চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

যুদ্ধের চেয়ে বড় ‘অর্থনৈতিক অস্ত্র’

হরমুজ প্রণালী

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৯ এপ্রিল, ২০২৬ | ২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই এক অপ্রত্যাশিত বিরতি— যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গৃহীত এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি কেবল কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি মূলত একটি ‘সময় কেনা’— যেখানে ওয়াশিংটন জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

 

এই স্বল্পমেয়াদি শান্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি গভীর বাস্তবতার দিকে— এই সংঘাতের চূড়ান্ত নির্ধারক আর যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং অর্থনীতি। আর সেই অর্থনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মাত্র ভূগোল— হরমুজ প্রণালী। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর কেবল সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহনশীলতার পরীক্ষায়। এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটিমাত্র ভূগোল— হরমুজ প্রণালী। এটি আর শুধু একটি প্রণালী নয়, বরং আজকের বিশ্ব অর্থনীতির ‘নাড়ির স্পন্দন’।

 

১. বিশ্ব অর্থনীতির ‘তেল কল’
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০-২৫% বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি প্রবাহিত হয়। এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতি— চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া— তাদের জ্বালানি আমদানির অধিকাংশই এই পথের উপর নির্ভরশীল। ২০২৬ সালের মার্চে যখন ইরান সীমিত আকারে এই প্রণালীতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তখন ট্যাংকার চলাচল ৭০% পর্যন্ত কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে শুধু জ্বালানি নয়— সার, হিলিয়াম, এমনকি খাদ্য বাজারেও। ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা একপ্রকার ‘অর্থনৈতিক শক’ সৃষ্টি করে।

 

২. ইরানের ভূগোল: প্রাকৃতিক দুর্গ
ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এক অনন্য প্রতিরক্ষামূলক শক্তি দিয়েছে। জাগ্রোস পর্বতমালা এবং আলবোর্জ পর্বতমালা দেশটিকে একটি প্রাকৃতিক দুর্গে পরিণত করেছে। অভ্যন্তরের দাশত-ই কাভির ও দাশত-ই দুত মরুভূমি শত্রুর জন্য প্রায় অগম্য। ফলে স্থল আক্রমণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা হলো— এই ‘প্রাকৃতিক প্রাচীর’ বিমান হামলার সামনে অনেকাংশেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

৩. ‘ডিটারেন্ট বেল্ট’: বহু-মাত্রিক প্রভাব
ইরান শুধু হরমুজ নয়, পরোক্ষভাবে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর উপরও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। ইয়েমেনে হুথি মিত্রদের মাধ্যমে এই প্রভাব সুয়েজ খালের বাণিজ্য পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলাফল— বিশ্ব বাণিজ্য বাধ্য হচ্ছে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে, যা সময় ও ব্যয়ের দিক থেকে বিপর্যয়কর।

 

৪. ‘ইনস্যুরেন্স ট্র্যাপ’: যুদ্ধের নতুন কৌশল
ইরানের কৌশল এখন সরাসরি জাহাজ ডুবানো নয়; বরং প্রণালীকে ‘অবিমা-যোগ্য’ করে তোলা। ড্রোন হামলা ও সতর্কবার্তার মাধ্যমে তারা এমন পরিস্থিতি ˆতরি করেছে, যেখানে বীমা প্রিমিয়াম ৪০০-৬০০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর ফলে মায়ের্কস বা হেপাগ লয়েডের মতো বড় শিপিং কোম্পানিগুলো নিজে থেকেই চলাচল বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ, কোনো পূর্ণাঙ্গ নৌ অবরোধ ছাড়াই কার্যত প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়।

 

৫. ‘কেপ বিকল্প’: নিরাপত্তা বনাম ব্যয়
হরমুজ এড়িয়ে কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যাওয়া নিরাপদ হলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অতিরিক্ত ৩,৫০০-৬,০০০ নটিক্যাল মাইল পথ, প্রতি জাহাজে ২-৪ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, যাত্রা সময় ১০-১৪ দিন বৃদ্ধি, বৈশ্বিক শিপিং সক্ষমতা কার্যত ১৬% কমে যাওয়া, ফলে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন খরচ ৪০-৬০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে এবং বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার।

 

৬. বৈশ্বিক অর্থনীতির ‘ডমিনো ইফেক্ট’
এই সংকট শুধু জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য আমদানিতে নির্ভরশীল উপসাগরীয় দেশগুলোতে মূল্য ১২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত হিসেবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

 

৭. যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল: যুদ্ধ থেকে কূটনীতিতে
বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণ বিজয়’ থেকে সরে এসে একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি সেই প্রচেষ্টার অংশ।
সম্ভাব্য কৌশলগুলো হলো- নিউক্লিয়ার নিয়ন্ত্রণ, সম্পূর্ণ ধ্বংস নয়, হরমুজে ‘নিয়ন্ত্রিত চলাচল’ নিশ্চিত করা এবং ইরানের উপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তেলের সরবরাহ বাড়ানো।

 

৮. রাজনৈতিক বাস্তবতা: অর্থনীতিই শেষ কথা
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ইস্যু। জনমতের বিরোধিতা ক্রমশ বাড়ছে, যা সরকারকে দ্রুত সমাধানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভৌগলিক অবস্থান একদিকে ইরানকে রক্ষা করছে। অন্যদিকে অপরিসীম ক্ষতিও হয়েছে। কিন্তু এক জায়গায় তারা এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী— হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালী আজ শুধু একটি জলপথ নয়; এটি একটি ‘অর্থনৈতিক সুইচ’— যা চালু বা বন্ধ করে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা যায়। সুতরাং, ২০২৬ সালের এই সংঘাত আমাদের একটি নতুন বাস্তবতা শিখিয়েছে- আধুনিক যুদ্ধে জয়-পরাজয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট