চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

বরেণ্য শিল্পী সুবীর নন্দী আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক , ঢাকা অফিস

৮ মে, ২০১৯ | ২:৫০ পূর্বাহ্ণ

‘ও আমার উড়াল পঙ্খী রে’, ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’, ‘চাঁদে কলঙ্ক আছে যেমন’, ‘বধূ তোমার আমার এই যে পিরিতি’ ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ , ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, আমায় আর কান্নার ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘আশা ছিল মনে মনে’-এমন অসংখ্য গানের মিষ্টি শিল্পী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশের খ্যাতিমান বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী আর নেই। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোর সাড়ে ৪টায় মারা যান তিনি। সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিকদল, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা।
প্রয়াত শিল্পীর স্বজনরা জানিয়েছেন, আজ বুধবার সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে এই কিংবদন্তি গায়কের নিথর দেহ। তার জামাতা রাজেশ শিকদার বলেছেন, বুধবার সকাল ৬টা ১০ মিনিটে বাবাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি ঢাকা শাহজালাল বিমান বন্দরে পৌঁছানোর কথা। এরপর সেখান থেকে শিল্পীকে আমরা সরাসরি গ্রিন রোডের বাসায় নিয়ে আসবো। বাসায় স্বজনদের শেষ দেখার পরে সকাল নয়টার দিকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে। তারপরে, সম্মলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে সকাল ১১টায় সব শ্রেণির মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সুবীর নন্দীর মরদেহ রাখা হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপর সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে রামকৃষ্ণ মিশনে। সেখানে সৎকার পূর্ব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সবুজবাগের শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হবে।
জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক অধ্যাপক সামন্তলাল সেন জানান, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরপর তিনবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন সুবীর নন্দী। এর আগে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও একবার ‘হার্ট এটাক’ হয়েছিল তাঁর। ১৮ দিন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন থাকার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে গত ৩০ এপ্রিল সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় সুবীর নন্দীকে। বাংলাদেশে সুবীর নন্দীর চিকিৎসার বিষয়টি সমন্বয় করছিলেন অধ্যাপক সামন্তলাল সেন। তিনি বলেন, ‘বারবার হার্ট এটাক হয়েছে তাঁর, সেইসঙ্গে সুবীর নন্দীর মাল্টিপল অর্গান ফেইলিউর হচ্ছিল।’ সংগীতে অবদানের জন্য চলতি বছরেই সুবীর নন্দীকে একুশে পদকে ভূষিত করে সরকার। বেতার, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকে তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের জন্য চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। গত ১২ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন সুবীর নন্দী ও তাঁর পরিবার। পয়লা বৈশাখে শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকা ফেরার পথে উত্তরায় কাছাকাছি আসতেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে সুবীর নন্দীর। এরপরই তাঁকে সেখান থেকে সরাসরি সিএমএইচে নেওয়া হয়।
সুবীর নন্দীর জন্য অপেক্ষায় স্ত্রী পূরবী নন্দী
শেষবার স্ত্রীর হাতে রান্না করা শুটকি মাছ খেয়ে বাসা থেকে বিদায় নিয়েছিলেন সুবীর নন্দী, বলেছিলেন ফিরে এসে আবার খাবেন। স্বামীর সাথে শেষ সময়ের সেই সুখস্মৃতিটুকুন মনে করে গতকাল দুপুরে রাজধানীর গ্রিন রোডের বাসায় গুমরে গুমরে কাঁদছেন তাঁর স্ত্রী পূরবী নন্দী। অসুস্থতার আগে যখন তিনি বাসায় থাকতেন তার স্ত্রী পূরবী নন্দীকে প্রায় রাতে ডেকে বলতেন যে, এতো সাধের পৃথিবীটাও একদিন ছেড়ে হতে হবে! স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সুবীর নন্দী বলতেন, ‘ভাবতেই ব্যথায় ব্যথায় মন ভরে যায়। আমি যখন থাকবো না, তখন জ্বেলে দিও সন্ধ্যা প্রদীপ। এই পৃথিবীটা কতোই সজীব!’
পূরবী নন্দী বলেন, আমেরিকায় তার চিকিৎসার জন্য যাওয়ার কাগজপত্র সবকিছু ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু উনি দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাননি। এটা শেষবার অসুস্থ হওয়ার আগের ঘটনা। উনি চেয়েছিলেন, সবসময় দেশেই থাকতে। সুবীর নন্দীর চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল না উল্লেখ করে পূরবী নন্দী বলেন, সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসকরা সুবীর নন্দীকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছেন। তারা খুব আন্তরিক ছিলেন। এটা খুব বেশি দেখা যায় না। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে সুবীর নন্দীর চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেয়া হয়। দেশের ব্যস্ত নেত্রী হয়েও উনি মায়ের মতো পাশে থেকেছেন বলে মনে করেন সুবীর নন্দির স্ত্রী পূরবী নন্দী।
এক নজরে সুবীর নন্দী : সুবীর নন্দী, বাংলা সংগীত জগতের কিংবদন্তি নাম। ১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তিনি গান করতেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানের ওস্তাদ ছিলেন বিদিত লাল দাস। সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং এর মধ্য দিয়ে। দরদী কন্ঠের আধুনিক বাংলা গানের অবিস্মরণীয় এ কণ্ঠশিল্পী ৪৩ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গান গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য গান।
চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে। এরপর থেকে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। ১৯৮১ সালে তার একক এলবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ ডিস্কো রেকর্ডিং এর ব্যানারে বাজারে আসে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে তিনি যুগোশ্লাভিয়া, ইংল্যান্ড, সুইডেন, আমেরিকা, আরব আমিরাত, জাপান, নেপাল ও ভারতে সংগীত পরিবেশন করেছেন। চলচ্চিত্রের সংগীতে অবদানের জন্য তিনি চার বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন (মহানায়ক ১৯৮৪, শুভদা ১৯৮৬, শ্রাবণ মেঘের দিন হাজার ১৯৯৯, মেঘের পরে মেঘ ২০০৪)। এছাড়া চার বার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। শিল্পকলা- সংগীতে গৌরবজনক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সুবীর নন্দীকে ২০১৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট