চট্টগ্রাম বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

পোশাক পণ্য রপ্তানিতে হয়রানির অভিযোগ

আয় কমছে নিয়মের ‘বাড়াবাড়িতে’!

সারোয়ার আহমদ

২৫ নভেম্বর, ২০২৩ | ১২:৩৬ অপরাহ্ণ

দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটময় পরিস্থিতিতে যেখানে মরিয়া হয়ে ডলার আয়ের পথ খুঁজছে সরকার, সেখানে কাস্টমসের নিয়মের ‘গ্যাঁড়াকলে’ পড়ে বন্ধ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ।

 

যেখানে বৈদেশি মুদ্রা আয়ে প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানিতে উৎসাহ দিচ্ছে সরকার, সেখানে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পোশাক রপ্তানি চালানে অস্বাভাবিক কঠোরতা আরোপ, জরিমানা ও হয়রানি করে সংকুচিত করা হচ্ছে বৈদেশিক আয়ের উৎস। কারণ যে হারে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের দিকে এগুচ্ছে দেশ।

 

তৈরি পোশাক শিল্পের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিণাম সম্পর্কে এভাবেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন পোশাক কারখানার মালিকেরা। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা জানান, বেসরকারি আইসিডিতে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি চালান পরীক্ষণ ও শুল্কায়নের সময় ছোট ছোট অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটির জন্য অনিয়মের মামলা করে উচ্চহারে জরিমানা আরোপ করছেন কাস্টম কর্মকর্তারা।

 

তারা আরও জানান, এতে জরিমানা পরিশোধসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে পুনরায় পণ্য রপ্তানির অনুমতি পেতে যে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয় তাতে নির্ধারিত কাট-অফ-টাইমের মধ্যে সেই পণ্য চালান বন্দরে জাহাজীকরণ সম্ভব হয় না। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বায়ারকে ধরে রাখতে বাধ্য হয়ে তাদের ডিসকাউন্ট দিয়ে এয়ার শিপমেন্টের মাধ্যমে পোশাক পণ্য রপ্তানি করতে হয় কারখানা মালিককে।

 

একদিকে কাস্টমসের উচ্চহারে জরিমানা আদায়, অন্যদিকে রপ্তানি মূল্য থেকে বায়ারকে ডিসকাউন্ট দিয়ে নিজ খরচে এয়ার শিপমেন্ট করতে কারখানা মালিককে বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এতে অনেক পোশাক কারাখানাই দিনদিন তাদের রপ্তানির সক্ষমতা হারাচ্ছে। ফলে বন্ধ হচ্ছে পোশাক পণ্য রপ্তানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ। যা বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটময় পরিস্থিতির জন্য কোনভাবেই কাম্য নয়।

 

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় রপ্তানি আদেশ স্বল্পতায় গত অক্টোবরে রপ্তানি ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সম্প্রতি পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ। অপরদিকে পোশাকের সিএম (কার্টিং এন্ড মেকিং চার্জ) প্রায় ৩০% কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে রপ্তানি ব্যয় দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

তিনি আরও বলেন, এছাড়াও চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় পণ্য চালান খালাস ও রপ্তানিতে বিঘœ সৃষ্টির কারণে চলতি অর্থবছরে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫২ দশমিক ২৭ মার্কিন ডলার অর্জন পোশাক শিল্পের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কাস্টমসের পক্ষ থেকে পোশাক শিল্পের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজিকরণ ও দ্রুততার সাথে সম্পাদন করা না হলে বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কোনভাবেই সম্ভব নয়।

 

সৈয়দ নজরুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের সিংহভাগ রপ্তানি আয় আসে পোশাক পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। সেখানে কয়েকজনের মানি লন্ডারিং বা অনিয়ম এই বিশাল সেক্টরের জন্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যারা অনিয়ম করে তারা চিহ্নিত। হাতেগোনা কয়েকজনের জন্য পোশাক শিল্পের হাজার হাজার কারাখানাকে হয়রানি করা দেশের স্বার্থে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারখানা মালিকরা আমাদের আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট অনেক সমস্যার কথা জানায়। সেগুলো যে সংকট সৃষ্টি করছে তা নিরসনে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে সম্প্রতি কাস্টমস ও এনবিআরকে পাঁচ দফা সুপারিশ করে চিঠি দিয়েছি।

 

প্রস্তাবনাগুলো হলো- রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পণ্য চালানের ওজন জনিত বা অন্য কোন সমস্যার কারণে রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত না করে দ্রুত শুল্কায়ন করে জাহাজীকরণের অনুমতি দেওয়া। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বস্ত্রশিল্পকে উৎসাহিত করতে লোকাল ফেব্রিক দিয়ে রপ্তানি কার্যক্রম সহজিকরণের অনুমতি দিয়ে রপ্তানিকে তরান্বিত করা। রপ্তানি চালান শুল্কায়ন পরবর্তী রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক দ্রুত ‘রি রোট’ কার্যক্রম সম্পাদন করা প্রয়োজন। রপ্তানি প্রত্যয়ন পত্র ইস্যু করার জন্য শিপিং বিল, লিয়েন ব্যাংক কর্তৃক প্রত্যায়িত ইনভয়েজ ও প্যাকিং লিস্ট, বিএল, পিআরসি সমর্থনে লিয়েন ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যয়ন পত্রের মাধ্যমে শর্ট শিপমেন্ট সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করা। আমদানিকৃত কাপড়ের পণ্য চালানের সংশ্লিষ্ট এইচএস কোড বন্ড লাইসেন্সে উল্লেখ না থাকলে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করে সঠিক এইচএস কোডে দ্রুত শুল্কায়ন সম্পন্ন করা।

 

পূর্বকোণ/আরডি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট