বাংলাদেশের ঈদ বাজারে বড় দখল থাকে ভারতীয় পোশাকের। বিশেষ করে শাড়ি ও থ্রি-পিসের বাজারে থাকে একক আধিপত্য। সহজ যোগাযোগের কারণে বৈধ ও অবৈধ-দুই পথেই বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পোশাক এবং প্রসাধনসামগ্রী ঢুকতো বাংলাদেশে। এবার বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর দুই দেশে বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দেয়। ঈদে পোশাকের বড় মৌসুমে ভারতীয় বাজারে বড় ধাক্কা লাগে।
প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি পর্যটক চিকিৎসা ও ভ্রমণে ভারতে যায়। দেশের ফেরার সময় সবাই সাধ্য মতো কেনাকাটা করে। বাংলাদেশে ভারতীয় পোশাকের বেশি চাহিদা রয়েছে। ঈদুল ফিতরে সেই চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ভারতীয় পোশাক আমদানি করে দেশীয় চাহিদার বড় অংশ মেটানো হতো। বিশেষ করে ভারতীয় শাড়ি ও থ্রি-পিসের বড় বাজার রয়েছে বাংলাদেশে।
ভারত থেকে পোশাক আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় শাড়ির চাহিদা বেশি। ক্রেতাদের নাগালে ভালোমানের শাড়ি তৈরি করা হয়। মান ও দামের কারণে নারীদের কাছে ভারতীয় শাড়ির কদর-চাহিদা বেশি। মহিলাদের শাড়ি ছাড়াও থ্রি-পিস এবং পুরুষদের শার্ট-প্যান্টের বড় বাজার রয়েছে ভারতীয় পোশাকের। ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার ঈদে ভারতীয় পোশাক আমদানি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
চট্টগ্রামের অন্যতম বড় পোশাক বাজার টেরিবাজার বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান পূর্বকোণকে বলেন, ভিসা জটিলতার কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মেডিকেল ভিসা নিয়ে সীমিত সংখ্যক ব্যবসায়ী ভারতীয় পোশাক আমদানি করেছেন। এবার চার ভাগের এক ভাগের মতো পোশাক আমদানি হয়েছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।
বাংলাদেশি ক্রেতার অভাবে কলকাতার মিনি বাংলাদেশ হিসেবে খ্যাত নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে বলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঈদ কেনাকাটার প্রস্তুতি :
রমজানের কয়েক মাস আগ থেকেই ঈদ বাজারের প্রস্তুতি নেন ব্যবসায়ীরা। চলতি মাসের শুরু থেকেই ঈদের পোশাক সংগ্রহ ও কেনাকাটা শুরু করেছেন পাইকারি-খুচরা ব্যবসায়ীরা। ভারতীয় পোশাক সংগ্রহ করে দেশের ফিরেছেন এমন অন্তত ৮ জন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, এলসির মাধ্যমে বৈধপথে ভারতীয় ঈদের পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। তবে ভিসা জটিলতায় ‘লাগেজপার্টি’ খ্যাত কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে গেছে। এছাড়াও মধ্যসারির ব্যবসায়ীদের অনেকেই ভিসা না পেয়ে পাকিস্তান, থাইল্যান্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা ও পরশমনি’র মালিক মো. ইসমাইল বলেন, এলসির মাধ্যমে ভারতীয় পোশাক আমদানি করা হচ্ছে। ভারতের গুজরাট, দিল্লি ও বোম্বের তৈরি শাড়ির বাংলাদেশে বেশ কদর রয়েছে। ক্রেতাদের ক্ষয়-ক্ষমতার মধ্যে ভালো-উন্নতমানের শাড়ি তৈরি করে ওখানকার কোম্পানিগুলো। দেশীয় বাজারে এসব শাড়ির চাহিদা বেশি।
ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল জানান, কয়েক বছর ধরে নারীদের রুচির পরিবর্তন ঘটেছে। শাড়ির চাহিদা কমে ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আর থ্রি-পিসের চাহিদা বেড়ে ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। থ্রি-পিসের বাজারের বড় অংশ দেশীয় উৎপাদিত পোশাকে মেটানো হয়। চাহিদার বাকিটা ভারত, পাকিস্তান ও অন্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন শো-রুম থেকে পোশাক সংগ্রহ করেন। এছাড়াও জাকারিয়া স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, সদর স্ট্রিটের দোকানপাটে নেই সেই চিরচেনা ভিড়। এছাড়াও ধর্মতলা থেকে গড়িয়াহাট, শিয়ালদহ থেকে রাজাবাজারসহ অন্যান্য বড় বাজারগুলোতে একই চিত্র দেখা যায়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পোশাক কলকাতার ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠানো হয়। কমিশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা কলকাতা থেকে ঈদের পোশাক সংগ্রহ করেন। কলকাতার নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশি ক্রেতার অভাবে বেচাকেনা মন্দা যাচ্ছে বলে জানান কলকাতার ব্যবসায়ীরা।
কলকাতার ব্যবসায় সংগঠনের নেতারা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলছেন, প্রতিদিন সাধারণত ৬ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক কলকাতা যান। শীত মৌসুমে সেই সংখ্যা বেড়ে দিনে ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু ভিসা কড়াকড়ির কারণে এখন দিনে মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার পর্যটক কলকাতা যাচ্ছেন।
মিমি সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, এলসির মাধ্যমে বৈধপথে ভারতীয় শাড়ি আমদানি করা হচ্ছে। তবে আগের চেয়ে ট্যাক্স বেড়েছে। এতে অবৈধ পথে পণ্য বেচাকেনা কমেছে।’ তিনি বলেন, দিল্লি, বোম্বে, বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদসহ বিভিন্ন রাজ্যের পোশাক কলকাতার এজেন্টদের কাছে পাঠানো হয়। কমিশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে ঈদের পোশাক সংগ্রহ করেন।
পূর্বকোণ/ইব