চট্টগ্রাম সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে হাইকোর্টের রায়
প্রতীকী ছবি

দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে হাইকোর্টের রায়

অনলাইন ডেস্ক

১১ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১০:৫৫ অপরাহ্ণ

দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর বদলে সালিশ পরিষদের অনুমতির যে বিধান মুসলিম পারিবারিক আইনে রয়েছে, তা বৈধতা পেয়েছে হাই কোর্টের এক রায়ে।ওই বিধান চ্যালেঞ্জ করে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার বিধান চেয়ে চার বছর আগে রিট মামলা করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। সেই আবেদন খারিজ করে রায় দিয়েছে হাই কোর্ট।

বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের বেঞ্চ গতবছর অগাস্টে এ রায় দেয়। ডিসেম্বরে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে।

এর ফলে দ্বিতীয় বিয়ে করতে সালিশ পরিষদ বা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বিধানই বহাল থাকছে বলে রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছেন।হাই কোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন তিনি।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় বলা ছিল, স্ত্রী বা স্বামীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হবে।পরে পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়। সেখানে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ স্পষ্ট করা হয়।

এ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তির একটি বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় সালিশ পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া পুনরায় বিয়ে করতে পারবেন না এবং এরকম অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে সম্পন্ন হলে তা রেজিস্ট্রি করা যাবে না।

এক বা একাধিক স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরো বিয়ে করতে হলে সালিশ পরিষদের অনুমতি নিতে হবে। সেজন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে চেয়ারম্যানের (বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের মধ্যে শেষ স্ত্রীর এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান) কাছে আবেদন করতে হবে। এবং আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ, প্রয়োজনীয়তা এবং এ বিয়ের বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কিনা তা লিখতে হবে।

আবেদনপত্র পাওয়ার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী ও তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধি মনোনয়ন করতে বলবেন এবং এ সালিশ পরিষদ যদি মনে করে যে, প্রস্তাবিত বিয়েটি প্রয়োজন ও ন্যায়সঙ্গত, তাহলে এবং কোনো শর্ত থাকলে তা সাপেক্ষে, পরবর্তী বিয়ের অনুমতি দিতে পারবে।

আবেদনপত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সালিশ পরিষদ তার সিদ্ধান্তের কারণগুলো লিপিবদ্ধ করবে। কোনো পক্ষ নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট মহকুমা হাকিমের কাছে পুনর্বিচারের আবেদন করতে পারবে এবং মহকুমা হাকিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এর বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

কোনো পুরুষ সালিশ পরিষদের অনুমতি ছাড়া যদি আরও একটি বিয়ে করেন, তাহলে তাকে (ক) অবিলম্বে তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সমস্ত দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে। পরিশোধ করা না হলে তা বকেয়া রাজস্বের মত আদায় করা যাবে; (খ) অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

হাই কোর্ট কী সিদ্ধান্ত দিল

আইনজীবী ইশরাত হাসান ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে এই রিট মামলা করেন।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা কেন অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সেই মর্মে রুল চাওয়া হয় সেখানে।

পরে তিনি একটি সম্পূরক আবেদন দাখিল করে প্রার্থিত রুলের ভাষায় পরিবর্তন আনেন।

“একটি রুল নিসি জারি করা হোক, যাতে প্রতিপক্ষদের দেখাতে বলা হয়—

বিদ্যমান বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের অনুমতি প্রদানের বর্তমান পদ্ধতি/প্রক্রিয়া, যা স্ত্রীদের মধ্যে সমান অধিকার নিশ্চিত করে না, তা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থি হওয়ায় কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের পারিবারিক জীবনের অধিকতর সুরক্ষার স্বার্থে বহুবিবাহ আইন সংক্রান্ত বিষয়ে কেন নীতিমালা করা হবে না, সেই মর্মে রুল চাওয়া হয় সেখানে।

এর মধ্য দিয়ে কার্যত মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টিকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়।

হাই কোর্ট সে সময় প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারি করে। সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতবছর রায় ঘোষণা করা হয়।

মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন থেকে উদ্ধৃত করে রায়ে বলা হয়, “এতে দেখা যায়, ইসলামী আইন বহুবিবাহের অনুমতি দিলেও, যেখানে কোনো পুরুষ দুই বা ততোধিক স্ত্রীর অধিকার ন্যায়সঙ্গতভাবে পালন করতে অক্ষম হওয়ার আশঙ্কা করেন, সেখানে ‘একজনকেই বিবাহ করার’ বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (ইজতিহাদ বা স্বাধীন আইনগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে) মত দিয়েছেন যে, অধিকাংশ পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

“বাংলাদেশে প্রযোজ্য হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত; তবে তা নির্ভরশীল একজন পুরুষের ন্যায়পরায়ণতা ও একাধিক স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতার ওপর।”

সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আদালত বলেছে, বাংলাদেশে বহুবিবাহ সংক্রান্ত বিষয়টি নিম্নরূপে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যেতে পারে–

অনুমোদনযোগ্যতা: ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত এবং হানাফি মাজহাব এটিকে একটি বৈধ প্রথা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

• মূল শর্ত: এই প্রথা তখনই অনুমোদিত, যখন স্বামী একাধিক স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার করতে সক্ষম হন এবং তাদের ভরণপোষণের জন্য আর্থিকভাবে সক্ষম থাকেন।

• ন্যায়বিচারের বাধ্যবাধকতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ন্যায়পরায়ণ হওয়ার সক্ষমতা, যার মধ্যে সময়, উপহার এবং অন্যান্য বস্তুগত বিষয়ে সমান আচরণ নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত।

• যখন সুপারিশযোগ্য নয়: যদি কোনো পুরুষ আশঙ্কা করেন যে তিনি ন্যায়বিচার করতে পারবেন না, তবে তার উচিত বহুবিবাহ থেকে বিরত থাকা এবং এক স্ত্রীর মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকা; কারণ এটিই আদর্শ ও উত্তম বিকল্প।

১৯৯৭ সালে হাই কোর্টের দেওয়া আরেক রায়ে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা বাতিল করে ‘ইসলামী আইনের নীতির পরিপন্থি’ হওয়ায় বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য একটি নতুন বিধান প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছিল।

তবে ওই সুপারিশের পরও সরকার যে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, সে বিষয়টি তুলে ধরে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের বেঞ্চ তাদের রায়ে বলেছে, “উপরোক্ত পর্যবেক্ষণের আলোকে সরকার যদি একটি ফোরাম গঠন করে— হয় ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বহুবিবাহ অনুমোদনের জন্য, অথবা হাই কোর্ট বিভাগের সুপারিশ অনুযায়ী বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য— তাহলে বাংলাদেশে বহুবিবাহ সংক্রান্ত সব বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।”

রায়ে হাই কোর্ট বলেছে, “এটি স্পষ্ট যে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার অধীনে আরেকটি বিবাহের অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়। এই আইন কোনো পক্ষের (পুরুষ ও নারী উভয়ের) অধিকার খর্ব করে না বা কেড়ে নেয় না; একই সঙ্গে এটি সালিশ পরিষদের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি প্রদান বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতাও আরোপ করে না।

“সালিশ পরিষদ বিবাহের কোনো পক্ষের ওপর একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।”

আদালত বলেছে, “সুতরাং আমরা সংবিধানের প্রস্তাবনায় বর্ণিত সমতা ও ন্যায়বিচারের নীতি কিংবা সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত সমতা ও বৈষম্যবিরোধী বিধানের আলোকে কোনো সাংবিধানিক বৈষম্য খুঁজে পাই না। বরং এই বিধানটি সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদের পরিপূরক, যেখানে আইনের অধীন ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

“এর অর্থ এই নয় যে, ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচারের অধিকার আইন দ্বারা কেড়ে নেওয়া যেতে পারে; বরং এর অর্থ হল— সংসদ আইন দ্বারা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ, চর্চা ও প্রচারের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”রায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে হাই কোর্ট বলেছে, “উপরোক্ত কারণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পরিপূর্ণ মত হল, বহুবিবাহের অনুমতি দিতে গিয়ে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা বাংলাদেশের নারী নাগরিকদের কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না। তাই এ রুলের পক্ষে উত্থাপিত যুক্তির কোনো ভিত্তি নেই। রুলটি খারিজ করা হল।”

 

পূর্বকোণ/আরআর/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট