চট্টগ্রাম সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

‘নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ চট্টগ্রাম’ সংলাপে বক্তারা

সড়কের নিরাপত্তায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

৩০ নভেম্বর, ২০২৩ | ১০:০০ পূর্বাহ্ণ

সুপারিশ

  • সড়কের শৃঙ্খলায় সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা
  • সড়কের ডিভাইডারগুলো উঁচু এবং জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করা
  • প্রতিটি জংশনে ফুটওভার ব্রিজ তৈরি, গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা
  • শহরের প্রধান সড়কগুলোকে অযান্ত্রিক ও ধীরগতির যান চলাচল বন্ধ করা
  • ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং পুনরায় যাতে বেদখল না হয় তা নিশ্চিত করা
  • যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা কমাতে গণপরিবহনগুলোকে কোম্পানির ফরম্যাটে নিয়ে আসা
  • ফ্লাইওভারগুলোতে মিড ডিভাইডারের ব্যবস্থা করা এবং স্পিড ব্রেকারগুলো ঝিকঝাক বা ঢালু করে দেয়া
  • ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াকে যুগোপযোগী করা এবং চালকদের দক্ষতা নিশ্চিত করা
  • চালকদেরকে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও আইন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা
  • আইন প্রয়োগে ট্রাফিক পুলিশকে আরও কঠোর হওয়া
  • গাড়ি থামিয়ে চালকদের অ্যালকোহল টেস্ট করা
  • অবকাঠামো নির্মাণে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা
  • আগামীর ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের মাঝে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা

 

মো. রেজাউল করিম চৌধুরী
মেয়র
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন

চালকদের প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনতে গণপরিবহনকে অবশ্যই কোম্পানি ফরম্যাটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে। আর তাতে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। গণপরিবহনকে কোম্পানি ফরম্যাটে নিয়ে যেতে ট্রাফিক বিভাগকে সহযোগিতা করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সর্বদা প্রস্তুত। একে অপরকে দোষারোপ করে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। একজন নাগরিক হিসেবে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। তাহলেই সমাধান বের হয়ে আসবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশসহ (সিএমপি) প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে। একটা শহরকে শৃঙ্খলায় আনতে হলে সেখানে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সবাইকে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। সকল দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শহরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে যেকোনো কার্যকলাপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে শৃঙ্খলা আনয়ন সম্ভব নয়।
চালকদেরকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আইন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আইন প্রয়োগে ট্রাফিক পুলিশকে আরও কঠোর হতে হবে। রাস্তা থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল রোধ করতে হবে। পথচারীকে সচেতন করতে হবে। জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।ফুটপাত দখলমুক্ত করতে পুলিশকে মনিটরিং করতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বহুবার উৎখাত করা হয়েছে। তবে উৎখাতের দিনকয়েক পর আবারও তারা বসে যায়। আবার উৎখাত করা হয়। তাই স্থায়ী সমাধানে পুলিশকেও দায়িত্ব নিতে হবে। প্রত্যেক থানাকে দায়িত্ব দিতে হবে। যাতে তারা বসতে না পারে। পাশাপাশি সবাইকে সচেতন হতে হবে।
বেশ কয়েকটি ফুটওভার ব্রিজের কাজ শুরু হয়েছে। প্রত্যেকটি মোড়ে ফুটওভার ব্রিজ করা হবে। মিড আইল্যান্ড আরও উঁচু করা হবে। রাস্তায় লাগানো স্টিকার দৃশ্যমান করতে ইতোমধ্যে উদ্যেগ নেয়া হয়েছে। অচিরেই এর কাজ শুরু হয়ে যাবে।

 

কৃষ্ণপদ রায়
পুলিশ কমিশনার
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ

আমরা আইন মানার চেয়ে প্রয়োগের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। যতদিন কর্তৃপক্ষীয় সমাধানের উপর গুরুত্ব দেয়া কমবে না, ততদিন সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না। অথবা স্থাপনা তৈরি থেকে শুরু করে সবকিছুই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শহরে বছরে প্রায় ৯০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে চালকদের উপর ক্ষুব্ধ হয় মানুষ। কিন্তু পথচারীরা যে কতটা সতর্ক থাকে, সেদিকে নজর দেয়া হয় না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ শুধু গাড়ি নয়, অনেক সময় ব্যক্তি নিজেও দায়ী। মানসিকতার পরিবর্তন খুবই জরুরি। ভালোটা দেখলে সেটাকে বলে না বেড়িয়ে নিজেও সেই ভালোটা অনুসরণ করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু টানেল চালু হওয়ার আগে বিভিন্ন বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। যেগুলো কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে আমলে না নেয়ায় ইতোমধ্যে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও কর্তপক্ষ এখন সমাধানের জন্য এগিয়ে আসছে।
চালকদের মামলা দেয়া একমাত্র সমাধান হতে পারে না। বারবার মামলা হওয়ার পরও চালক গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামছে। গাড়িগুলো ডাম্পিং করলে রাখার মত ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের মত যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। পুলিশ ট্রাফিকরা রাস্তায় এতো পরিশ্রম করে তারপরও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় না। শুধু দোষ খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু আইনকানুনের তোয়াক্কা কেউ করে না। তাই শুধু দোষ না খুঁজে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নিজে সচেতন হতে হবে, অন্যকেও সচেতন করতে হবে।

 

জসিম উদ্দিন চৌধুরী
চেয়ারম্যান, দি পূর্বকোণ লিমিটেড

সড়ক দুর্ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত অক্টোবর মাসের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ হাজার ৩৬০ জনের মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার পঙ্গু হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে বছরে ৩৬ হাজার কোটি টাকা।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ আইন লঙ্ঘন। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে প্রতিটি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা আমলে নিতে হবে। তখন মানুষের মধ্যে আইন ভাঙার প্রবণতা কমে আসবে। এভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে। এপার্ট ফ্রম দিস, ফ্লাইওভারে গাড়ি নিয়ে ওঠার সময় যখন উল্টো দিক থেকে একটা মোটরসাইকেল আসে, ইট ইজ সো ডেঞ্জারাস। একটা হেভি ভেহিকল কিন্তু হঠাৎ তার ব্রেক ধরতে পারবে না। এ জিনিসগুলো একটু কন্ট্রোল করা দরকার।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে ছোট ছোট বাসগুলো পুরো রাস্তা ব্লক করে রাখে প্যাসেঞ্জার নেওয়ার জন্য। এতে রোড ট্রাফিক কন্ট্রোল করা হয় না এবং যার কারণে কনজেশন হয়। এগুলো কন্ট্রোল করা গেলে আরও সেফটি হবে মানুষের জন্য।

 

শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশেন

নিরাপদ সড়ক এই সময়ের একটি যৌক্তিক দাবি এবং সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের এই সময়ের অন্যতম একটি আলোচিত বিষয়। আমি ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস এবং ভাইটাল স্ট্রাটেজিসকে ধন্যবাদ জানাতে চাই এই দিবসটি উদযাপনের জন্য। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই সকল সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করে আমরা কতটুকু সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে পারছি? আদৌ পারছি কিনা? আমাদের যে ডেটা, সেটা কিন্তু বলে আমরা এটা কোনভাবেই প্রতিরোধ করতে পারছি না। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যে রিপোর্ট, তাতে বলা হয়েছে পৃথিবীতে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা চতুর্থ। আমাদের জিডিপির তিনভাগ এই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতি হয় যেটা টাকার পরিমাণে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তাই এই বিষয়টি এখনই এড্রেস করতে হবে।
আরেকটা বিষয় হলো এক্ষেত্রে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল অবলিগেশনও আছে। ইউএন জেনারেল এসেম্বলিতে একটি রেজুলেশন এডাপ্ট করা হয়েছে টুয়েন্টি টুয়েন্টিতে। সেটা হচ্ছে ‘ডিকেড অফ একশন রোড সেফটি টুয়েন্টি টুয়েন্টি ওয়ান টু টুয়েন্টি থার্টি’। যেটাতে বলা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং আহতের সংখ্যা ৫০ ভাগের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। সুতরাং এটি একটি আমাদের আন্তর্জাতিক কমিটমেন্টও। তাই আমাদেরকে এই বিষয়টি কোন না কোনভাবে এড্রেস করতেই হবে।
আমরা আজকের দিনটিতে যারা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাদেরকে স্মরণ করছি। যারা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন তাদের সাপোর্ট আমাদের করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।
যারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তারা আসলে এ বিষয়টা কোনভাবেই অনুধাবন করতে পারে না। আমি জানি না আমরা কখন বিষয়টা অনুধাবন করতে পারবো। এই বিষয়টা অনেক ব্যাপক, অনেক বড় একটা সেক্টর। এখানে অনেক স্টেকহোল্ডার আছেন। আমরা দশ-বারোটা স্টেকহোল্ডার এখানেই আছি। এখানে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে অনেক রিসার্চ হয়েছে। চোখ বন্ধ করে অনেকগুলো কারণ বলে দেয়া যায়। কিন্তু এখন আমরা আসলে কি এভাবে মোটা দাগে বিষয়টা সলভ করতে পারবো? এটাকে কোনভাবে মিনিমাইজ করে এডজাস্ট করা যায় কিনা?
পথচারী যে দুর্ঘটনার স্বীকার হচ্ছে এটাকে কীভাবে মিনিমাইজ করা যায় আমাদের ভাবতে হবে। এর অংশ কিন্তু অনেক বড়। আমাদের পথচারীর মৃত্যুর যে স্টাডি, সেটা হচ্ছে আমাদের ৫৬ শতাংশ এবং জাতীয় ডেটায় ৪৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। এটা আমরা কীভাবে মিনিমাইজ করতে পারি তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার।আমরা সাধারণ পথচারীদের সচেতন করতে পারি। বিআরটিএ স্কুলগুলোতে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করছে। আমরা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকেও ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ও ভাইটাল স্ট্রাটেজিসকে সাথে নিয়ে একটা ট্রেনিং সেশন করেছি। সিটি কর্পোরেশনের ৮২টা স্কুল-কলেজের প্রতিটা থেকে আমরা তিনজন প্রতিনিধিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি সড়ক নিরাপত্তার ওপর। কীভাবে তারা সড়ক পার হবে, এই জায়গাটায় আমরা যদি এড্রেস করতে পারি, আমরা যদি সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে যেতে পারি কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হয়, আমার মনে হয় কিছুটা হলেও এ জায়গাটায় আমরা উন্নতি করতে পারি।
আরেকটা বিষয় মোটরসাইকেল কিন্তু আমাদের জন্য বিষফোঁড়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রতিনিয়ত মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট হয়। এক্ষেত্রে হেলমেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাগজের মতো হেলমেট ব্যবহার করতে দেখা যায় মোটরসাইকেলে। হেলমেটের মান নিয়ে অবশ্য আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। এ জায়গায় আমাদের এড্রেস করতে হবে। আমরা একটা বছর টার্গেট করতে পারি যে এই বছর আমরা শুধুমাত্র হেলমেটের ওপর ফোকাস করবো। আরেক বছর টার্গেট করতে পারি শুধুমাত্র সচেতনতামূলক প্রচারণা নিয়ে আমরা বাংলাদেশের সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে যাবো। এছাড়া ড্রাইভারদের ট্রেনিং, লাইসেন্স, ইন্সুরেন্স, এগুলো তো আছেই।
আমাদের অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন আমাদের কাজ করতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আপনারা অচিরেই এগুলো দৃশ্যমান দেখতে পাবেন। আমি মনে করি চট্টগ্রামবাসী কিছুদিনের মধ্যেই এর সুফল পাবে।

 

জয়নাল আবেদীন
ডিসি ট্রফিক (নর্থ)
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ

সড়ক দুর্ঘটনাগুলো কেন হচ্ছে তার কারণ খুব কমই খুঁজে বের করা হয়। সড়কে একটি নোংরা প্রতিযোগিতা আছে যাত্রী নেওয়ার। বাসের মালিকপক্ষ বাসচালকদের কাছে সারাদিনের জন্য বাসটি ইজারা দিয়ে দেয়। তাকে একটি টার্গেট বেঁধে দেয়া হয়। যার কারণে চালকরা অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তারা একটা যাত্রীও মিস করতে চায় না। একজন আরেকজনকে ওভারটেক করে যাত্রী নিতে চেষ্টা করে, যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এ ধরনের নোংরা প্রতিযোগিতা কমাতে গিয়ে আমাদের অনেক ট্রাফিক সদস্যকে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাতে হচ্ছে। গণপরিবহনগুলোকে কোম্পানির ফরম্যাটে আনা গেলে বাসচালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমে আসবে। এতে দুর্ঘটনা প্রায় ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
ফ্লাইওভারগুলোকে মিড ডিভাইডারের ব্যবস্থা করতে হবে। স্পিড ব্রেকারগুলোকে যদি ঝিকঝাক বা ঢালু করে দেয়া যায় তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমতে পারে। এছাড়া দুর্ঘটনা কমাতে ফ্লাইওভারের মুখগুলোতে বিভিন্ন কাজ করেছি যার কারণে ওই জায়গাগুলোতে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিলবোর্ড অপসারণ করা জরুরি। যে পরিমাণ পরিবহনের অনুমতি দেয়া আছে সে পরিমাণ চালক নেই। সড়ক পরিবহন আইনে চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলা আছে। কিন্তু, আমাদের দেখতে হবে, শিক্ষিত চালক দরকার নাকি দক্ষতা সম্পন্ন। প্রতিসপ্তাহে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে চালক ও তাদের সহযোগীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। রাতের বেলায় সতর্ক সংকেত দেয় এমন রঙের বিভিন্ন স্টিকার লাগানো জরুরি। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে মাল্টি এক্সেস ফুটওভার ব্রিজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

ডা. অং সুই প্রু মারমা
উপ-পরিচালক
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

প্রথমেই রোড ক্র্যাশের পিছনের কারণগুলো আমাদের খুঁজে বের করা দরকার। এক্ষেত্রে কারা রোড ক্র্যাশের শিকার, কোন এলাকার, প্রফেশন কী, তার জব নেচার কী, কেন ক্র্যাশ হয়েছে, সে ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো আমরা খোঁজার চেষ্টা করি। প্রত্যেক দুর্ঘটনার পিছনে যদি আমরা এ বিষয়গুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করি, সেভাবে যদি প্রোপারলি এড্রেস করি, তাহলে আমাদের রোড ক্র্যাশ কমে যাবে। এখানে অনেকগুলো ফ্যাক্টর জড়িত। গাড়ির একটা ফ্যাক্টর আছে। যিনি গাড়ি চালান তার একটা ফ্যাক্টর আছে। এছাড়া দেশের আইন, সড়কের স্ট্রাকচার ও সেফটি, এ বিষয়গুলো আমাদেরকে এড্রেস করতে হবে।
আরেকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা দরকার। রোড ক্র্যাশের ইমপ্যাক্ট দীর্ঘমেয়াদি। কারও ক্ষেত্রে পাঁচ-ছয় মাস আবার কারও ক্ষেত্রে সারাজীবন এর প্রভাব থাকে। যেমন পঙ্গুত্ববরণ বা অঙ্গহানি, এ বিষয়গুলো আমাদের যথাযথভাবে এড্রেস করা দরকার। এ সমস্যা নিরসনে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রোড ক্র্যাশের কয়েকটা মৌলিক কারণ রয়েছে। সেগুলো খুঁজে বের করে তা সমাধানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু কথায় না, কাজে সবাইকে যার যার ভূমিকা পালন করতে হবে। সারাবিশ্বেরমতো আমাদের দেশেও গাড়ি থামিয়ে চালকদের ডোপ টেস্ট করা যেতে পারে। সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার। পাশাপাশি আমাদেরকেও এ সম্পর্কিত আইনগুলো মেনে চলা জরুরি।

 

তৌহিদুল ইসলাম
উপ-পরিচালক , বাংলাদেশ রোড
ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম।

বিআরটিএতে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে দক্ষ ও মানবিক গুণ সম্পন্ন গাড়ি চালক তৈরির লক্ষ্যে পেশাজীবী চালকদের নিয়মিতভাবে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। সড়ক নিরাপত্তা রোধকল্পে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া মহানগরীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সড়ক নিরাপত্তা ও গণসচেতনতামূলক স্লোগান সম্বলিত স্টিকার, লিফলেট, পোস্টার চালক, যাত্রী, পথচারী ও সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে নিয়মিত বিতরণ করা হয়েছে।
বিআরটিএ চট্টগ্রামে দু’জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন যারা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট করে থাকেন। এছাড়াও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমেও মামলা হয়। গতবছরের ৩০ জানুয়ারি থেকে বিআরটিএতে পেশাদার ড্রাইভারদের লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নকালে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আমরা মনে করি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন একটি সামাজিক আন্দোলন। সামাজিক আন্দোলন হিসেবে এটি জাতীয় ম্যান্ডেটে পরিগণিত হয়েছে। আমাদের কিছু মেন্টর সেটাআপ তৈরি করা দরকার।

 

কাজী সাইফুন নেওয়াজ
সার্ভেইল্যান্স কোঅর্ডিনেটর, বিআইজিআরএস, চট্টগ্রাম ও
সহকারী অধ্যাপক, এআরআই, বুয়েট

সড়ক দুর্ঘটনায় যিনি মারা যান তাকে আমরা স্মরণ করি বা তার জন্য দোয়া করি। কিন্তু যারা বেঁচে আছেন তাদের কথাগুলো আমাদের শুনতে হবে। তাদের অনুভূতি শুনতে গেলে নিজেদের অনুভূতি আটকে রাখা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের অনেকের আত্মীয় স্বজনের সাথে কথা বলি। নিহত এক মেয়ের বাবার সাথে আমরা কথা বলেছিলাম যিনি নিজে একজন বাসচালক। মেয়ের মৃত্যুর পর তিনি আর বাস চালাবেন না বলে জানান। এর কারণ হচ্ছে, তারই মতো একজন চালকের দ্বারাই হয়তো তার মেয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। এই কষ্টটা মানুষ নিতে পারে না। যদি তাঁর মেয়ে রোগে বা অন্য কোনো কারণে মারা যেত তাহলে তার এই কষ্টটা হত না। সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা প্রতিনিয়ত অনেক আপনজন, অনেক প্রতিভাবান মানুষকে হারাচ্ছি যারা দেশের জন্য অনেক কিছু দিয়ে যেতে পারত। আমরা প্রত্যেকেই সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছি। আমাদের প্রতিনিয়ত সড়ক ব্যবহার করতে হয়, হবে। কিন্তু আমরা কেউ জানি না যে কে কখন কোথায় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হতে যাচ্ছি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পরিসংখ্যানে গত তিন বছরে ২৬৩ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এটা একটা সংখ্যা হলেও এদের প্রত্যেকের পরিবার তাদের এই ক্ষতিটা কীভাবে সামাল দিচ্ছে। শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতি না, মানসিক যে একটা ক্ষতি থাকে যার চলে যায় শুধুমাত্র সেই বোঝে। এই রকম মৃত্যু প্রতিদিনই হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পাশাপাশি তাদেরকে স্মরণ রাখতেই শুরু হয় আমাদের পথচলা।সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে ১৯৯৩ সালে রোড পিস নামে একটি এনজিও সংস্থার ছোট্ট একটা উদ্যোগ যেটি স্বল্প মানুষ নিয়ে শুরু হয়েছিল সেটি বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী পালিত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এ রকম ছোট্ট একটা উদ্যোগই পারে মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে। আমাদের উদ্যোগ হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার সাথে সাথে তাকে উদ্ধার করে জরুরি সেবা নিশ্চিত করা, আইনগত সহযোগিতা, তাদের পরিবারকে সাপোর্ট দেয়া এবং দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে কমানোর উপায় খুঁজে বের করা। কারণ আমরা স্মরণ করে নয়, সবাইকে নিয়ে একসাথে বাঁচতে চাই।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার একটি সূচক হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা এবং সেই লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। ন্যাশনাল রোডসিটি কাউন্সিলে ১১১টি সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীরও নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনা মেনে সরকার কাজ শুরু করেছে। চট্টগ্রামে ২০২০ থেকে ২০২২ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতিবছরই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বাড়ছে। প্রতি এক লাখে প্রায় তিনজনের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশ মারা গেছে পথচারী। ৩০ শতাংশ হচ্ছে তিন চাকা বা দুই চাকার গাড়ির চালক। এই নিহত হওয়া মানুষগুলোর মধ্যে বেশি মারা গেছে যারা আমাদের দেশে র অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারত।
চট্টগ্রামের ১০টি জায়গা এবং ১০টি করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

 

লিটন এরশাদ
মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই

আজ থেকে ৩০ বছর আগে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) যে আন্দোলনের সূচনা করেছিল সেটি এখন আপনাদের লালনে পরিচর্যায় আরও বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু সরকারের কিছু মন্ত্রীর কথায় মাঝে মাঝে খুবই হতাশ লাগে। যারা বলেন ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যখন চলি তখন মনে হয় ইউরোপ বা সিঙ্গাপুর কোথাও দিয়ে চলছি। নিচে নামলে নিজেকে গরিব গরিব লাগে। কিছু উদ্যোগের কারণে আশার আলো দেখি আবার হতাশার দিকেও ফিরে যাচ্ছি। আমরা শক্তির চর্চা করছি, সেই শক্তি দেখাতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, সেটা হচ্ছে রাজপথে দুর্বলের উপর। ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দান থেকে শুরু হয় নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন। আন্দোলনটি করতে গিয়ে সেই সময় মোট ৪২টি দফা তুলে ধরা হয়েছিল যার মধ্যে অন্যতম হাইওয়ে পুলিশ, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ চালক। সেনাবাহিনীর এরিয়াগুলোতে যদি সুশৃঙ্খল চলাচল করা যায় তাহলে সবখানে কেনো সেই ব্যবস্থা হচ্ছে না। নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের জন্য তাই সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।

 

চৌধুরী ফরিদ
ব্যুরো প্রধান, চ্যানেল আই, চট্টগ্রাম

সড়কের ডিভাইডারগুলো উঁচু করা হলে এবং জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। বিশ্বের কোথাও জেব্রা ক্রসিং ছাড়া যত্রতত্র রাস্তা পারাপার করতে পারে না। পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি জংশনে ফুটওভার ব্রিজ তৈরি, গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, ফুটপাত দখলমুক্ত এবং শহরের প্রধান সড়কগুলোতে দুই ও তিন চাকার গাড়ি চলাচল কমিয়ে আনতে হবে। সর্বোপরি সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নিজেদের সচেতনতার পাশাপাশি মানসিকতারও পরিবর্তন আসতে হবে।

 

আমিনুল ইসলাম সুজন
কারিগরি পরামর্শক, ভাইটাল স্ট্রাটেজিস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গ্লোবালি একটা টার্ম ব্যবহার করে, ‘সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ’। সড়কের ডিজাইন এমন থাকবে যেটি যানবাহনের জন্যও নিরাপদ হবে, মানুষের জন্যও নিরাপদ হবে। যানবাহনগুলোর ব্যবস্থা এমন থাকবে যা চালক ও যাত্রীদের জন্য নিরাপদ হবে। এক্ষেত্রে সিট বেল্ট গুরুত্বপূর্ণ। সিট বেল্ট ব্যবহার করলে যান্ত্রিক যানবাহনে মৃত্যুর হার ত্রিশ ভাগের মতো কমে আসে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিআরটিএর সহযোগিতায় একটি স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট গাইডলাইন করেছে ২০২২ সালে। এই স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট যদি আমরা ব্যবহার করি তাহলে সড়কে মোটরসাইকেলে মৃত্যু ত্রিশ ভাগের মতো কমে আসবে এবং মারাত্মকভাবে মোটরসাইকেলে আহত হওয়ার হার পঞ্চাশ ভাগ কমে আসবে।
এ ধরনের বেশ কিছু পজিটিভ ইনিশিয়েটিভ আমাদের পলিসিতে এসেছে। প্যাডেস্ট্রিয়ানদের গ্লোবালি গুরুত্ব দেয়া হয়। এর কারণ হচ্ছে সারা পৃথিবীতে সড়কে যত মানুষ মারা যায়, এর একটা বড় অংশ হচ্ছে পথচারী। আমাদের মতো রাইজিং দেশগুলোতে অনেক অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। এই অবকাঠামোগুলো নির্মাণের সময় যদি আমরা সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেই এবং যেকোন অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষ করে এক্সপ্রেসওয়ে, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার, এ ধরনের নির্মাণের ক্ষেত্রে যদি পাঁচ পার্সেন্ট সেফটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়, তাহলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। সর্বশেষ প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম, এ বিষয়গুলোকে গ্লোবালি গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদের এখন অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সড়কে যে ৫৬ পার্সেন্ট পথচারী মারা যাচ্ছেন, এটা নিশ্চয়ই আগামীতে কমে আসবে। কারণ আমাদের সড়ক নিরাপত্তার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। আমরা মনে করি এবং বিশ্বাস করি আগামীতে এ উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে চলবে।

 

শাহীন-উল-ইসলাম চৌধুরী
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রকাশিত চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট ২০২০ এবং ২০২২ অনুসারে নগরীতে গত তিন বছরে ২৬৩ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে ৫৬ পার্সেন্ট মানুষ পথচারী।
তাছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, গত দুই দশকে প্রায় ৫৬ হাজার ৯৮৭ জন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এ হিসেবে গত ২০ বছরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আটজনের প্রাণহানি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি ও দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট যানজট দেশের অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে শুধু যে মৃত্যু হচ্ছে তাই নয়, একইসাথে মানুষের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এসব কারণে দুর্ঘটনা এখন অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ অত্যন্ত জরুরি।

 

হুমায়ুন কবির

আমি কনস্টেবল নুরুল করিমের বড় ভাই। আমার ছোট ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমি চাই না আমার ভাইয়ের মতো আর কারও ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটুক। সড়ক দুর্ঘটনায় আর কোন মায়ের বুক যেন খালি না হয়। দুর্ঘটনায় কেউ মারা যাবার পর তার পরিবারের অবস্থা যে কেমন হয় তা কল্পনাও করা যাবে না। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ঘর থেকে বের হতে পারে তার নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।

 

মোজাম্মেল হক

আমি শহীদ সার্জেন্ট মোজাহিদ চৌধুরীর বড় ভাই। আমার বাবা একজন সাধারণ কৃষক ছিলেন। বাবা একান্ত পরিশ্রম করে আমার ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে সার্জেন্ট বানিয়েছেন। কারণ বাবার ইচ্ছা ছিল আমার ভাই প্রশাসনে চাকরি করবে। আমার ভাই রাস্তার পাশে দাঁড়ানো ছিল দুর্ঘটনার সময়। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসারকে একটা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেললো। আমি এ এক্সিডেন্টের সুষ্ঠু বিচার চাই। গাড়িচাপায় একজন মানুষকে, একজন অফিসারকে, একজন ছাত্রকে, একটা ছোট বাচ্চাকে মেরে ফেলা হবে, যদি এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হয়, তাহলে দেশে কখনও রোড এক্সিডেন্ট বন্ধ হবে না। তাই আপনাদের মাধ্যমে আমার আবেদন, আমি আমার ভাইয়ের হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। যাতে আর কোন মায়ের বুক খালি না হয়।

 

লাবিব তাজওয়ান উৎসব
ইনিশিয়েটিভ কোঅর্ডিনেটর,বিআইজিআরএস, চট্টগ্রাম।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের সহায়তায় আজকের গোলটেবিল বৈঠক। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের স্মরণে প্রতিবছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে ওয়ার্ল্ড ডে অব রিমেমব্রান্স ফর রোড ট্রাফিক ভিকটিমস দিবস পালন করা হয়।

 

আয়োজনে
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস) এবং ভাইটাল স্ট্রাটেজিস

সহযোগিতায়
ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন- ইপসা

সমন্বয়ে
আজিজ আহমদ, জনসংযোগ কর্মকর্তা, চসিক
মাহামুদুল হাসান, কমিউনিকেশন অফিসার, বিআইজিআরএস
কাজী হেলাল উদ্দিন, এনফোর্সমেন্ট কোঅর্ডিনেটর, বিআইজিআরএস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট