
ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। এটি হলো, আধুনিক যুদ্ধ কী অতিরিক্তভাবে একটি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে? অভিযোগ উঠেছে, ইরান উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইসরায়েলের জিপিএস নির্ভর সামরিক অভিযান ব্যাহত করেছে। বিশেষ করে এফ-৩৫ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা বৈশ্বিক সামরিক কৌশলের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।
যদিও এসব তথ্যের পূর্ণ স্বাধীন যাচাই এখনও সীমিত। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জিপিএস জ্যামিং (সংকেত বাধা দেওয়া) ও স্পুফিং (ভুল সংকেত তৈরি করে বিভ্রান্ত করা) এখন বাস্তব ও ক্রমবর্ধমান হুমকি। আধুনিক যুদ্ধের মেরুদ- গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) শুধু নেভিগেশন নয়, বরং নির্ভুল নির্দেশিত অস্ত্র, ড্রোন এবং সমন্বিত যুদ্ধ পরিচালনার ভিত্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে তাদের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে।
কিন্তু সমস্যাটি হলো, জিপিএস সংকেত অত্যন্ত দুর্বল, এবং সহজেই জ্যাম বা বিভ্রান্ত করা সম্ভব। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও আমরা এর বাস্তব প্রয়োগ দেখেছি। যেখানে ড্রোন ও নির্দেশিত অস্ত্রের কার্যকারিতা কমে গেছে।
এই বাস্তবতা একটি নতুন সামরিক সমীকরণ তৈরি করছে। একদিকে শত কোটি ডলারের উন্নত যুদ্ধবিমান, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে তৈরি ইলেকট্রনিক সংকেত-বাধা ব্যবস্থা। অর্থাৎ, প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল দেশও এখন উন্নত প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, যা অসম (অ্যাসিমেট্রিক) যুদ্ধের একটি নতুন রূপ।
এফ-৩৫ লাইটনিং টু-কে প্রায়ই আধুনিক যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এর শক্তি, যেমন সেন্সর সমন্বয় এবং নেটওয়ার্ক সংযোগ ব্যবস্থা একই সঙ্গে এটির দুর্বলতাও। কারণ এই পুরো ব্যবস্থাটি নির্ভর করে নির্ভুল অবস্থান ও সময়ের ওপর, যা জিপিএস নিশ্চিত করে। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো সিস্টেমই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আকাশ আধিপত্যকে প্রায় নিশ্চিত বাস্তবতা হিসেবে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে এই আধিপত্য আর এককভাবে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা যাবে না। বরং যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু স্থানান্তরিত হচ্ছে তড়িৎ-চৌম্বকীয় বর্ণালীর নিয়ন্ত্রণে।
ইতিহাসও আমাদের সতর্ক করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা ইরাক যুদ্ধ, উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও কৌশলগত সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা জিপিএস-বঞ্চিত পরিবেশে যুদ্ধ পরিচালনার ওপর জোর দিচ্ছেন। বিকল্প হিসেবে ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বহুমাত্রিক তথ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন চলছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত সম্পদের মধ্যে কার্যকর প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হলে শুধু ব্যয়বহুল প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ নয়, বরং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং নেটওয়ার্ক স্থিতিস্থাপকতাতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বলা যায়, আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তিই এখন তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠছে। জিপিএস-নির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা যেমন নির্ভুলতা দিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে এক কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি। ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হবে শুধু কার কাছে উন্নত অস্ত্র আছেÑতা দিয়ে নয়; বরং কার কাছে সেই অস্ত্রকে কার্যকর বা অকার্যকর করার সক্ষমতা আছেÑসেই বাস্তবতাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের শক্তির ভারসাম্য।