চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে মাদক উৎপাদনে

নাজিম মুহাম্মদ

২৬ জুন, ২০২৩ | ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ

মাদক উৎপাদনে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ-ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত (ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল)। বাংলাদেশে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল ম্যাথ (আইস) পাচারকারী গ্রুপ আরাকান আর্মি। মিয়ানমারের বিদ্রোহীগ্রুপগুলো তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহী কার্যক্রম চালাতে ইয়াবা ও আইসের উপর নির্ভরশীল। আর ইয়াবা ও আইস পাচারে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের।

 

মেথামফিটামিন (ইয়াবা-আইস) পাচারের উপর ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল থেকে বাংলাদেশ: বাংলাদেশে মেথামফিটামিন মাদকের উৎস, প্রকৃতি ও পাচার রুটের আঞ্চলিক বিশ্লেষণ’ শিরোনামে একটি গবেষণপত্র তৈরি করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়ুন করিব খোন্দকার। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ক্রিস্টাল ম্যাথ বা আইস ঢুকতে সহযোগিতা দিচ্ছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

 

বাংলাদেশে আইসের উৎস, সরবরাহ, গন্তব্য ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির খোন্দকার।

 

তিনি বলেন, সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত ইয়াবা সংরক্ষণ করা যায়। এরপর গুণাগুণহীন পাউডারে পরিণত হয়। অন্যদিকে ক্রিস্টাল ম্যাথ এক থেকে দেড় বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায়। ফলে যারা ইয়াবা পাচার করছে, তারা ক্রিস্টাল ম্যাথে বিনিয়োগ করছে।

 

আইস পাচারের রুট:

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে ইয়াবার রুটে আইস আসছে বাংলাদেশে। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সীমান্তবর্তী দেশ থেকে আইস তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অর্থাৎ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের সীমান্ত এলাকায় আফিম উৎপাদনকারী অঞ্চলে বিভিন্ন কারখানায় তৈরি হচ্ছে আইস। কারখানাগুলো মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।

 

মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেন, ইয়াবা যে পথে আসে, একই পথে আইসও আসছে। দেশে যারা ইয়াবার শীর্ষ গডফাদার, তারা এখন আইসের দিকে ঝুঁকছে। আইস পাচারের ক্ষেত্রে সুকৌশলে টেকনাফ স্থলবন্দর ব্যবহার হচ্ছে। ব্যবহার হচ্ছে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত।

 

ব্যবহার হচ্ছে এমপিটি সিম:

মিয়ানমারের টেলিযোগাযোগ সংস্থা মিয়ানমার পোস্ট এন্ড টেলিকমিউনিকেশনের (এমপিটি) মোবাইল সিমের মাধ্যমে দেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপের সদস্য ও তাদের প্রতিনিধি, যারা বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের পাচারকারীদের  যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের মাদক কারবারিরা এমপিটি সিমে মিয়ানমারের ক্রিস্টাল মেথ সরবরাহকারীদের সঙ্গে কথা বলেন।

 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘এমপিটি সিমের মাধ্যমেই মূলত দুই দেশের মাদক পাচারকারীরা যোগাযোগ করেন। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই সিম ব্যবহারকারীরা নজরদারির আওতায় নেই। বাংলাদেশ থেকে সম্ভবত এই সিম নজরদারির সুযোগও নেই।

 

অভ্যন্তরীণ রুট:

শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, হ্নীলা, হোয়াক্যং এবং উখিয়ার বালুখালী, পালংখালী, রাজাপালং এবং বান্দরবানের ঘুমধুমসহ সীমান্ত এলাকা ইয়াবার পাশাপাশি আইস প্রবেশের মূল রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাগর পথে শাহপরীর দ্বীপ, মহেশখালী, আনোয়ারা, গহিরা, বাঁশখালী, জলদি এবং আনোয়ারা পারকির চর, পতেঙ্গা, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড ও মীরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকা পাচারের নৌ রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এই দুই পথে আসা আইস চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে অথবা  রেলপথে  পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

 

স্থলপথে আইস সরবরাহে ব্যবহার করা হয় জরুরি পণ্য পরিবহনের ট্রাক, লাশবাহী গাড়ি, জ্বালানি তেলের লরি, এম্বুলেন্স, বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়ি, দূরপাল্লার যানবাহন ও গণপরিবহন। অন্যদিকে আকাশপথে কার্গো বিমানে বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে কাঁচা মালামাল ও বিমানযাত্রীর লাগেজ এবং ট্রাভেলব্যাগে করেও আইস পাচার হচ্ছে।

 

ইয়াবার মতো আইস পাচারেও ভূমিকা রাখছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বাংলাদেশের ইয়াবা পাচারকারীরা টেকনাফ ও উখিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের আইস বহন করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতে ব্যবহার করছে। সীমান্ত পার করে মাদকের চালান নিয়ে আসা, আবার বাংলাদেশের ভেতরে পাচার করা দুই ধরনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে রোহিঙ্গারা।

 

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে আসা প্রতি কেজি  ম্যাথের দাম টেকনাফে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। কক্সবাজার শহরে ৭  থেকে ৮ লাখ টাকা। তবে মিয়ানমার থেকে প্রকৃত দামের চেয়ে অনেক কম দামে বাংলাদেশের ইয়াবার গডফাদারদের কাছে ক্রিস্টাল মেথ সরবরাহ করা হচ্ছে।

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট