গেছেন। ফলে তার নামটি কেটে দিয়ে পরবর্তীতে ২২৯ জনের সংশোধিত আরেকটি তালিকা প্রকাশ করে পুলিশ।
তাদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র ছাড়াও রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কয়েক ডজন সাবেক কাউন্সিলরের নাম।এর মধ্যে এক নম্বরে নাম রয়েছে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মো. জাহেদের নাম। সাতকানিয়া উপজেলার বড় দুয়ারা গ্রামের বাসিন্দা মি. জাহেদ স্থানীয়ভাবে ‘পিচ্চি জাহিদ’ নামে পরিচিত বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এরপর মুন্না খান, রাজীব দত্ত, শওকত আজম এবং মো. মোস্তফা নামের আরও চার সন্ত্রাসীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের সবার বয়স ৩৫ বছর থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।চট্টগ্রামে সম্প্রতি গুলির ঘটনায় আলোচনায় আসা সন্ত্রাসী ‘বড় সাজ্জাদ’ এবং তার সহযোগী ‘ছোট সাজ্জাদে’র নামও রয়েছে।
এর মধ্যে ‘বড় সাজ্জাদ’ দেশের বাইরে রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তার সহযোগী ‘ছোট সাজ্জাদ’ বর্তমানে রাজশাহী কারাগারে বন্দি আছেন।তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নার নামও তালিকায় রয়েছে, যিনি বর্তমানে ফেনী কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
সিএমপির’র তালিকায় চট্টগ্রামের অনেক রাজনৈতিক নেতার নাম রয়েছে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা যাচ্ছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন: চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য এম আব্দুল লতিফ। এর মধ্যে জুলাই হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় আসামি হয়ে ফজলে করিম চৌধুরী এবং মি. লতিফ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
এছাড়া তালিকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তিন ডজনেরও বেশি সাবেক কাউন্সিলরের নাম রয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতাদের নাম।বিএনপি’র কয়েকজন নেতাকর্মীর নামও পুলিশের ওই তালিকায় দেখা যাচ্ছে।এর মধ্যে চার নম্বরে যার নাম রয়েছে, সেই শওকত আজম চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বলে জানা যাচ্ছে।এছাড়া সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া সাবেক ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলামের নামও তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজের স্বাক্ষরে গত ১৭ই জানুয়ারি গণবিজ্ঞপ্তিটি জারি করা হয়েছে।
সেখানে ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে ৩৩০ জন ব্যক্তিকে চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
“চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮ এর ৪০, ৪১ এবং ৪৩ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দুষ্কৃতিকারীদেরকে মহানগরী এলাকা থেকে বহিষ্কার এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উক্ত দুষ্কৃতিকারী দলের সদস্যদেরকে চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় প্রবেশ এবং অবস্থান নিষিদ্ধ করা হলো,” গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
মহানগরীর ‘শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য’ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ এই আদেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ‘যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা হবে বলে গণবিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করা হয়েছে।
১৯৭৮ সালের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৪০, ৪১ এবং ৪৩ নম্বর ধারার ক্ষমতাবলে গণবিজ্ঞপ্তিটি জারি করেছেন সিএমপি কমিশনার মি. আজিজ।
এর মধ্যে ৪০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, পুলিশ কমিশনারের কাছে যখন মনে হবে যে, তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কোন দল বা ব্যক্তির চলাচল বা শিবির স্থাপন সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য বিপদ বা আশঙ্কা সৃষ্টি করছে বা করার সম্ভাবনা রয়েছে অথবা দল বা সংগঠন বা তাদের সদস্যরা বেআইনি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, তখন তিনি সহিংস কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের লক্ষ্যে লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই দল বা সংগঠনের সদস্যদেরকে উক্ত এলাকায় প্রবেশ বা ফিরে না আসার নির্দেশ দিতে পারবেন।
এর পরের ধারায় বলা হয়েছে, পুলিশ কমিশনারের কাছে যখনই মনে হবে যে, কোন ব্যক্তির গতিবিধি বা কার্যকলাপ অন্যদের জন্য বিপদ বা ক্ষতির কারণ হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, অথবা ওই ব্যক্তি বলপ্রয়োগ বা সহিংস অপরাধে জড়িত বা অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করার সঙ্গে জড়িত, তাহলে সহিংস কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য পুলিশ কমিশনার লিখিত আদেশ প্রদানের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মহানগর এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার এবং ওই এলাকায় প্রবেশ বা ফিরে না আসার নির্দেশ দিতে পারবেন।
পুলিশ কমিশনার যদি এ ধরনের কোনো আদেশ জারি করে থাকেন, তাহলে সেটি সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ রাখা যাবে বলে অধ্যাদেশটির ৪৩ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৪০, ৪১ এবং ৪৩ নম্বর ধারা একসঙ্গে ব্যবহার করে গণবিজ্ঞপ্তি জারির ঘটনা সিএমপি’র ইতিহাসে এবারই প্রথম।
“আই লাভ টু মেক হিস্ট্রি (আমি ইতিহাস গড়তে পছন্দ করি),” বিবিসি বাংলাকে বলেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ।
তালিকায় পুলিশ যাদের নাম উল্লেখ করেছে, তাদের মধ্যে অনেকেই দেশে-বিদেশে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন।
“এই লিস্ট প্রকাশের কারণে এখন সাধারণ মানুষও জানতে পারলো যে, তার এলাকায় কারা পুলিশের তালিকায় আছে। তারাও এখন তথ্য দিতে পারবে। আবার নাম প্রকাশের কারণে অপরাধীরাও একটু ভয় পেলো,” বলেন মি. আজিজ।
কিন্তু অপরাধীদের ধরতে অভিযান চালানোর পরবর্তী পুলিশ কেন এলাকায় প্রবেশে নিষেধজ্ঞা দিচ্ছে?
“যাদের ধরার তাদেরকে ইতোমধ্যেই ধরে ফেলা হয়েছে। আবারও এমনও অনেক অপরাধী আছে, যাদেরকে অনেক চেষ্টার পরও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদেরকে ধরা কঠিন কাজ হয়ে পড়েছে,” বলেন সিএমপি কমিশনার।
“সেজন্য আমরা সব ক’টা ফ্রন্টই ওপেন করে (পথই খুলে) রাখলাম,” যোগ করেন হাসিব আজিজ।
সিএমপি কমিশনার বলছেন, আইন মেনেই গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপের আদৌ দরকার ছিল কি-না, সেই প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
“মাঠে এখন সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে এবং সারা দেশে যৌথ অভিযান চলছে। সেখানে এ ধরনের পদক্ষেপের কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? আমি মনে করি- ছিল না,” বলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।
যদিও পুলিশ দাবি করছে, নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি সিএমপি’র নতুন গণবিজ্ঞপ্তি জারির ফলে তালিকাভুক্ত আসামিদের ধরাটা এখন কিছুক্ষেত্রে সহজ হবে।
“অভিযানে ধরতে পারলে তো ধরবোই। সঙ্গে এটাও একটা দিয়ে রাখলাম, যাতে করে এদের ওপর একটা এক্সট্রা সাইকোলজিক্যাল প্রেসার (অতিরিক্ত মানসিক চাপ) কাজ করে। অপরাধীদের ধরার ক্ষেত্রে এটাও কাজে দিবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ। সূত্র: বিবিসি বাংলা
পূর্বকোণ/আরআর/পারভেজ