
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে (Lower-Middle Income Country – LMIC) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করবে। এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু এই অর্জনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য ঝুঁকি, যাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন খগওঈ ঞৎধঢ় বা নিম্ন-মধ্যম আয়ের ফাঁদ।
এলএমআইসি ট্র্যাপ কী?
LMIC Trap মানে হলো- একটি দেশ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এলেও দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন-মধ্যম আয়ের স্তরেই আটকে থাকে। উন্নত আয়ের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। প্রথমদিকে দেশগুলো দ্রুত বাড়ে সস্তা শ্রম, মৌলিক শিল্পায়ন ও রপ্তানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধির কারণে।
কিন্তু এক সময়ে মজুরি বাড়ে, প্রতিযোগিতার সুবিধা কমে আসে, অথচ উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তি-উদ্ভাবনে দেশটি পর্যাপ্ত অগ্রগতি করতে পারে না। ফলে অর্থনীতি এক পর্যায়ে স্থবির হয়ে যায়। এটাই হলো LMIC Trap বা নিম্ন-মধ্যম আয়ের ফাঁদ।
বাংলাদেশের ঝুঁকি
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি গত দুই দশক মূলত তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয় ও শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে। এই মডেল আমাদের এলডিসি থেকে LMIC-এ পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সামনে চ্যালেঞ্জগুলো হলো-
রপ্তানি নির্ভরতা: মোট রপ্তানির ৮০% এর বেশি এখনো পোশাক খাতেই সীমাবদ্ধ।
উৎপাদনশীলতা বনাম মজুরি: শ্রম ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধি ততটা হচ্ছে না।
সুবিধা হারানো: এলডিসি মর্যাদা শেষ হলে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, সহজ অর্থায়ন ও ওষুধে বৌদ্ধিক সম্পদ ছাড় হারাতে হবে।
অবকাঠামো ও লজিস্টিকস: ব্যয়বহুল ও ধীরগতির বন্দরের কার্যক্রম, বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রতিযোগিতামূলক শক্তি কমাচ্ছে।
পথচলার দিকনির্দেশ
LMIC Trap থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এখনই কৌশলগত প্রস্তুতি জরুরি:
রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য ও আইটি খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ, অটোমেশন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন প্রজন্মকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তোলা দরকার।
নীতি ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও নীতির অস্থিরতা কমাতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, জিএসপি+ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে সক্রিয় হওয়া অপরিহার্য।
উপসংহার
২০১৮ সালে জাতিসংঘের সূচকে আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছি, ২০২৬ সালে তা বাস্তবে রূপ নেবে। কিন্তু যদি আমরা নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো না গড়ে তুলি, তাহলে নিম্ন-মধ্যম আয়ের স্তরেই আটকে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। খগওঈ ঞৎধঢ় থেকে বেরিয়ে আসাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নীতি-চ্যালেঞ্জ।